29th Jul 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

ছাড়তে পারছেন না, আবার মানিয়েও নিতে পারছেন না, এমন সম্পর্কে কী করবেন?

প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিনিধি


সম্পর্কের জগতে সব গল্প সুখের সমাপ্তি পায় না। আবার সব সম্পর্ক এমনও নয়, যেগুলি সহজে ভেঙে ফেলা যায়। অনেক মানুষ এমন এক পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যান, যেখানে তাঁরা সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে পারছেন না, আবার সম্পর্কের বর্তমান অবস্থাও মেনে নিতে পারছেন না। ভালোবাসা আছে, স্মৃতি আছে, একসঙ্গে কাটানো বহু বছরের বন্ধন আছে, কিন্তু সেই সঙ্গে রয়েছে হতাশা, অস্বস্তি, অপূর্ণতা কিংবা মানসিক ক্লান্তি। ফলে তাঁরা যেন এক অদৃশ্য দোলাচলে আটকে পড়েন—থাকবেন, না চলে যাবেন?মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এই ধরনের মানসিক অবস্থাকে অনেক সময় ‘রিলেশনশিপ অ্যাম্বিভ্যালেন্স’ বা সম্পর্ক নিয়ে দ্বৈত অনুভূতি বলা হয়। অর্থাৎ একজন মানুষ একই সঙ্গে সম্পর্কের প্রতি আকর্ষণ এবং বিরক্তি, আশা এবং হতাশা, ভালোবাসা এবং ক্ষোভ—সবকিছুই অনুভব করতে পারেন। এটি অস্বাভাবিক নয়। বরং দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনও না কোনও সময়ে এমন অনুভূতি তৈরি হওয়া বেশ সাধারণ।এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, মানুষ প্রায়ই দ্রুত কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছতে চান। কেউ নিজেকে বোঝান যে সব ঠিক হয়ে যাবে, আবার কেউ ভাবেন যে সম্পর্ক শেষ করে দেওয়াই একমাত্র সমাধান। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, আবেগের চাপে নেওয়া সিদ্ধান্ত অনেক সময় পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। তাই প্রথমেই নিজের অনুভূতিগুলিকে বুঝে নেওয়া জরুরি।অনেক সময় মানুষ সম্পর্ক ছাড়তে পারেন না কারণ তাঁরা এখনও সঙ্গীকে ভালোবাসেন। আবার অনেক ক্ষেত্রে সম্পর্কের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অভ্যাস, নিরাপত্তাবোধ, পারিবারিক প্রত্যাশা, সামাজিক চাপ কিংবা একাকিত্বের ভয়। ফলে সম্পর্কে অসন্তুষ্ট হলেও তা থেকে বেরিয়ে আসার কথা ভাবলে অস্বস্তি তৈরি হয়। অন্যদিকে সম্পর্কে থেকে গেলে একই সমস্যাগুলি বারবার ফিরে আসে। এই টানাপোড়েন মানসিকভাবে অত্যন্ত ক্লান্তিকর হতে পারে।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন পরিস্থিতিতে প্রথম কাজ হল নিজের কাছে সৎ হওয়া। সম্পর্কে ঠিক কোন বিষয়টি আপনাকে অস্বস্তি দিচ্ছে, তা বোঝার চেষ্টা করা প্রয়োজন। সমস্যাটি কি সাময়িক? নাকি দীর্ঘদিন ধরে একই সমস্যা চলতে রয়েছে? এটি কি যোগাযোগের অভাব, বিশ্বাসের সংকট, মূল্যবোধের অমিল, নাকি আবেগগত দূরত্ব? কারণ সমস্যার প্রকৃতি না বুঝে সমাধানের পথ খুঁজে পাওয়া কঠিন।অনেক সময় সম্পর্কে অসন্তোষ থাকলেও মানুষ নিজের প্রয়োজনগুলিকে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেন না। তাঁরা আশা করেন, সঙ্গী নিজে থেকেই সব বুঝে নেবেন। কিন্তু বাস্তবে তা সবসময় ঘটে না। ফলে ভুল বোঝাবুঝি এবং হতাশা আরও বাড়ে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, খোলামেলা এবং সম্মানজনক যোগাযোগ অনেক সমস্যার সমাধানের প্রথম ধাপ হতে পারে। নিজের অনুভূতি, প্রত্যাশা এবং উদ্বেগ সম্পর্কে স্পষ্টভাবে কথা বলা প্রয়োজন।তবে সব সমস্যাই শুধুমাত্র কথোপকথনের মাধ্যমে সমাধান হয় না। কিছু সম্পর্কের মধ্যে বারবার একই ধরনের আঘাত, অসম্মান, প্রতারণা বা মানসিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেন যে শুধু অতীতের স্মৃতি বা আবেগের কারণে কোনও ক্ষতিকর সম্পর্কে আটকে থাকা উচিত নয়। একটি সম্পর্ক তখনই সুস্থ, যখন সেখানে পারস্পরিক সম্মান, নিরাপত্তা এবং মানসিক স্বস্তি থাকে।এই ধরনের দোলাচলের আরেকটি সাধারণ কারণ হল ‘সম্ভাবনার প্রতি আসক্তি’। অর্থাৎ মানুষ বর্তমান সম্পর্কটিকে যেমন আছে তেমনভাবে না দেখে, এটি ভবিষ্যতে কেমন হতে পারে সেই কল্পনার উপর বেশি নির্ভর করেন। তাঁরা ভাবেন, হয়তো একদিন সব বদলে যাবে, হয়তো সঙ্গী পরিবর্তিত হবেন, হয়তো পরিস্থিতি অন্যরকম হবে। আশাবাদ ভালো, কিন্তু যদি দীর্ঘদিন ধরে কোনও বাস্তব পরিবর্তন না ঘটে, তাহলে সেই আশা হতাশার কারণও হয়ে উঠতে পারে।বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্পর্ক মূল্যায়নের সময় ভবিষ্যতের সম্ভাবনার পাশাপাশি বর্তমান বাস্তবতাকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। নিজেকে প্রশ্ন করা যেতে পারে—এই সম্পর্ক আমাকে কী দিচ্ছে? আমি কি এখানে নিজের মতো থাকতে পারছি? আমার মানসিক স্বাস্থ্য কি এই সম্পর্কে ভালো আছে? আমি কি শুধুমাত্র একা হয়ে যাওয়ার ভয় থেকে এখানে আছি? এই প্রশ্নগুলির উত্তর অনেক সময় পরিস্থিতি স্পষ্ট করতে সাহায্য করে।পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলাও উপকারী হতে পারে। তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত নিজেরই। কারণ বাইরের মানুষ পরিস্থিতির একটি অংশ দেখেন, পুরো অভিজ্ঞতা নয়। তাই অন্যের মতামত শোনা গুরুত্বপূর্ণ হলেও নিজের অনুভূতিকে অস্বীকার করা উচিত নয়।বর্তমানে অনেক মনোবিজ্ঞানী এবং সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ সম্পর্ক নিয়ে দোলাচলের ক্ষেত্রে কাউন্সেলিংয়ের পরামর্শ দেন। ব্যক্তি বা যুগল কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে সম্পর্কের সমস্যাগুলি নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয়। অনেক সময় এমন কিছু বিষয় সামনে আসে, যা আগে স্পষ্ট ছিল না। কাউন্সেলিংয়ের উদ্দেশ্য সম্পর্ক বাঁচানো বা ভেঙে দেওয়া নয়; বরং সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করা।একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, কোনও সম্পর্ক শেষ হয়ে গেলে সেটি ব্যর্থতা নয়। আবার কোনও সম্পর্ক টিকিয়ে রাখাও সবসময় সাফল্যের প্রমাণ নয়। সম্পর্কের মূল্য নির্ভর করে তার গুণগত মানের উপর, শুধু স্থায়িত্বের উপর নয়। তাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সামাজিক প্রত্যাশার চেয়ে নিজের মানসিক সুস্থতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।বিশেষজ্ঞরা আরও মনে করিয়ে দেন, নিজের পরিচয় এবং আত্মসম্মান যেন কোনও সম্পর্কের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল না হয়ে পড়ে। ব্যক্তিগত আগ্রহ, বন্ধুত্ব, কাজ এবং আত্মউন্নয়নের ক্ষেত্রগুলি জীবনে সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একজন মানুষ হিসেবে আপনার মূল্য কোনও সম্পর্কের অবস্থার দ্বারা নির্ধারিত হয় না।সব মিলিয়ে বলা যায়, এমন সম্পর্কে আটকে থাকা যেখানে আপনি না থাকতে পারছেন, না ছাড়তে পারছেন—তা মানসিকভাবে অত্যন্ত কঠিন অভিজ্ঞতা। কিন্তু এই দোলাচলকে উপেক্ষা না করে তার কারণ বোঝার চেষ্টা করাই প্রথম পদক্ষেপ। নিজের অনুভূতির প্রতি সৎ থাকা, খোলামেলা যোগাযোগ করা এবং প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া পরিস্থিতিকে অনেকটাই পরিষ্কার করতে পারে।
জীবনের প্রতিটি সম্পর্কই আমাদের কিছু না কিছু শেখায়। কখনও সম্পর্ককে নতুনভাবে গড়ে তোলার সুযোগ দেয়, আবার কখনও শেখায় কখন ছেড়ে দিতে হয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, সিদ্ধান্ত যাই হোক না কেন, তা যেন ভয়, অপরাধবোধ বা সামাজিক চাপে নয়, বরং সচেতনতা, আত্মসম্মান এবং মানসিক সুস্থতার ভিত্তিতে নেওয়া হয়। কারণ শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে জরুরি সম্পর্কটি হল নিজের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক।

Archive

Most Popular