স্বাস্থ্য
নিজস্ব প্রতিনিধি
গরমের দিনে বাড়ি থেকে বেরোলেই ঘাম ঝরতে শুরু করে। শরীর থেকে জল ও খনিজ বেরিয়ে যাওয়ায় ক্লান্তি, মাথাব্যথা, দুর্বলতা এমনকি ডিহাইড্রেশনের ঝুঁকিও বাড়ে। তাই এই সময় শরীরকে পর্যাপ্ত হাইড্রেট রাখা অত্যন্ত জরুরি। অনেকেই গরমে এক গ্লাস ঠান্ডা আইসড কফি পান করে স্বস্তি খোঁজেন, আবার কেউ বেছে নেন লেবুর জল। কিন্তু শরীরে জলের ঘাটতি পূরণ করার ক্ষেত্রে কোনটি বেশি কার্যকর? পুষ্টিবিদদের মতে, এই দুই পানীয়ের কাজ এক নয়। তাই কোন পরিস্থিতিতে কোনটি উপযুক্ত, তা বোঝা জরুরি।শরীরকে হাইড্রেট রাখার মূল উদ্দেশ্য হলো পর্যাপ্ত জল এবং প্রয়োজনীয় ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য বজায় রাখা। ঘামের সঙ্গে শুধু জলই নয়, সোডিয়াম, পটাশিয়ামসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ খনিজও শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। তাই শুধু তৃষ্ণা মেটানো নয়, শরীরের তরলের ভারসাম্য বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।এই দিক থেকে লেবুর জল অনেক ক্ষেত্রেই ভালো বিকল্প। এক গ্লাস জলে লেবুর রস মিশিয়ে পান করলে শরীরে জল পৌঁছায়, পাশাপাশি লেবু থেকে কিছু পরিমাণ ভিটামিন সি-ও পাওয়া যায়। যদি এতে অল্প পরিমাণ লবণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সামান্য চিনি বা গুড় যোগ করা হয়, তাহলে তা ঘামের ফলে হারিয়ে যাওয়া কিছু ইলেকট্রোলাইটের ঘাটতি পূরণেও সাহায্য করতে পারে। তবে যাঁদের ডায়াবেটিস রয়েছে, তাঁদের অতিরিক্ত চিনি না মিশিয়ে বা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পান করা উচিত।অন্যদিকে আইসড কফির প্রধান উপাদান হলো কফি, যার মধ্যে ক্যাফেইন থাকে। অনেকের ধারণা, ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় শরীরকে ডিহাইড্রেট করে। বাস্তবে পরিমিত পরিমাণে কফি পান করলে তা শরীরের দৈনিক তরল গ্রহণের অংশ হিসেবেই ধরা যায়। তবে খুব বেশি ক্যাফেইন গ্রহণ করলে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে বারবার প্রস্রাবের প্রবণতা বাড়তে পারে। তাই গরমে বারবার জল খাওয়ার বদলে শুধু আইসড কফির উপর নির্ভর করা ঠিক নয়।আইসড কফির আরেকটি বিষয় হলো এতে কী কী উপাদান যোগ করা হচ্ছে। ক্যাফে বা রেস্তোরাঁয় বিক্রি হওয়া অনেক আইসড কফিতে অতিরিক্ত চিনি, সিরাপ, হুইপড ক্রিম বা আইসক্রিম মেশানো থাকে। এতে ক্যালোরির পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়। যারা ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে চান বা ডায়াবেটিসে ভুগছেন, তাঁদের জন্য এই ধরনের পানীয় নিয়মিত খাওয়া স্বাস্থ্যকর নয়।অন্যদিকে বাড়িতে তৈরি সাধারণ লেবুর জল তুলনামূলকভাবে কম ক্যালোরিযুক্ত এবং সতেজতা দেয়। এতে অতিরিক্ত চিনি না মিশিয়ে পান করলে এটি শরীরের জন্য আরও উপকারী হতে পারে। তবে অতিরিক্ত লেবুর রস খেলে কিছু মানুষের অম্বল বা অ্যাসিডিটির সমস্যা বাড়তে পারে। তাই পরিমিত পরিমাণে পান করাই ভালো।বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি লক্ষ্য হয় শরীরকে হাইড্রেট রাখা, তাহলে সাধারণ জলই সবচেয়ে ভালো পানীয়। লেবুর জল সেই জলের একটি স্বাস্থ্যকর বিকল্প হতে পারে। অন্যদিকে আইসড কফি মূলত একটি স্বাদযুক্ত পানীয়, যা সতেজতা দিতে পারে, কিন্তু শরীরের জল ও ইলেকট্রোলাইটের চাহিদা পূরণে লেবুর জলের বিকল্প নয়।গরমে বাইরে থেকে ফিরে যদি অতিরিক্ত ঘাম হয়, তাহলে প্রথমেই পর্যাপ্ত জল পান করা উচিত। দীর্ঘক্ষণ রোদে থাকার পরে বা ব্যায়ামের পরে লেবুর জল, ডাবের জল বা ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন (প্রয়োজনে) বেশি উপকারী হতে পারে। এগুলি শরীরের তরল ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।যাঁরা কফি ভালোবাসেন, তাঁদের জন্য আইসড কফি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ নয়। তবে দিনে কতটা ক্যাফেইন গ্রহণ করছেন, সেটির দিকে নজর রাখা জরুরি। বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপ, অনিদ্রা, উদ্বেগজনিত সমস্যা বা গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ না করার পরামর্শ দেন চিকিৎসকেরা।
শিশুদের ক্ষেত্রে লেবুর জল বা সাধারণ জলই ভালো বিকল্প। অতিরিক্ত ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় শিশুদের জন্য উপযুক্ত নয়। একইভাবে বয়স্ক ব্যক্তিদেরও তৃষ্ণা না পেলেও নিয়মিত জল পান করার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত, কারণ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তৃষ্ণার অনুভূতি অনেক সময় কমে যায়।
সব মিলিয়ে বলা যায়, গরমে শরীরকে হাইড্রেট রাখার ক্ষেত্রে লেবুর জল আইসড কফির তুলনায় বেশি কার্যকর। কারণ এটি শরীরে জল পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি কিছুটা ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য বজায় রাখতেও সাহায্য করতে পারে। তবে কোনও পানীয়ই সাধারণ জলের বিকল্প নয়। পর্যাপ্ত জল পান, সুষম খাদ্য এবং প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাস্থ্যকর পানীয় বেছে নেওয়াই গরমে সুস্থ থাকার সবচেয়ে ভালো উপায়।