প্রতিবেদন
অরিন্দম সরকার
বাঙালির সবথেকে বড় উৎসব দুর্গাপুজো, না ঈদ এই নিয়ে তর্ক থাকবেই, সঙ্গে রাজনীতিও চলে আসবে ফাউ ফুচকার মতো। ধর্ম হিসেবে নয়, বাঙালি জাতি হিসেবে ধর্ম, বর্ণ, কাঁটাতার ইত্যাদি উপেক্ষা করে যে উৎসব পালনে একত্রিত হয় তা পয়লা/পহেলা বৈশাখ। বাংলা বছরের প্রথম দিন। পূজা অর্চনার দিক থেকে দিনটা হিন্দু ঘেঁষা হয়ে গেলেও, মুসলমান প্রধান বাংলাদেশে এই বিশেষ দিনটি কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের থেকে কয়েকগুণ বেশি আড়ম্বরের সঙ্গে পালিত হয়। পয়লা বৈশাখের সঙ্গে বাঙালির হালখাতা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে যা ওই দিন সকালে কালীঘাটে ভিড় দেখলে তার একটা আন্দাজ আমরা পেতে পারি। এই হালখাতার ব্যাপারটা অনেক আগে থেকে চলে আসলেও সম্রাট আকবর আর হুসেন শাহির জন্য বিশেষভাবে পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে হালখাতার প্রথা পাকাপাকি হয়।
গল্পটা একটু গুছিয়ে বলি, সূর্য সিদ্ধান্তের ওপর ভিভি করে বানানো সৌর পঞ্জিকার ব্যবহার চলে আসছে বহু যুগ ধরে। আমরা যে গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি ব্যবহার করি। তার চতুর্থ অর্থাৎ এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি থেকে এই সৌর পঞ্জিকার বছর শুরু হয়। এই পঞ্জিকার প্রথম দিন ভারতের অসম, বাংলা, ত্রিপুরা, কেরালা, তামিলনাড়ু, মণিপুর, পাঞ্জাব প্রভৃতি রাজ্যে উদযাপিত হয়ে আসছে বছরের পর বছর। তবে এখনকার উৎসব উদযাপন আর এখনকার উৎসব উদযাপনের মাকে রয়েছে বিস্তর ফারাক। পুরনো দিনে আজকের মতো বছরের প্রথম দিন হিসেবে বাঙালি সমস্ত বাঙালি-রেস্তোরাঁতে ভিড় জমাতো না, বা রাস্তায় আল্পনা এঁকে, ফুল দিয়ে সেজেগুজে সংগীত নৃত্য সহযোগে প্রভাতফেরিও বাব করত না। সেইসময় পয়লা বৈশাখ ছিল এক ঋতুস উৎসব আর এর মূল ভিত্তিই ছিল কৃষিকাজ। আজকের দিনের মতো আমরা তখন প্রযুক্তির এত ব্যাবহার জানতাম না, আমাদের অর্থনীতির সিংহভাগই নির্ভর করত প্রকৃতি, ঋতু, আবহাওয়া ইত্যাদির ওপর। এবাবে একটু হালকা করে পয়লা বৈশাখের সঙ্গে হালখাতার সম্পর্কটা তুলে ধরার চেষ্টা করি। ভারতবর্ষে মুসলমান শাসন শুরু হবার অনেক বছর পর মুঘল সম্রাট বাদশাহ আকবর হিজরী পঞ্জিকার প্রচলন শুরু করেন। প্রসঙ্গত বলে রাখি, হিজরী পঞ্জিকা শুরু হয় ৬২২ খ্রিস্টাব্দে, যে দিন পয়গম্বর মহম্মদ তার অনুগামীদের নিয়ে মক্কা থেকে মদিনা গিয়ে প্রথম ইসলাম সম্প্রদায় (উম্মাহ) প্রতিষ্ঠা করলেন।
সেই দিন থেকে হিজরী সালএর গণনা শুরু হয়। বাদশাহর নিদানমতো হিজরী পঞ্জিকা অনুসারে কৃষি পণ্যের খাজনা আদায় করা হত। এখানে বাধলো এক সমস্যা, আমাদের দেশে কৃষিকাজ ঋতুর ওপর নির্ভরশীল, আর হিজরী পঞ্জিকা চলে পুরোটাই চাঁদের ওপর নির্ভর করে। কর আদায় করতে গিয়ে শুরু হয় অত্যাচার, ঝামেলা। তারপরও কর আদায় ঠিক করা হয় না। হবে কোথা থেকে। ফসল ফলার সময় আর কর আদায়ের সময় তো পুরোই আলাদা। তাই, কর আদায়ের এই প্রক্রিয়াকে আরও সুসংগঠিত করার জন্য বাদশাহ তার রাজ-জ্যোতিষী ফাতুল্লাহ সিরাজীকে আদেশ দিলেন এমন এক পঞ্জিকা বানাতে যা এই সৌরপঞ্জিকা আর হিজরীর মেলবন্ধন করবে। মানুষ পেল এক নতুন পাঁজি, ফসলি সন। মতান্তরে এই পুরো কাজটা নাকি আকবর নয়, করেছিলেন হুসেন শাহী। কারণ, আকবরের জমানার অনেক আগে হুসেন শাহীর সময়ে এই ব্যবস্থার উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে ধরে নেওয়া যেতেই পারে, হুসেন শাহীর আমলে শুরু হলেও পাকাপাকিভাবে বলবৎ আকবরই করেন। বাংলার আরেক নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ চালু করেছিলেন পুণ্যাহ। এটি এক বিশেষ দিন, যে দিনে ভূমি রাজস্ব আদায় করা হত। এখানে একটু বলে রাখি, সূর্য সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করে আমাদের।
বঙ্গাব্দ কিন্তু তার অনেক আগে থেকেই চলে আসছে। শশাঙ্ক যেদিন থেকে বাংলার দায়িত্বভার নিয়েছিলেন সেদিন থেকে শুরু হয় বঙ্গাব্দ। নতুন নিয়ম হল চৈত্র মাসের শেষদিনের মধ্যে সমস্ত কর, মাশুল, খাজনা, শুল্ক ইত্যাদি যা আছে সব পরিশোধ করে তার পরের দিন নতুন বছরের প্রথম দিবস থেকে আবার নতুন ভাবে খাজনার হিসাব শুরু করা হবে। তখন থেকে বছরের প্রথম দিন ভূস্বামীরা অঞ্চলের অধিবাসীদের আমন্ত্রণ জানিয়ে তাদের মিষ্টান্ন সহযোগে খাওয়াদাওয়ার বন্দোবস্ত করতেন, সঙ্গে থাকত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বছরের পর বছর চলে আসা ঘটনাটি পরিণত হয়েছে এক সামাজিক আচারে। যার পরিবর্তিত রূপ আজ আমরা দেখতে পাই। আর এখান থেকেই শুরু হয় হালখাতার রেওয়াজ। পুরনো বছরের সব লেনদেন চুকিয়ে নতুন বছরে নতুন খাতায় আবার হিসেব শুরু হয় নতুন করে।
মনে করা হয়, লাঙল বা হালের দ্রব্যের হিসেব রাখার জন্য যে খাতা ব্যবহৃত হত, তারই নাম দেওয়া হয়েছিল হালখাতা। আবার অনেকে মনে করেন সংস্কৃতে হল মানে লাঙল হলেও, ফার্সিতে হাল মানে নতুন, সেখান থেকে হালখাতা কথাটি এসেছে। নানামতে বহুকাল আগে হালখাতা শব্দটি উঠে এলেও মুসলমান শাসকদের খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে তা নববর্ষের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়। পয়লা বৈশাখ, হালখাতা নিয়ে আছে নানা মুনির নানা মত। লোকগাথা, প্রচলিত গল্প ইত্যাদিতে এইরকম গল্পগুলোই ঘুরে-ফিরে আসে। আসল সত্যটি সত্যই তর্কসাপেক্ষ বলা যেতে পারে। তবে হালখাতার খাওয়াদাওয়ার প্রচলন বহু বছর। ধরেই চলে আসছে। আগে ভূস্বামীরা এলাকার অধিবাসীদের আমন্ত্রণ জানিয়ে মিষ্টান্ন ভোজ করাতেন। সেই হলখাতাই যখন কালক্রমে অন্য ব্যবসায়ের ব্যবহৃত হওয়া শুরু হয় তখন। সেখানেও সেই একই রীতি চলে।
চৈত্র মাসের শেষদিনের মধ্যে মহাজনের সমস্ত বকেয়া মিটিয়ে নতুন বছরে নতুন খাতা চালু করা। বেশকিছু বছর আগে অবধি দেখা গেছে, এমনকী এখনও বহু জায়গায় দেখা যায় মানুষ দোকানে দোকানে যান হালখাতা করতে, মানে নতুন বছরে কমবেশি যাইহোক কিছু বেচাকেনা করে নতুন করে ব্যবসার হিসেব চালু করা। ভূস্বামীদের। মতো ছোট ব্যবসায়ী, দোকানদার, স্বর্ণকারেরা বসে খাওয়াতে না পারলে একখানি মিষ্টির প্যাকেট যার মধ্যে গোটা কয়েক সন্দেশ, এক-আধটা কম রসের মিষ্টি আর একটি বা দুটি নোনতা খাবার নিমকি বা শিঙাড়া জাতীয় কিছু দিয়ে একটা। মিষ্টির প্যাকেট হাতে ধরিয়ে দিতেন সঙ্গে দিতেন একখানি বাংলা ক্যালেন্ডার। আমার ছোটবেলায় হালখাতা মানে আমি এটাই বুঝতাম, দোকানে গিয়ে কিছু কিনলে মিষ্টির প্যাকেট আর একটা ক্যালেন্ডার দেবে। পয়লা বৈশাখের সন্ধেবেলায় রাস্তায় বেরোলে দেখতে পেতাম একেকজন বুক ফুলিয়ে পাঁচ-ছটা করে মিষ্টির প্যাকেট আর ক্যালেন্ডারের রোল নিয়ে রাস্তা দিয়ে হেঁটে বাড়ির দিকে যাচ্ছেন। বেশ একটা গর্বের ব্যাপার ছিল তাদের কাছে। আবার তাদের দেখেই কিছু মানুষ বিদ্রূপ করে বলতেন, দেখ পাঁচ দোকানে বাকি খায়, তার আবার ফুটানি। এই রীতিটা মানুষ যেভাবেই নিক না কেন, আমার ফোকাস সবসময় ওই মিষ্টির প্যাকেটের দিকেই থাকত, আজও ওখানেই আছে।
এবারে একটু আমার ছোটবেলার পয়লা বৈশাখ, হালখাতার গল্পের সঙ্গে আমার ফোকাস মানে মিষ্টির প্যাকেটের কিছু স্মৃতি তুলে ধরি। ব্যবসায়ী পরিবারের ছেলে হবার সুবাদে পয়লা বৈশাখের সকালে স্নান করার পর চৈত্র সেলের থেকে কেনা নতুন জামা পরে যেতাম কালীঘাট। সেখানে প্রথমে ঝুড়ি কেনা হত, তারপর লাল শালু কাপড় সঙ্গে লক্ষ্মী গণেশের মূর্তি আর ফুল মালা যা লাগে। পাশের দোকান থেকেই কেনা হত লাল রঙের হালমাতা। যার ব্যবসা যত ভালো চলেছে সে নতুন বছরে তত মোটা খাতা কিনতেন। এরপর আমার প্রিয় পেড়া সন্দেশ। কালীঘাটের মায়ের প্রসাদ থেকে শুরু করে পয়লা বৈশাখের লক্ষ্মী গণেশের পুজো সবেতেই ব্যবহার হত এই পেড়া সন্দেশ।
এর পিছনে একটা গল্প আছে, ঠাকুরকে নাকি ছানার মিষ্টি প্রসাদ হিসেবে দিতে নেই। আমাদের সংস্কৃত গ্রন্থে দুধ দিয়ে তৈরি ক্ষীর ননি পায়েস এসবের উল্লেখ থাকলেও। কোথাও হানার নাম অবধি উচ্চারণ করা হয়নি। ছানাকে সবসময় দুখের বিকৃত রূপ বলেই ধরা হত, কারণ, দুধ নষ্ট হয়ে ছানা হয় বলে। ভারতীয়রা পর্তুগিজদের আসার আগে অবধি ছানার ব্যবহার কি করে করতে হয় জানত না। যদিও অনেকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্য থেকে অনেক আগেই ভারত পনির ঢুকেছে। সে ঢুকুক, অসুবিধা নেই, কিন্তু বাঙালিরা পর্তুগিজদের আসার পরই ছানা নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করা শুরু করে। বাঙালি মিষ্টি নির্মাতাদেরও এ নিয়ে অত মাথা ব্যথা ছিল না। কারণ ক্ষীরের মিষ্টি অনেকদিন টেকে, ফলে ব্যবসায়ে ক্ষতি বা অপচয় কম হত, তাই কেউ অত মাথা ঘামায়নি।
নবীনচন্দ্র, ভীম নাগের মতো মানুষেরা এসে মিষ্টিতে ছানার ব্যবহারকে এক অন্যপর্যায়ে নিয়ে গেছেন। আর স্বাদ ভালো ছিল বলে মানুষ সেটাকে স্বানন্দে গ্রহণ করেছেন। ফলে, পুজোয় যেখানে ক্ষীরের মিষ্টি ব্যবহৃত হত, সেখানে জায়গা করে নিল ছানার সন্দেশ। এই ছানার সন্দেশ যখন বাজারে প্রথম এল, তখন লোকে বলত একে ফিকে সন্দেশ। কারণ, বাজারে সেইসময় যেসব মিষ্টি পাওয়া যেত সবই মোটামুটি। কড়া পাকেরই হত। এটা ভাবা ভুল হবে, ছানা আসার পরই আমরা সন্দেশ বানানো শুরু করেছি। ছানার ব্যবহারের আগে আমরা বেসন, মুগডাল, নারকেল, গুড় প্রভৃতি উপকরণ দিয়ে সন্দেশ বানিয়ে এসেছি। সন্দেশ শব্দটি বড়ই জেনেরিক, কাঁচাগোল্লাও সন্দেশ, কালাকাদও সন্দেশ আবার অনভরাও সন্দেশ, এমনকী বিয়ের তত্ত্বে আমরা একটা সময় আপেল সন্দেশ, রাজহাঁসের সন্দেশ, শঙ্খ সন্দেশ, ইলিশ মাছের পেটি সন্দেশ থাকতে দেখেছি। এই জন্যই বললাম সন্দেশ শব্দটি মিষ্টির ক্ষেত্রে বড়ই জেনেরিক। আসলে সন্দেশ মানে তো বার্তা বা সংবাদ।
আগেকার দিনে কেউ কারওর বাড়ি কোনও সুসংবাদ নিয়ে গেলে মিষ্টি নিয়ে যেত। সেই মুখের সন্দেশ (বার্তা) থেকে হাতের মিষ্টির নাম হয়ে গেল সন্দেশ। এখন তেমন কারিগরও নেই, আর বানাতেও সময় লাগে বলে এগুলো ক্রমশ সরে গিয়ে জায়গা করে নিয়েছে চকোলেট দেওয়া ফিউশন মিষ্টি। তবে হ্যাঁ, বাংলার জেলাভিত্তিক একটা মিষ্টির চল আছে। হালখাতার মিষ্টির প্যাকেটে এর প্রভাব। আমরা দেখতে পাই। কয়েকটা উদাহরণ দিচ্ছি, পান্তুয়া এখন মোটামুটি সব জায়গাতে পাওয়া গেলেও, নদীয়ার জও ময়র প্রথম শুরু করেন পান্তুয়া, দেশভাগের পর কানসাট থেকে ময়রা বিজয়কুমার সাহা মালদহে এসে নিজস্ব মিষ্টি বানিয়ে নাম দিলেন কানসাট, মালদহের আরেকটি মিষ্টি নিমাই সন্ন্যাসীর উদ্দেশে বানানো রসকদম্ব, বর্ধমানের জমিদার বিজয়চাঁন মোহতাবকে লর্ড কার্জন ১৯০৪ সালে মহারাজ উপাধি দিতে আসবেন, সেই উপলক্ষ বিজয়চাঁদের আদেশে ভৈরবচন্দ্র বানালেন সীতাভোগ আর মিহিদানা, জনাইয়ের মন হরণকারী মনহরা, মুর্শিদাবাদ জেলার লালবাগের ময়রা নিমাই মণ্ডলের।
তৈরি ছানাবড়া বা কালোজাম, ঠাকুর শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ দেবের প্রিয় সাদা বোঁদে, মল্ল রাজাদের প্রিয় মেছেদার মেচা সন্দেশ ইত্যাদি ইত্যাদি সবই জেলা বা অঞ্চল ভিত্তিক মিষ্টি। আর এই সব মিষ্টিগুলো এতই বিখ্যাত যে, এই মিষ্টির নামে জায়গাটি সাধারণ মানুষের কাছে অতি পরিচিত হয়ে গেছে। ফলে, হালখাতার মিষ্টির প্যাকেটে এইসব মিষ্টি অঞ্চল বিশেষে তাদের জায়গা করে নেবে এটা ধরে নিতে বেশি কষ্ট করতে হয় না। যে কটা মিষ্টির নাম করলাম সেগুলো ছাড়াও আরো অনেক মিষ্টি আর তাদের গল্প আছে। সুযোগ পেলে পরবর্তীতে সেসন শোনাবো বাঙালির নববর্ষ, তার হালখাতা এবং হালখাতার মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে যেটুকু স্বল্প জ্ঞান ছিল, আপনাদের সঙ্গে ভাগ করলাম। নতুন বছর আপনাদের মিষ্টিময় হোক, এই কামনাই করি। মনে, প্রাণে, কথায় মিষ্টি লেগে থাকুক শুধু রক্তে মিষ্টি না এলেই হল।