বাড়িঘর
নিজস্ব প্রতিনিধি
বর্ষা মানেই জানলার কাচে টুপটাপ বৃষ্টির শব্দ, ভেজা মাটির গন্ধ, মেঘলা আকাশ আর এক কাপ গরম চায়ের সঙ্গে দীর্ঘ অলস বিকেল। প্রকৃতি যখন নিজের সাজ বদলে সবুজে-জলে ভরে ওঠে, তখন ঘরের অন্দরেও যদি সেই বর্ষার আবহটুকু এনে দেওয়া যায়, মন্দ কী! তার জন্য যে অনেক টাকা খরচ করে নতুন আসবাব, পর্দা কিংবা দামি সাজসজ্জার সামগ্রী কিনতে হবে, এমনটা কিন্তু একেবারেই নয়। বরং ঘরে থাকা জিনিসপত্রের সামান্য অদলবদল, কয়েকটি ছোট সংযোজন আর একটু সৃজনশীলতাতেই বদলে যেতে পারে ঘরের চেহারা। বর্ষার অন্দরসজ্জার মূল কথা হল—ঘরকে রাখতে হবে সতেজ, হালকা, পরিচ্ছন্ন এবং আরামদায়ক। অতিরিক্ত জিনিসে ঘর ভরিয়ে না দিয়ে প্রকৃতির রং ও আবহকে ঘরের মধ্যে জায়গা করে দেওয়াই হতে পারে এই ঋতুর সাজের সবচেয়ে সহজ উপায়।অন্দরসজ্জা বদলের সবচেয়ে সহজ এবং কম খরচের উপায় হল রঙের ব্যবহার। ঘরের দেওয়াল নতুন করে রং করার প্রয়োজন নেই। বরং কুশনের কভার, টেবিল রানার, বিছানার চাদর কিংবা ছোটখাটো সাজসজ্জার সামগ্রীতেই আনা যায় বর্ষার রং। সবুজ, নীল, ধূসর, সাদা কিংবা মাটির কাছাকাছি রং বর্ষার আবহ তৈরি করতে বেশ কার্যকর। গাঢ় সবুজ কুশনের সঙ্গে সাদা বা হালকা ধূসর কুশন রাখলে ঘরে প্রকৃতির ছোঁয়া আসবে। পুরনো ওড়না বা শাড়ির সুন্দর অংশ কেটে তৈরি করা যেতে পারে কুশনের নতুন আবরণ। এতে খরচও কমবে, আবার ঘরের সাজে ব্যক্তিগত সৃজনশীলতার ছাপও থাকবে।
বর্ষায় জানলাই হয়ে ওঠে ঘরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। বাইরে যখন বৃষ্টি, তখন জানলার পাশে বসে সেই দৃশ্য উপভোগ করার আনন্দই আলাদা। তাই জানলার সাজে একটু মন দেওয়া যেতে পারে। ভারী পর্দার বদলে ব্যবহার করতে পারেন হালকা সুতির বা খাদির পর্দা। সাদা, হালকা নীল কিংবা সবুজ পর্দা ঘরে আলো-বাতাসের অনুভূতি বজায় রাখবে। পুরনো পর্দা থাকলে সেটিকে ধুয়ে ভালোভাবে শুকিয়ে নিয়ে নতুন করে ব্যবহার করাও যায়। পর্দার সঙ্গে ছোট্ট একটি বাঁশের ঝুল, কাপড়ের ফিতা বা হাতে তৈরি ট্যাসেল যোগ করলেই বদলে যাবে তার চেহারা। জানলার ধারে রাখা যেতে পারে একটি ছোট কাঠের মাচা বা পিঁড়ি। তার উপর একটি টব, ছোট বাতি আর পছন্দের বই—ব্যস, তৈরি হয়ে গেল বর্ষার নিজস্ব পাঠকোণ।
বর্ষার সঙ্গে সবুজের সম্পর্ক যেন অবিচ্ছেদ্য। তাই অন্দরসজ্জায় গাছের ব্যবহার এই ঋতুতে বিশেষ আকর্ষণীয়। দামি গাছের টব কেনার প্রয়োজন নেই। বাড়িতে থাকা পুরনো কাচের বোতল, মাটির ভাঁড়, নারকেলের খোল, টিনের কৌটো কিংবা অব্যবহৃত কাপও হয়ে উঠতে পারে ছোট্ট গাছের পাত্র। মানিপ্ল্যান্ট, স্পাইডার প্ল্যান্ট, স্নেক প্ল্যান্টের মতো পরিচর্যায় তুলনামূলক সহজ গাছ ঘরের কোণে রাখা যায়। রান্নাঘরের জানলা, বারান্দা কিংবা বসার ঘরের কোনও আলোকিত কোণেও ছোট গাছ সাজিয়ে দেওয়া যায়। তবে বর্ষায় ঘরে আর্দ্রতা বেশি থাকে বলে গাছের টবে যেন অতিরিক্ত জল জমে না থাকে, সেদিকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে। গাছ যেমন ঘরকে সুন্দর করবে, তেমনই পরিচ্ছন্নতাও বজায় রাখতে হবে।
বর্ষার সাজে মাটির জিনিসের আবেদন আলাদা। মাটির প্রদীপ, ছোট ফুলদানি, ধূপদান কিংবা মাটির পাত্র খুব সহজেই ঘরের পরিবেশে এনে দিতে পারে এক ধরনের উষ্ণতা। বাজার থেকে নতুন কিছু কেনার প্রয়োজন নেই। বাড়িতে থাকা পুরনো মাটির পাত্রগুলো পরিষ্কার করে রোদে ভালোভাবে শুকিয়ে নিন। চাইলে সেগুলিতে সাদা রং দিয়ে ছোট্ট নকশা আঁকা যায়। আলপনার নকশা, পাতা কিংবা ছোট ফুলের ছবি—নিজের পছন্দমতো সাজিয়ে নিলেই তৈরি হয়ে যাবে একেবারে নতুন ধরনের অন্দরসজ্জা।মেঘলা দিনে ঘর অনেক সময় একটু অন্ধকার ও বিষণ্ণ মনে হতে পারে। এই জায়গাতেই আলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। খুব উজ্জ্বল আলো না দিয়ে সন্ধেবেলায় নরম হলুদাভ আলো ব্যবহার করলে ঘরে তৈরি হবে আরামদায়ক আবহ।
পুরনো কাচের বোতল বা ছোট কাচের বয়ামের ভিতরে নিরাপদ বৈদ্যুতিক তারবাতি রাখা যেতে পারে। একটি ট্রের উপর কয়েকটি এমন আলো, পাশে শুকনো ফুল বা ছোট গাছ—অল্প খরচেই তৈরি হবে সুন্দর কোণ। তবে বর্ষাকালে বিদ্যুতের তার, প্লাগ ও বৈদ্যুতিক সাজসজ্জা ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্ক থাকতে হবে। স্যাঁতসেঁতে জায়গায় কোনও বৈদ্যুতিক সামগ্রী রাখা উচিত নয়।ঘরের আসবাব বদলানোর দরকার নেই। বরং আসবাবের অবস্থান সামান্য বদলে দেখুন। যে সোফাটি সবসময় দেওয়ালের গায়ে থাকে, সেটিকে জানলার কাছাকাছি এনে রাখুন। একটি ছোট টেবিল, তার উপর বই ও ফুলদানি—তাতেই তৈরি হতে পারে নতুন বসার জায়গা। পুরনো কাঠের চেয়ার বা টেবিল থাকলে সেটিকে সামান্য ঘষে পরিষ্কার করে প্রাকৃতিক কাঠের রূপটি ফুটিয়ে তোলা যায়। কোথাও রং উঠে গেলে পুরো আসবাব রং না করে শুধু সেই অংশটুকু নতুন করে রাঙিয়েও দেওয়া যায়। অর্থাৎ নতুন জিনিস কেনার আগে পুরনো জিনিসকে নতুন করে দেখুন। অনেক সময় অন্দরসজ্জার সবচেয়ে সুন্দর উপকরণটি আমাদের ঘরেই পড়ে থাকে।বর্ষায় বিছানার সাজেও আসতে পারে সামান্য পরিবর্তন। খুব ভারী চাদরের বদলে হালকা সুতির চাদর ব্যবহার করুন। ফুল, পাতা বা বৃষ্টির আবহ মনে করায় এমন নকশা ঘরে ঋতুর অনুভূতি বাড়াবে। পুরনো কাঁথা, শাড়ি বা কাপড় দিয়ে তৈরি করা যেতে পারে ছোট্ট একটি কুশন বা রানার। বিছানার এক পাশে একটি নরম আলো, পাশে বই আর ছোট ফুলদানি রাখলে তৈরি হবে আরামদায়ক, শান্ত পরিবেশ।অন্দরসজ্জা শুধু চোখের আনন্দ নয়, ঘ্রাণও তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বর্ষায় ভেজা মাটির গন্ধ যেমন মন ভালো করে, তেমনই ঘরে হালকা প্রাকৃতিক সুগন্ধ ব্যবহার করা যেতে পারে। শুকনো ফুল, দারুচিনি, লবঙ্গ কিংবা কয়েকটি শুকনো পাতা দিয়ে তৈরি করা যায় সহজ ঘরসাজানো সুগন্ধি পাত্র। তবে ঘরে যেন অতিরিক্ত সুগন্ধ না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি।
বারান্দা হয়ে উঠুক বর্ষার প্রিয় কোণ: বারান্দা থাকলে বর্ষার সাজে সেটিকে বাদ দেওয়া যায় না। কয়েকটি ছোট টব, একটি পুরনো পিঁড়ি, একটি কুশন আর ছোট্ট একটি আলো দিয়েই বারান্দাকে করে তোলা যায় মন ভালো করার জায়গা। বৃষ্টির জল যাতে সরাসরি ঘরের ভিতরে না আসে, সেদিকে নজর রেখে গাছ সাজান। ভেজা মেঝেতে পিচ্ছিলভাব তৈরি হচ্ছে কি না, সেটিও নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন।সবচেয়ে জরুরি পরিচ্ছন্নতা। বর্ষার অন্দরসজ্জায় সৌন্দর্যের পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। আর্দ্র পরিবেশে ছত্রাক ও স্যাঁতসেঁতে গন্ধের সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই নিয়মিত জানলা খুলে ঘরে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করা দরকার। ভেজা ছাতা, জুতো বা জামাকাপড় ঘরের ভিতরে দীর্ঘক্ষণ রেখে দেওয়া উচিত নয়। পর্দা, কুশনের আবরণ, বিছানার চাদর নিয়মিত ধুয়ে সম্পূর্ণ শুকিয়ে ব্যবহার করুন। কাঠের আসবাব ও মেঝেতে যেন জল জমে না থাকে, সেদিকেও নজর দিন।
বর্ষার অন্দরসজ্জা আসলে বড় আয়োজনের বিষয় নয়। একটি পুরনো শাড়ির নতুন ব্যবহার, জানলার পাশে একটি গাছ, মাটির প্রদীপ, নরম আলো, কয়েকটি কুশন আর একটু গোছানো ঘর—এই ছোট ছোট পরিবর্তনই ঘরে এনে দিতে পারে বর্ষার নিজস্ব মায়া। কারণ ঘর সুন্দর করার জন্য সবসময় অনেক খরচের প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন শুধু একটু সময়, একটু যত্ন আর পুরনো জিনিসকে নতুন চোখে দেখার অভ্যাস। বাইরে যখন আকাশজোড়া মেঘ আর জানলার কাচ বেয়ে নেমে আসে বৃষ্টির ধারা, তখন নিজের ঘরটুকুও হয়ে উঠুক সেই বর্ষার গল্পের সবচেয়ে আপন জায়গা।