বাড়িঘর
নিজস্ব প্রতিনিধি
ফুলের জগতে সৌন্দর্যের প্রতীক বললেই প্রথমে যেটির কথা মনে পড়ে তা হলো অর্কিড। এর রঙের আভিজাত্য, পাপড়ির নকশা, দীর্ঘস্থায়িত্ব আর চার্ম সব মিলিয়ে অর্কিড যেন প্রকৃতির এক অনন্য সৃষ্টি। যে কোনো ঘর কিংবা অফিসে অর্কিড বসালেই জায়গার আবহ পাল্টে যায়। ফুলের বাজারে যেমন এর চাহিদা বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে মানুষের আগ্রহ এই ফুল নিজে হাতে গড়ে তোলার। কিন্তু একই সঙ্গে অনেকে মনে করেন যে অর্কিড চাষ খুব কঠিন, প্রচুর যত্নের দরকার, ভুল হলেই নষ্ট হয়ে যায়। বাস্তবে কিন্তু অর্কিড পরিচর্যা ঠিকঠাক বুঝে নিলে নবীনরাও খুব সহজে ঘরে এই ফুল ফলাতে পারেন।
অর্কিড মূলত ট্রপিক্যাল প্ল্যান্ট। সারা বিশ্বে এর ২৫ হাজারেরও বেশি প্রজাতি রয়েছে এবং নতুন হাইব্রিড তৈরি হওয়ায় সংখ্যা দিন দিন বাড়ছেই। তবে ঘরোয়া চাষের ক্ষেত্রে কিছু বিশেষ জাত—যেমন ফ্যালানোপসিস, ডেনড্রোবিয়াম, ক্যাটলিয়া, ভ্যান্ডা সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং নবীনদের জন্য অনুকূল। অর্কিডের স্বভাব সম্পর্কে জানা থাকলে এর যত্ন করাও সহজ হয়ে যায়। বেশিরভাগ অর্কিড মাটিতে জন্মায় না; তারা এপিফাইট অর্থাৎ অন্য গাছের ডালে ভর করে বেড়ে ওঠে এবং শিকড়ের মাধ্যমে বাতাস থেকে পুষ্টি গ্রহণ করে। তাই অর্কিডের মূলের কাছে পর্যাপ্ত বাতাস পৌঁছানো অত্যন্ত জরুরি।
নবীনরা অর্কিড কিনতে গেলে অনেকেই ভুল করে ফুল ভরা গাছ কিনে আনেন এবং কিছুদিনের মধ্যেই গাছ নিস্তেজ হয়ে যায়। এর একটি কারণ হলো ফুল ফোটার মধ্যেই গাছ পরিবেশ পরিবর্তনের ধাক্কা সামলাতে পারে না। তাই নতুন হাতে খড়ির জন্য ফুল কম থাকা বা ফুল নেই এমন গাছ নেওয়াই ভালো। গাছটি যে সুস্থ তার লক্ষণ দেখা যায় সবুজ ও মোটা রুট, পাতায় কোনো দাগ বা পচন নেই এবং শক্ত দেখায়।
অর্কিডের পাত্র ও মাধ্যম বেছে নেওয়া চাষের মূলধাপ। মাটি ব্যবহার করা যাবে না কারণ এতে জল ধরে থাকে বেশি এবং রুট পচে যায়। অর্কিডের জন্য বিশেষ মাধ্যম প্রয়োজন যেমন চারকোল, বার্ক, নারকেলের ছোবড়া, স্পানজ বা পিউমিস স্টোনের মতো দুর্বল জলধারক কিন্তু বায়ুচলাচল সুবিধাজনক উপাদান। পাত্রতেও ছিদ্র থাকা আবশ্যক যাতে বাড়তি জল বেরিয়ে যেতে পারে। স্বচ্ছ প্লাস্টিকের পাত্র হলে রুটের অবস্থাও নজরে রাখা যায় যা নবীনদের জন্য বাড়তি সুবিধা।
জল দেওয়া অর্কিড পরিচর্যার সবচেয়ে স্পর্শকাতর জায়গা। অনেকেই প্রতিদিন জল দিতে অভ্যস্ত যার ফলে অর্কিডের রুট পচে যায়। বরং অর্কিডের মাঝেমধ্যে সামান্য জলের প্রয়োজন এবং রুট শুকনো হয়ে এলেই জল দিতে হবে। জল দেওয়ার সঠিক সময় হলো সকাল যাতে দিনভর পাতায় থাকা জল শুকিয়ে যেতে পারে এবং ফাঙ্গাস না হয়।
আলো অর্কিডের জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। সরাসরি রোদ নয়, বরং পরোক্ষ কিন্তু উজ্জ্বল আলোতে অর্কিড সবচেয়ে ভাল থাকে। জানলার ধারে সাজিয়ে রাখলে ভালো। আলো কম হলে পাতা গাঢ় সবুজ হয়ে যায় এবং ফুল আসতে দেরি হয়। আলো বেশি হলে পাতায় দাগ পড়ে সে ক্ষেত্রে পাতার রং হলদে হয়ে যেতে পারে। অর্কিড কোথায় রাখলে সবচেয়ে ভালো আলো পায় তা কিছুদিন পর্যবেক্ষণ করলেই বুঝে নেওয়া যায়।
অর্কিড আর্দ্র পরিবেশ পছন্দ করে। ঘরের পরিবেশ শুষ্ক হলে রুট শুকিয়ে যায় ফলে গাছের বৃদ্ধি বন্ধ হয়। তাই পাত্রের চারদিকে জল ভর্তি ট্রে রাখা, স্প্রে বোতলে জল ছিটানো বা হিউমিডিফায়ার ব্যবহার করলে গাছ ভালো থাকে। তবে পাতার মাঝে জল থিতিয়ে থাকলে ফাঙ্গাস হতে পারে সেদিকে সতর্কতা প্রয়োজন।
সার দেওয়াও অর্কিড পরিচর্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অর্কিডের জন্য বিশেষ জলদ্রবণীয় সার পাওয়া যায়, উইকলি অর্থাৎ সপ্তাহে অল্প করে সার দিতে হবে। ফুল না থাকলে নাইট্রোজেন বেশি সার ব্যবহার করলে গাছের পাতা ও রুট বাড়ে; ফুল আসার আগে ফসফরাস সমৃদ্ধ সার দিলে ফুলের কুঁড়ি ধরে। সারের মাত্রা নির্দিষ্ট নির্দেশ অনুযায়ী কম রাখতে হবে বেশি সার দিলে পাতা হলদে হয়ে গাছ দুর্বল হয়ে যায়।
অর্কিডের পাতা ও রুট নিয়মিত পরীক্ষা করা জরুরি কারণ রোগ বা পোকা ধরলে শুরুতেই চিকিৎসা করা ছাড়া উপায় নেই। মিলিবাগ, স্পাইডার মাইট, স্কেল পোকা এসব দেখা দিলে ভেজা কাপড়ে পাতা মুছে তারপর হালকা কীটনাশক স্প্রে করা যেতে পারে। ফাঙ্গাস হলে পাতা ও রুট কাটতে হতে পারে তাই জল ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখা অত্যন্ত প্রয়োজন।
ফুল ফোটানোই অর্কিড চাষের সবচেয়ে আনন্দময় মুহূর্ত। অনেক সময়ে নতুন চাষি ভাবেন গাছ তো ভালো আছে, তবু ফুল ধরছে না কেন? এর কারণ সাধারণত আলো কম পাওয়া বা সার প্রয়োগে অসামঞ্জস্য। আবার শীতে তাপমাত্রা কমে গেলে অর্কিড ফুল ফোটাতে উদ্দীপ্ত হয়। তাই রাতের তাপমাত্রায় সামান্য পার্থক্য সৃষ্টি করলে ফুল ফোটানো আরও সহজ হয়। প্রথম ফুল এলেই নবীন চাষির আত্মবিশ্বাস দ্বিগুণ হয়ে যায় কারণ প্রমাণ মিলেছে যে যত্ন ঠিকই হয়েছে!
অর্কিডের সৌন্দর্য ও বাজারদর এমনিতেই বেশ চমকপ্রদ। এক্ষেত্রে ফ্যালানোপসিস বা ডেনড্রোবিয়ামের মতো সাধারণ জাত দিয়েই শুরু করলে বড় কোনো ঝুঁকি থাকে না। অল্প জায়গায়, বারান্দা-বাড়ির কর্নারেই এই ফুল জন্মানো যায়। ব্যবসায়িক ক্ষেত্রেও অর্কিডের সম্ভাবনা অনেক বিশেষ করে সজ্জা ও গিফট প্ল্যান্ট হিসেবে চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। কলকাতা, বেঙ্গালুরু, কেরালা—অনেক জায়গায় এখন ছোট ছোট অর্কিড নার্সারি তৈরি হয়েছে, যেখান থেকে সারা বছর সরবরাহ চলে। কৃষিবিদদের মতে, ভবিষ্যতে ফুলচাষ শিল্পে অর্কিড একটি বড় নাম হয়ে উঠবে।
সাধারণ মানুষের কাছেও অর্কিড এখন আর ধরাছোঁয়ার বাইরে নয়। সোশ্যাল মিডিয়া, ইউটিউব টিউটোরিয়াল সব মিলিয়ে জ্ঞান এখন হাতের মুঠোয়। শহরেই নয়, গ্রামাঞ্চলেও অনেকেই শখের চাষ শুরু করেছেন। অল্প বিনিয়োগে সঠিক পরিকল্পনায় ধীরে ধীরে বৃহত্তর নার্সারি গড়ে তোলা সম্ভব। এমনকি ঘরে কয়েকটি অর্কিড রাখলেও মানসিক প্রশান্তি ও সবুজের ছোঁয়া বাড়িতে এনে দেয়। ফুল ফুটলে সেই আনন্দের তুলনা নেই যেন নিজের হাতে তৈরি শিল্পকর্ম।
অর্কিড চাষে ‘ধৈর্য’ হলো সবচেয়ে বড় শিক্ষা। এই গাছ দ্রুত ফলাফল দেয় না তাই অসহিষ্ণু হলে হতাশাই আসবে। নতুন চাষিরা অনেক ভুল করেই শিখবেন কখন জল কম দিতে হবে, কখন সার বন্ধ করতে হবে, কোথায় রাখলে পাতার রং ঠিক থাকে সবই সময়ের সঙ্গে সহজ হয়ে যাবে।
শুরু করার জন্য মাত্র এক বা দুইটি গাছই যথেষ্ট। ধীরে ধীরে যত্ন করতে করতে গাছ বড় হলে নতুন শাখা বের হবে। নতুন শাখা বা ‘কেইকি’ থেকে আবার নতুন গাছ তৈরি হয়। অর্থাৎ পুরনো গাছ থেকেই বাড়তে থাকে অর্কিডের বাগান।
শেষ কথা হলো অর্কিড চাষ কোনো কঠিন বিজ্ঞান নয়, বরং একটি শিল্প। গাছের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হলে সে-ই আপনাকে জানিয়ে দেবে কখন কী প্রয়োজন। তাই ভয়ের কিছু নেই সামান্য যত্ন, সঠিক পরিবেশ আর প্রচুর ভালোবাসা থাকলেই অর্কিড আপনাকে উপহার দেবে রঙিন সৌন্দর্য, দীর্ঘস্থায়ী ফুল আর অফুরান আনন্দ।
আজই একটি ছোট্ট অর্কিড দিয়ে হাতে খড়ি হোক দেখবেন কয়েক মাসের মধ্যেই আপনার ঘরই রূপ নেবে এক মনোরম গার্ডেনে। আর নিজের হাতে ফুটানো সেই প্রথম অর্কিড ফুল তার স্মৃতি জীবনের ভাঁজে চিরকাল রঙিন হয়ে থেকেও যাবে।