30th Aug 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

‘সফট লাইফ’ ট্রেন্ড—ক্যারিয়ারের পাশাপাশি মানসিক শান্তিকেও কেন গুরুত্ব দিচ্ছেন তরুণরা?

প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিনিধি


কয়েক বছর আগেও কর্মজীবনে সাফল্যের মানদণ্ড ছিল দীর্ঘ সময় কাজ করা, ব্যস্ত থাকা এবং সর্বক্ষণ নিজেকে প্রমাণ করার চেষ্টা। ‘হাসল কালচার’ বা নিরন্তর পরিশ্রমের সংস্কৃতি যেন সফলতার একমাত্র পথ হিসেবে তুলে ধরা হতো। কিন্তু এখন সেই ছবিটা ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। নতুন প্রজন্মের অনেক তরুণ-তরুণী ‘সফট লাইফ’ বা তুলনামূলক শান্ত, ভারসাম্যপূর্ণ এবং মানসিকভাবে সুস্থ জীবনযাপনের দিকে ঝুঁকছেন। সামাজিক মাধ্যমে এই শব্দটি এখন বেশ জনপ্রিয়। তবে এটি কোনও অলস জীবনযাপনের প্রচার নয়, বরং কাজের পাশাপাশি নিজের মানসিক স্বাস্থ্য, সম্পর্ক এবং ব্যক্তিগত সময়কে গুরুত্ব দেওয়ার এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি।

‘সফট লাইফ’ বলতে মূলত এমন একটি জীবনধারাকে বোঝায়, যেখানে অপ্রয়োজনীয় চাপ, অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা এবং সবসময় নিখুঁত হওয়ার চেষ্টা থেকে নিজেকে কিছুটা দূরে রাখা হয়। এর অর্থ দায়িত্ব এড়িয়ে চলা নয়। বরং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করা, প্রয়োজন হলে ‘না’ বলতে শেখা এবং ব্যক্তিগত জীবনের জন্যও সময় বের করে নেওয়াই এই ভাবনার মূল ভিত্তি।মনোবিদদের মতে, গত কয়েক বছরে কর্মজীবনের ধরনে বড় পরিবর্তন এসেছে। করোনা মহামারির সময় অনেক মানুষ বুঝতে পেরেছেন, শুধু কাজই জীবনের সবকিছু নয়। পরিবার, স্বাস্থ্য, বিশ্রাম এবং মানসিক সুস্থতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সেই অভিজ্ঞতার প্রভাব এখনও অনেকের জীবনদর্শনে রয়ে গেছে। ফলে তরুণদের একাংশ এখন এমন কর্মজীবন চান, যেখানে ভালো আয়ের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনেরও ভারসাম্য বজায় থাকে।ডিজিটাল যুগে সবসময় ‘অনলাইন’ থাকার চাপও এই পরিবর্তনের একটি বড় কারণ। অফিসের কাজ শেষ হওয়ার পরেও ই-মেল, মেসেজ বা ভিডিও মিটিংয়ের কারণে অনেকের কাজের সময় যেন শেষই হয় না। এতে ব্যক্তিগত সময় কমে যায় এবং মানসিক ক্লান্তি বাড়তে থাকে। ‘সফট লাইফ’ দর্শন এই সীমারেখা স্পষ্ট করার কথা বলে। অর্থাৎ কাজের সময় কাজ, আর বিশ্রামের সময় সত্যিই বিশ্রাম।বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত কাজের চাপ থাকলে ‘বার্নআউট’ বা মানসিক অবসাদের ঝুঁকি বাড়তে পারে। এতে শুধু মানসিক নয়, শারীরিক সমস্যাও দেখা দিতে পারে। অনিদ্রা, উদ্বেগ, খিটখিটে মেজাজ, মনোযোগের অভাব, কর্মক্ষমতা কমে যাওয়া কিংবা দীর্ঘমেয়াদে উচ্চ রক্তচাপের মতো সমস্যাও তৈরি হতে পারে। তাই নিয়মিত বিশ্রাম নেওয়া কোনও বিলাসিতা নয়, বরং সুস্থ থাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

‘সফট লাইফ’-এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সচেতনভাবে জীবনযাপন বা ‘মাইন্ডফুল লিভিং’-এর ধারণাও। অনেকেই এখন দিনের কিছুটা সময় মোবাইল ফোন থেকে দূরে থাকেন, বই পড়েন, ধ্যান করেন, হাঁটতে যান বা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটান। এই ছোট ছোট অভ্যাস মানসিক চাপ কমাতে এবং মনকে শান্ত রাখতে সাহায্য করতে পারে।তবে এই প্রবণতা নিয়ে কিছু ভুল ধারণাও রয়েছে। অনেকে মনে করেন, ‘সফট লাইফ’ মানেই উচ্চাকাঙ্ক্ষাহীন জীবন। বাস্তবে বিষয়টি তা নয়। যারা এই জীবনধারা অনুসরণ করছেন, তাঁদের অনেকেই কর্মজীবনে সফল। পার্থক্য শুধু এই যে, তাঁরা সাফল্যের জন্য নিজের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতাকে বিসর্জন দিতে চান না। তাঁদের কাছে সাফল্যের অর্থ শুধু পদোন্নতি বা বেশি বেতন নয়, বরং সুস্থ ও পরিপূর্ণ জীবন।অর্থনৈতিক বাস্তবতার কথাও এখানে উল্লেখ করা জরুরি। সব মানুষের পক্ষে কাজের চাপ কমিয়ে দেওয়া বা ইচ্ছেমতো কর্মজীবন বেছে নেওয়া সম্ভব হয় না। অনেকেই আর্থিক দায়িত্ব বা পেশাগত বাধ্যবাধকতার কারণে দীর্ঘ সময় কাজ করতে বাধ্য হন। তাই ‘সফট লাইফ’ কোনও নির্দিষ্ট জীবনধারার নিয়ম নয়, বরং নিজের পরিস্থিতির মধ্যে যতটা সম্ভব মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখার একটি প্রচেষ্টা।মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করাও মানসিক সুস্থতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সব কাজ নিখুঁতভাবে করতে হবে, সবার প্রত্যাশা পূরণ করতেই হবে—এই মানসিক চাপ থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। প্রয়োজনে সাহায্য চাওয়া, বিশ্রাম নেওয়া বা নিজের জন্য সময় রাখা দুর্বলতার লক্ষণ নয়; বরং এটি আত্ম-সচেতনতার পরিচয়।কর্মক্ষেত্রেও এই পরিবর্তনের প্রভাব দেখা যাচ্ছে। অনেক সংস্থা এখন কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য, নমনীয় কর্মঘণ্টা, ‘ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালান্স’ এবং সুস্থ কর্মপরিবেশের উপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। কারণ গবেষণায় দেখা গেছে, মানসিকভাবে সুস্থ কর্মীরা দীর্ঘমেয়াদে বেশি মনোযোগী, সৃজনশীল এবং উৎপাদনশীল হন।

‘সফট লাইফ’ কোনও ক্ষণস্থায়ী সামাজিক মাধ্যমের ট্রেন্ড হয়ে থাকবে, নাকি ভবিষ্যতের জীবনযাত্রার অংশ হয়ে উঠবে—তা সময়ই বলবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, বর্তমান প্রজন্ম ক্রমশ বুঝতে শিখছে যে সাফল্যের সঙ্গে মানসিক শান্তিরও সমান মূল্য রয়েছে। কর্মজীবনে উন্নতি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই সুস্থ শরীর, শান্ত মন, ভালো সম্পর্ক এবং নিজের জন্য কিছুটা সময়—এই চারটি বিষয়ও জীবনের প্রকৃত সমৃদ্ধির অপরিহার্য অংশ।

Archive

Most Popular