স্বাস্থ্য
নিজস্ব প্রতিনিধি
একসময় ৩৫ বছরের পর গর্ভধারণকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘অ্যাডভান্সড ম্যাটার্নাল এজ’ বা অপেক্ষাকৃত বেশি বয়সে মাতৃত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হত। কিন্তু সময় বদলেছে। উচ্চশিক্ষা, কর্মজীবনের অগ্রাধিকার, আর্থিক পরিকল্পনা, দ্বিতীয় বিয়ে কিংবা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের কারণে এখন অনেক মহিলাই জীবনের চল্লিশের দশকে মাতৃত্বের কথা ভাবছেন। ফলে ৪০ বছরের পর, এমনকি ৪৩ বছর বয়সেও গর্ভধারণের ঘটনা আগের তুলনায় অনেক বেশি দেখা যাচ্ছে।তবে এই প্রবণতার সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও উঠে আসছে—৪৩ বছর বয়সে গর্ভধারণ কতটা নিরাপদ? সামাজিক মাধ্যমে প্রায়ই এমন খবর দেখা যায়, যেখানে চল্লিশোর্ধ্ব বয়সে কোনও তারকা বা পরিচিত ব্যক্তি মা হয়েছেন। সেই সব খবর অনেককে অনুপ্রাণিত করলেও চিকিৎসকেরা মনে করিয়ে দেন, প্রতিটি গর্ভধারণই আলাদা এবং বয়সের সঙ্গে কিছু স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়। তাই বাস্তব তথ্য জানা অত্যন্ত জরুরি।
স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, ৪৩ বছর বয়সে গর্ভধারণ অসম্ভব নয়। অনেক মহিলা এই বয়সেও সুস্থভাবে সন্তান জন্ম দেন। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে ডিম্বাণুর সংখ্যা এবং গুণগত মান কমতে থাকে। এর ফলে গর্ভধারণের সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে হ্রাস পায়। অর্থাৎ এই বয়সে গর্ভধারণ সম্ভব হলেও তা সাধারণত কম বয়সের তুলনায় বেশি চ্যালেঞ্জপূর্ণ হতে পারে।চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্য অনুযায়ী, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উর্বরতার হার ধীরে ধীরে কমে। ৪০ বছরের পর সেই পরিবর্তন আরও স্পষ্ট হয়। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই গর্ভধারণে বেশি সময় লাগতে পারে। কেউ কেউ সহায়ক প্রজনন প্রযুক্তি বা ফার্টিলিটি ট্রিটমেন্টের সাহায্যও নিতে পারেন। তবে চিকিৎসকেরা বলছেন, সব মহিলার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি একরকম নয়। কারও প্রজননক্ষমতা তুলনামূলকভাবে ভালো থাকতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে আগে থেকেই কিছু স্বাস্থ্যগত সমস্যা থাকতে পারে।
৪৩ বছর বয়সে গর্ভধারণের ক্ষেত্রে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়, তা হল মায়ের সামগ্রিক স্বাস্থ্য। এই বয়সে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, থাইরয়েডের সমস্যা বা অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক অসুস্থতার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে। যদি এই ধরনের সমস্যা আগে থেকেই থাকে, তাহলে গর্ভাবস্থার সময় অতিরিক্ত পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন হতে পারে।বিশেষজ্ঞদের মতে, বয়স বাড়ার সঙ্গে কিছু গর্ভকালীন জটিলতার ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়। যেমন গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপ, প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়া, গর্ভকালীন ডায়াবেটিস, প্লাসেন্টাসংক্রান্ত সমস্যা এবং সময়ের আগে প্রসবের সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রত্যেক ৪৩ বছর বয়সি গর্ভবতী মহিলার ক্ষেত্রেই এই সমস্যাগুলি দেখা দেবে। বরং নিয়মিত চিকিৎসা পর্যবেক্ষণ এবং সঠিক যত্নের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।ভ্রূণের স্বাস্থ্যের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বয়স বাড়ার সঙ্গে কিছু জিনগত বা ক্রোমোজোমজনিত সমস্যার ঝুঁকি বৃদ্ধি পেতে পারে। এই কারণেই চল্লিশোর্ধ্ব বয়সে গর্ভধারণের ক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা সাধারণত কিছু অতিরিক্ত স্ক্রিনিং এবং পরীক্ষা করার পরামর্শ দেন। এগুলির উদ্দেশ্য হল গর্ভাবস্থার অগ্রগতি এবং ভ্রূণের সুস্থতা সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া।তবে বয়সকে একমাত্র নির্ধারক হিসেবে দেখা ঠিক নয়। বর্তমানে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে মাতৃত্বকালীন পরিচর্যা আগের তুলনায় অনেক উন্নত হয়েছে। নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা, উন্নত স্ক্রিনিং পদ্ধতি এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে অনেক মহিলা নিরাপদভাবে গর্ভাবস্থা সম্পূর্ণ করতে সক্ষম হচ্ছেন।মনোবিজ্ঞানীদের মতে, বেশি বয়সে মাতৃত্বের কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। জীবনের এই পর্যায়ে অনেকেই আর্থিকভাবে স্থিতিশীল থাকেন, সিদ্ধান্ত গ্রহণে পরিণত হন এবং সন্তান লালনপালনের বিষয়ে আরও সচেতন থাকেন। ফলে মানসিক প্রস্তুতি অনেক ক্ষেত্রে বেশি দৃঢ় হতে পারে। অবশ্য প্রতিটি পরিবারের অভিজ্ঞতা আলাদা এবং কোনও বয়সই নিখুঁত নয়।সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক মাধ্যমে এমন ধারণাও ছড়িয়ে পড়েছে যে চল্লিশের পর গর্ভধারণ এখন একেবারেই সাধারণ এবং ঝুঁকিমুক্ত। চিকিৎসকেরা এই ধারণার বিষয়ে সতর্ক করছেন। কারণ চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করলেও বয়সজনিত জৈবিক পরিবর্তন সম্পূর্ণভাবে দূর করতে পারে না। তাই অন্যের অভিজ্ঞতা দেখে নিজের পরিস্থিতি বিচার করা উচিত নয়।যাঁরা ৪৩ বছর বয়সে মাতৃত্বের কথা ভাবছেন, তাঁদের জন্য গর্ভধারণের আগে স্বাস্থ্যপরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রক্তচাপ, রক্তে শর্করার মাত্রা, থাইরয়েডের কার্যকারিতা এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যসূচক পরীক্ষা করে নেওয়া উপকারী হতে পারে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ভিটামিন গ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ।বিশেষজ্ঞদের মতে, গর্ভধারণের পুরো সময় জুড়ে নিয়মিত চিকিৎসা পর্যবেক্ষণ বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। কোনও উপসর্গকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয় এবং নির্ধারিত সময় অনুযায়ী সমস্ত পরীক্ষা করানো প্রয়োজন। কারণ সময়মতো সমস্যার শনাক্তকরণ অনেক ক্ষেত্রেই জটিলতা কমাতে সাহায্য করে।সমাজে এখনও অনেক সময় বেশি বয়সে মাতৃত্ব নিয়ে নানা ধরনের মন্তব্য বা পূর্বধারণা দেখা যায়। কিন্তু চিকিৎসকেরা মনে করিয়ে দেন, মাতৃত্বের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত ব্যক্তিগত বিষয়। একজন মহিলা কখন মা হবেন, তা নির্ভর করে তাঁর শারীরিক স্বাস্থ্য, মানসিক প্রস্তুতি, পারিবারিক পরিস্থিতি এবং ব্যক্তিগত পছন্দের উপর।সব মিলিয়ে বলা যায়, ৪৩ বছর বয়সে গর্ভধারণ সম্ভব এবং অনেক ক্ষেত্রেই নিরাপদভাবে সম্পন্ন করা যায়। তবে এটি তুলনামূলকভাবে উচ্চ পর্যায়ের চিকিৎসা নজরদারি এবং সচেতনতার দাবি রাখে। বয়সের কারণে কিছু ঝুঁকি বৃদ্ধি পেলেও সঠিক পরিকল্পনা, নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শের মাধ্যমে সুস্থ মাতৃত্বের সম্ভাবনা অনেকটাই বাড়ানো সম্ভব।
অতএব, ৪৩ বছর বয়সে মাতৃত্বকে না অযথা ভয় পাওয়ার প্রয়োজন আছে, না একে সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত বলে ধরে নেওয়া উচিত। বাস্তব তথ্য, ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য পরিস্থিতি এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরামর্শের ভিত্তিতেই এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ মাতৃত্বের যাত্রাপথে বয়স একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলেও, সেটিই একমাত্র নির্ধারক নয়।