স্বাস্থ্য
নিজস্ব প্রতিনিধি
সন্তানের রাত জাগা বা ঠিক মতো ঘুম না হওয়া বাবা-মায়ের জন্য এক বড় সমস্যা। দিনের শেষে সন্তান যখন ঘুমোতে চায় না বা মাঝরাতে বারবার কেঁদে ওঠে, তখন পুরো পরিবারের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য নিরবিচ্ছিন্ন ঘুম অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেক শিশু ঘুমোতে দেরি করে, আবার অনেকের রাতভর ঘুম ভেঙে যায়। এই সমস্যার সমাধান পেতে হলে কিছু সহজ কিন্তু কার্যকর কৌশল মেনে চলতে হবে।
মস্তিষ্কে নতুন তথ্য সংরক্ষণ ও শেখার ক্ষমতা বাড়ে।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী হয়।
মানসিক স্থিরতা ও আবেগ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
শিশুর বয়স যত কম, তত বেশি ঘুমের প্রয়োজন। নবজাতকের দিনে ১৪–১৭ ঘণ্টা পর্যন্ত ঘুম দরকার হয়, আর বড় হয়ে গেলে তা ধীরে ধীরে ৮–১০ ঘণ্টায় নেমে আসে।
১. অতিরিক্ত উদ্দীপনা – শোওয়ার আগে বেশি খেলাধুলা, টিভি বা মোবাইল দেখা।
২. অনিয়মিত রুটিন – নির্দিষ্ট সময়ে শোওয়া-ওঠার অভ্যাস না থাকা।
৩. শারীরিক অসুবিধা – পেটের ব্যথা, দাঁত ওঠা, সর্দি কাশি।
৪. পরিবেশগত কারণ – ঘরে অতিরিক্ত আলো, শব্দ বা অস্বস্তিকর তাপমাত্রা।
৫. অভ্যাসগত সমস্যা – কোলে না নিলে না ঘুমনো, দুধ না খেলে না ঘুমনো ইত্যাদি।
শিশুকে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে শুইয়ে দিন। শোওয়ার আগে কয়েকটি অভ্যাস তৈরি করতে পারেন,
হালকা গরম জলে স্নান
পরিষ্কার জামা পরানো
লোরি শোনানো
আলো মৃদু করে দেওয়া
এতে শরীর ও মন দুটোই বুঝতে শিখবে যে ঘুমানোর সময় হয়ে এসেছে।
ঘর যেন খুব উজ্জ্বল না হয়, মৃদু আলো রাখুন।
শব্দ কমিয়ে আনুন।
বিছানায় নরম চাদর ও আরামদায়ক বালিশ ব্যবহার করুন।
গরমকালে ঘর শীতল আর শীতকালে ঘর উষ্ণ রাখুন।
শিশুরা নিরাপদ ও আরামদায়ক পরিবেশে দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ে। মায়ের মুখে গল্প শোনা বা লোরি শুনে শিশুরা নিরাপত্তা ও ভালোবাসার অনুভূতি পায়। এতে তারা ধীরে ধীরে শান্ত হয় ও ঘুমের দিকে যায়। প্রতিদিন শোওয়ার আগে কয়েক মিনিট গল্পের সময় তৈরি করলে অভ্যাস গড়ে ওঠে। ছোট শিশুদের কোলে দোলানো বা শরীরে হালকা নারকেল তেল/বেবি অয়েল দিয়ে মালিশ করলে শরীর শিথিল হয়, ঘুম আসতে সহজ হয়। তবে খুব জোরে নয়, বরং স্নিগ্ধ স্পর্শ শিশুকে শান্ত করে। টিভি, মোবাইল বা ট্যাবের আলো শিশুর মস্তিষ্ককে উদ্দীপিত করে তোলে। এতে ঘুম আসতে দেরি হয়। অন্তত শোওয়ার এক ঘণ্টা আগে থেকে স্ক্রিন টাইম বন্ধ রাখুন। খালি পেটে শিশুরা ভালো ঘুমোতে পারে না। শোওয়ার আগে বয়স অনুযায়ী হালকা খাবার বা দুধ দিন। তবে বেশি খাওয়াবেন না, তাতেও অস্বস্তি হতে পারে। খুব বেশি সময় ধরে দুপুরে ঘুমালে রাতে ঘুম আসতে দেরি হয়। বয়স অনুযায়ী দিনে ঘুমের সময় নির্দিষ্ট রাখুন। যেমন টডলারদের দিনে ১-২ ঘণ্টা ঘুম যথেষ্ট। অনেক শিশু একা ঘুমোতে ভয় পায়। বাবা-মায়ের কাছাকাছি শুইয়ে দেওয়া, প্রিয় খেলনা বা নরম টেডি বিয়ার সঙ্গে রাখা শিশুকে নিশ্চিন্ত করে। এতে রাতের কান্নাকাটি কমে। শিশুর ঘুমের অভ্যাস হঠাৎ পাল্টানো যায় না। ধীরে ধীরে সময় মেনে শোওয়াতে হবে। প্রতিদিন ১০–১৫ মিনিট আগেভাগে শুইয়ে দিলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে অভ্যাস তৈরি হয়ে যাবে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো ধৈর্য। প্রথম দিকে বাবা-মায়ের অনেক কষ্ট হতে পারে, কিন্তু নিয়ম মেনে চললে সন্তানের ঘুমের ধরণ ঠিক হয়ে যায়।
যদি দেখেন,
শিশু নিয়মিত রাতভর জেগে থাকে
শ্বাসকষ্ট বা ঘুমের মধ্যে হঠাৎ জেগে ওঠে
অতিরিক্ত দুঃস্বপ্ন দেখে
দিনে সব সময় ক্লান্ত বা বিরক্ত থাকে
তাহলে শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
শিশুর ঘুম শুধুমাত্র তাদের স্বাস্থ্যের জন্য নয়, বাবা-মায়ের মানসিক শান্তির জন্যও জরুরি। বাবা-মাকে বুঝতে হবে যে ঘুমের সমস্যা কোনো বদঅভ্যাস নয়, বরং এটি বয়স, পরিবেশ ও অভ্যাসের উপর নির্ভরশীল। তাই ধৈর্য ধরে, ভালোবাসা দিয়ে, এবং নিয়ম মেনে চললে সমস্যার সমাধান সম্ভব। শিশুর ঘুম তার বেড়ে ওঠার এক অপরিহার্য অংশ। রাতের ঘুমহীনতা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে তা শুধু শিশুর নয়, পুরো পরিবারের জন্য সমস্যার সৃষ্টি করে। কিন্তু কিছু সহজ নিয়ম, স্নেহময় যত্ন এবং সঠিক অভ্যাস গড়ে তুললেই শিশু ধীরে ধীরে শান্তিতে ঘুমোতে শেখে। তাই বাবা-মায়েরা আজ থেকেই শুরু করুন নিয়মিত শোওয়ার রুটিন, আর দেখে নিন কিভাবে আপনার সন্তান রাতের অন্ধকারে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ছে।