6th Oct 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

সারাক্ষণ এসি-তে থাকলে শরীরের কী ক্ষতি হতে পারে?

স্বাস্থ্য

নিজস্ব প্রতিনিধি


গ্রীষ্মের দাবদাহ কিংবা আর্দ্র আবহাওয়ায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘর এখন অনেকের কাছেই স্বস্তির অন্য নাম। বাড়ি, অফিস, শপিং মল, গাড়ি—দিনের বেশির ভাগ সময়ই অনেক মানুষ এসি-র মধ্যে কাটান। বিশেষ করে শহুরে জীবনে এসি ছাড়া কাজ করাই যেন কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে চিকিৎসকদের মতে, এসি ব্যবহার যতটা আরামদায়ক, সারাক্ষণ তার মধ্যে থাকার অভ্যাস শরীরের উপর কিছু নেতিবাচক প্রভাবও ফেলতে পারে। যদিও এসি নিজে কোনও রোগের কারণ নয়, কিন্তু দীর্ঘ সময় অনুপযুক্ত তাপমাত্রায় থাকা বা যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাব বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।সবচেয়ে সাধারণ সমস্যা হল ত্বক ও শরীরে অতিরিক্ত শুষ্কতা। এসি ঘরের বাতাস থেকে আর্দ্রতা কমিয়ে দেয়। ফলে দীর্ঘ সময় সেখানে থাকলে ত্বক শুষ্ক হয়ে যেতে পারে, ঠোঁট ফেটে যাওয়া, চোখে শুষ্কভাব বা চুলের রুক্ষতা দেখা দিতে পারে। যাঁদের একজিমা বা সংবেদনশীল ত্বকের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে এই অস্বস্তি আরও বাড়তে পারে। তাই পর্যাপ্ত জল পান করার পাশাপাশি প্রয়োজনে ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।এসি-তে দীর্ঘক্ষণ থাকলে অনেকের নাক ও গলাতেও অস্বস্তি হয়। ঠান্ডা ও শুষ্ক বাতাসের কারণে নাকের ভিতরের শ্লেষ্মা শুকিয়ে যেতে পারে, যার ফলে গলা খুসখুস করা, নাক বন্ধ লাগা বা হালকা জ্বালাভাব অনুভূত হতে পারে। যাঁদের অ্যালার্জি বা সাইনাসের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে লক্ষণগুলি কিছুটা বেড়ে যেতে পারে। তবে এর জন্য শুধুমাত্র এসিকে দায়ী করা ঠিক নয়; ঘরের ধুলো, অপরিষ্কার ফিল্টার এবং বাতাসের মানও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।মাথাব্যথা এবং ক্লান্তির অভিযোগও অনেকের মধ্যে দেখা যায়। দীর্ঘ সময় খুব ঠান্ডা ঘরে থাকলে শরীরকে নিজের তাপমাত্রা বজায় রাখতে অতিরিক্ত কাজ করতে হয়। আবার ঘরের বাইরে প্রচণ্ড গরম এবং ভিতরে অতিরিক্ত ঠান্ডা—এই তাপমাত্রার বড় পার্থক্যের কারণে কিছু মানুষের মাথাব্যথা বা অস্বস্তি হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসির তাপমাত্রা খুব কম না রেখে সাধারণত ২৪ থেকে ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখাই আরামদায়ক এবং তুলনামূলকভাবে স্বাস্থ্যসম্মত।দীর্ঘক্ষণ একভাবে বসে এসি-ঘরে কাজ করার ফলে ঘাড়, কাঁধ বা কোমরের ব্যথাও বাড়তে পারে। যদিও এর জন্য সরাসরি এসি দায়ী নয়, তবে ঠান্ডা পরিবেশে পেশি কিছুটা শক্ত হয়ে যেতে পারে এবং দীর্ঘক্ষণ একই ভঙ্গিতে বসে থাকলে ব্যথা আরও বেশি অনুভূত হয়। তাই প্রতি ৩০ থেকে ৬০ মিনিট অন্তর উঠে কিছুক্ষণ হাঁটা এবং হালকা স্ট্রেচিং করা জরুরি।যাঁদের হাঁপানি বা শ্বাসকষ্টের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে এসির পরিচ্ছন্নতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ফিল্টার পরিষ্কার না করলে সেখানে ধুলো, ছত্রাক বা অন্যান্য অ্যালার্জেন জমে যেতে পারে। সেগুলি বাতাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে অ্যালার্জি বা শ্বাসকষ্টের উপসর্গ বেড়ে যেতে পারে। তাই নিয়মিত এসির ফিল্টার পরিষ্কার এবং নির্ধারিত সময়ে সার্ভিসিং করানো অত্যন্ত প্রয়োজন।অনেকেই মনে করেন, সারাক্ষণ এসিতে থাকলে সহজেই সর্দি-কাশি হয়। বাস্তবে ঠান্ডা বাতাস ভাইরাস তৈরি করে না। সাধারণ সর্দি-কাশির মূল কারণ বিভিন্ন ভাইরাস। তবে অতিরিক্ত ঠান্ডা ও শুষ্ক পরিবেশ কিছু মানুষের নাক ও গলার স্বাভাবিক প্রতিরোধক্ষমতাকে সাময়িকভাবে প্রভাবিত করতে পারে, ফলে সংক্রমণ হলে উপসর্গ বেশি অনুভূত হতে পারে। তাই এসির তাপমাত্রা অযথা কমিয়ে না রাখাই ভালো।অফিসে দীর্ঘ সময় এসিতে কাজ করা অনেকের ক্ষেত্রে চোখের সমস্যাও বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে যাঁরা সারাক্ষণ কম্পিউটারের সামনে বসে থাকেন, তাঁদের চোখের পলক ফেলার হার কমে যায়। তার সঙ্গে এসির শুষ্ক বাতাস মিলিয়ে চোখে জ্বালাপোড়া, শুষ্কতা বা ঝাপসা দেখার সমস্যা হতে পারে। এই সমস্যা এড়াতে নির্দিষ্ট সময় অন্তর স্ক্রিন থেকে চোখ সরানো এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী লুব্রিকেটিং আই ড্রপ ব্যবহার করা যেতে পারে।হঠাৎ খুব ঠান্ডা ঘর থেকে প্রচণ্ড গরমে বেরিয়ে গেলে বা উল্টোটা হলে শরীরকে দ্রুত তাপমাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। বয়স্ক ব্যক্তি, শিশু এবং হৃদ্‌রোগে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন কিছুটা বেশি অস্বস্তিকর হতে পারে। তাই বাইরে বেরোনোর আগে কয়েক মিনিট অপেক্ষা করে শরীরকে স্বাভাবিক তাপমাত্রার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া ভালো।তবে এসির ইতিবাচক দিকও রয়েছে। অতিরিক্ত গরমে হিট এক্সহস্টশন বা হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে এসি কার্যকর ভূমিকা পালন করে। বয়স্ক ব্যক্তি, ছোট শিশু, গর্ভবতী মহিলা এবং কিছু দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত মানুষের জন্য তীব্র গরমের সময় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ অনেক ক্ষেত্রেই নিরাপদ। তাই এসি ব্যবহার করা ক্ষতিকর নয়; বরং সঠিকভাবে ব্যবহার করাই মূল বিষয়।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, এসির তাপমাত্রা ২৪–২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে রাখুন, নিয়মিত ফিল্টার পরিষ্কার করুন, পর্যাপ্ত জল পান করুন এবং দীর্ঘক্ষণ একটানা এসি-ঘরে বসে না থেকে মাঝেমধ্যে বাইরে বেরিয়ে কিছুক্ষণ হাঁটুন। ত্বক ও চোখের যত্ন নিন এবং ঘরের বায়ু চলাচলের দিকেও নজর দিন। এই কয়েকটি সহজ অভ্যাস মেনে চললে এসির আরামও উপভোগ করা যাবে, আবার শরীরের সম্ভাব্য সমস্যার ঝুঁকিও অনেকটাই কমানো সম্ভব।

Archive

Most Popular