6th Oct 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

অবসাদ আর ক্লান্তি কি সবসময় থাইরয়েডের লক্ষণ? নেপথ্যে থাকতে পারে PCOS-ও!

স্বাস্থ্য

নিজস্ব প্রতিনিধি


সারাক্ষণ ক্লান্ত লাগছে, কাজের প্রতি আগ্রহ কমে যাচ্ছে, ঘুমিয়েও শরীর সতেজ লাগছে না, ওজন বাড়ছে কিংবা মন খারাপের অনুভূতি বারবার ফিরে আসছে—এমন উপসর্গ দেখা দিলে অনেকেই প্রথমেই থাইরয়েড সমস্যার কথা ভাবেন। কারণ দীর্ঘদিন ধরেই অবসাদ, ক্লান্তি এবং ওজন বৃদ্ধির মতো লক্ষণগুলিকে থাইরয়েডের সঙ্গে যুক্ত করা হয়ে থাকে। তবে চিকিৎসকদের মতে, এই উপসর্গগুলির জন্য শুধু থাইরয়েড দায়ী—এমন ধারণা সবসময় সঠিক নয়। বিশেষ করে মহিলাদের ক্ষেত্রে এর নেপথ্যে থাকতে পারে আরেকটি সাধারণ কিন্তু প্রায়শই উপেক্ষিত হরমোনজনিত সমস্যা—পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম বা PCOS।বর্তমানে PCOS বিশ্বজুড়ে প্রজননক্ষম বয়সের মহিলাদের মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ হরমোনজনিত সমস্যাগুলির অন্যতম। চিকিৎসকদের মতে, এটি শুধু মাসিকের অনিয়ম বা সন্তানধারণের সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; বরং শরীরের নানা ধরনের পরিবর্তন এবং উপসর্গের কারণ হতে পারে। অথচ অনেক ক্ষেত্রেই এই লক্ষণগুলি অন্য সমস্যার সঙ্গে গুলিয়ে যায়।থাইরয়েড এবং PCOS—দুটি অবস্থারই কিছু উপসর্গ একে অপরের সঙ্গে মিল থাকতে পারে। যেমন ক্লান্তি, ওজন বৃদ্ধি, মেজাজের পরিবর্তন, মনোযোগে সমস্যা এবং অবসাদের অনুভূতি। ফলে শুধুমাত্র উপসর্গ দেখে নির্দিষ্ট কারণ চিহ্নিত করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। এই কারণেই চিকিৎসকেরা সঠিক রোগনির্ণয়ের উপর জোর দেন।থাইরয়েড গ্রন্থি শরীরের বিপাকক্রিয়া বা মেটাবলিজ়ম নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যখন থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা কমে যায়, অর্থাৎ হাইপোথাইরয়েডিজ়ম দেখা দেয়, তখন শরীরের বিভিন্ন কার্যকলাপ ধীর হয়ে যেতে পারে। এর ফলে ক্লান্তি, ওজন বৃদ্ধি, ঠান্ডা বেশি লাগা, ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া এবং মন খারাপের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।অন্যদিকে PCOS একটি জটিল হরমোনজনিত অবস্থা, যেখানে ডিম্বাশয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রমে পরিবর্তন ঘটে। এর ফলে মাসিক অনিয়মিত হতে পারে, মুখে বা শরীরে অতিরিক্ত লোম গজাতে পারে, ব্রণ দেখা দিতে পারে এবং অনেকের ক্ষেত্রে ওজন নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে। তবে বিষয়টি শুধু এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, PCOS আক্রান্ত অনেক মহিলাই দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি এবং মানসিক অবসাদের কথাও জানান।গবেষণায় দেখা গেছে, PCOS-এর সঙ্গে ইনসুলিন প্রতিরোধ, প্রদাহজনিত পরিবর্তন এবং হরমোনের ভারসাম্যহীনতার সম্পর্ক থাকতে পারে। এই পরিবর্তনগুলি শরীরের শক্তির মাত্রা এবং মানসিক সুস্থতার উপর প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে অনেক সময় PCOS-জনিত ক্লান্তি সাধারণ অবসাদ বা জীবনযাত্রাজনিত ক্লান্তি বলে ভুল হতে পারে।মনোবিজ্ঞানীরাও এই বিষয়ে সতর্ক করছেন। PCOS আক্রান্ত মহিলাদের মধ্যে উদ্বেগ এবং বিষণ্নতার প্রবণতা সাধারণ জনসংখ্যার তুলনায় কিছুটা বেশি দেখা যেতে পারে। এর কারণ শুধুমাত্র হরমোনগত পরিবর্তন নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে উপসর্গ নিয়ে লড়াই করা, শারীরিক পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগ এবং ভবিষ্যৎ প্রজননক্ষমতা নিয়ে দুশ্চিন্তাও ভূমিকা রাখতে পারে।বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক সময় একজন মহিলা ক্লান্তি এবং ওজন বৃদ্ধির কারণে থাইরয়েড পরীক্ষা করান। রিপোর্ট স্বাভাবিক এলে তিনি ধরে নেন যে সমস্যার কোনও নির্দিষ্ট কারণ নেই। অথচ বাস্তবে PCOS বা অন্য কোনও হরমোনজনিত সমস্যা তার নেপথ্যে থাকতে পারে। তাই উপসর্গ দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ।তবে ক্লান্তি এবং অবসাদের কারণ শুধু থাইরয়েড বা PCOS-ই নয়। রক্তাল্পতা, ভিটামিনের ঘাটতি, ঘুমের সমস্যা, মানসিক চাপ, বিষণ্নতা, ডায়াবেটিস কিংবা অন্যান্য শারীরিক সমস্যাও এর জন্য দায়ী হতে পারে। তাই শুধুমাত্র ইন্টারনেটের তথ্য বা সামাজিক মাধ্যমের পরামর্শের ভিত্তিতে নিজে নিজে সিদ্ধান্তে পৌঁছনো উচিত নয়।বর্তমানে সামাজিক মাধ্যমে PCOS নিয়ে সচেতনতা বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই সঙ্গে কিছু ভুল ধারণাও ছড়িয়েছে। অনেকেই মনে করেন, PCOS থাকলেই সব ধরনের ক্লান্তি বা ওজন বৃদ্ধির কারণ সেটিই। আবার কেউ ভাবেন, PCOS মানেই ভবিষ্যতে মা হওয়া অসম্ভব। চিকিৎসকদের মতে, এই দুই ধারণাই ভুল। PCOS একটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য অবস্থা এবং সঠিক চিকিৎসা ও জীবনযাপনের মাধ্যমে অনেক মহিলাই সুস্থ জীবনযাপন করেন।স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি ক্লান্তি, অনিয়মিত মাসিক, ওজনের পরিবর্তন, ব্রণ, অতিরিক্ত লোম গজানো বা অন্যান্য হরমোনজনিত লক্ষণ একসঙ্গে দেখা যায়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজন হলে রক্তপরীক্ষা, হরমোন মূল্যায়ন এবং অন্যান্য পরীক্ষার মাধ্যমে কারণ নির্ধারণ করা যেতে পারে।জীবনযাপনের পরিবর্তনও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সুষম খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ—থাইরয়েড ও PCOS উভয় ক্ষেত্রেই উপকারী হতে পারে। তবে কোনও নির্দিষ্ট ডায়েট বা ঘরোয়া উপায়কে ‘অলৌকিক সমাধান’ বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।চিকিৎসকদের মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল নিজের শরীরের সংকেতকে গুরুত্ব দেওয়া। দীর্ঘদিন ধরে ক্লান্তি বা অবসাদ অনুভব করলে সেটিকে শুধু ব্যস্ত জীবনযাপনের ফল বলে উড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়। কারণ অনেক সময় এই ধরনের উপসর্গই শরীরের কোনও অন্তর্নিহিত সমস্যার প্রথম ইঙ্গিত হতে পারে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, অবসাদ এবং ক্লান্তি সবসময় থাইরয়েড সমস্যার লক্ষণ নয়। বিশেষ করে মহিলাদের ক্ষেত্রে PCOS-ও এর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে। তবে শুধুমাত্র উপসর্গ দেখে সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব নয়। সঠিক রোগনির্ণয় এবং চিকিৎসা পরামর্শই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

অতএব, যদি দীর্ঘদিন ধরে ক্লান্তি, শক্তিহীনতা বা মেজাজের পরিবর্তন অনুভব করেন, তাহলে নিজে নিজে রোগ নির্ণয় না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ। কারণ সমস্যার প্রকৃত কারণ জানা গেলে তবেই তার উপযুক্ত সমাধান সম্ভব।

Archive

Most Popular