প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
বাংলার দুর্গাপুজোর রীতি-নীতি ঘিরে বহু রহস্য ও লোককথা রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং কৌতূহলোদ্দীপক এক উপাদান হলো কলা বৌ। প্রতি বছর মহাষষ্ঠীর দিন থেকে মহাসপ্তমীর সকালে দুর্গাপুজোর অঙ্গ হিসেবে কলা বৌ স্নান ও স্থাপনের প্রথা চলে আসছে। কিন্তু এই কলা বৌ আসলে কে? দেবী দুর্গার সঙ্গেই বা এর সম্পর্ক কী? কেনই বা পূজার এত গুরুত্বপূর্ণ এক অংশ হিসেবে তাকে দেখা হয়?
কলা বৌ শব্দটি এসেছে দুটি অংশ থেকে কলা অর্থাৎ কলাগাছ এবং বৌ অর্থাৎ নববধূ। সহজ ভাষায়, কলাগাছকে স্নান করিয়ে শাড়ি পরিয়ে তাকে নববধূ রূপে সাজানো হয়। এরপর দেবী দুর্গার পাশে স্থাপন করে পূজা করা হয়। দূর থেকে দেখতে এটি যেন এক নববধূ, তাই এর নাম কলা বৌ। কলাবৌকে নিয়ে একাধিক ব্যাখ্যা রয়েছে।
গণেশের পত্নী রূপে কলাবৌ
অনেকে মনে করেন, কলাবৌ আসলে গণেশের স্ত্রী। পুরাণ মতে, গণেশের দুই স্ত্রী ঋদ্ধি (সমৃদ্ধি) ও সিদ্ধি (সাফল্য)। বাংলার লোকবিশ্বাসে এদের সঙ্গে আবার কলা বৌকে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে দুর্গাপুজোয় যখন দেবী ও তাঁর পরিবারকে পূজা করা হয়, তখন গণেশের পত্নী হিসেবে কলা বৌকেও স্থান দেওয়া হয়।
গঙ্গার রূপে কলাবৌ
আরেক মতে, কলাবৌকে নদী-দেবী গঙ্গার প্রতীক ধরা হয়। মহাসপ্তমীর সকালে কলাবৌকে গঙ্গায় স্নান করানো হয় এ কারণেই এই ধারণা। গঙ্গা দুর্গার পরিবারের অঙ্গ বলে তাঁকে পূজার অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
নবপত্রিকার প্রতীক হিসেবে কলাবৌ
সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা হলো, কলাবৌ আসলে নবপত্রিকা। অর্থাৎ নয় প্রকার ভিন্ন ভিন্ন পাতা দিয়ে গঠিত এক প্রতীক, যা প্রকৃতির শক্তি, উর্বরতা এবং দেবীশক্তির রূপকে প্রকাশ করে।
কলাবৌ আসলে একটি কলাগাছ, তবে তার সঙ্গে আট ধরনের পাতা জড়ানো হয়। এই নয়টি পাতা একত্রে নবপত্রিকা নামে পরিচিত। প্রতিটি পাতার আলাদা প্রতীকী অর্থ রয়েছে, এবং প্রতিটি দেবীশক্তির ভিন্ন ভিন্ন রূপের প্রতীক।
কলা পাতা : দেবী ব্রহ্মচারিণী
কচু পাতা : দেবী কল্যাণী
হলুদ পাতা : দেবী দুর্গা
জয়ন্তী পাতা : কার্তিকের মা
বিল্ব পাতা : মহালক্ষ্মী
ধান গাছ : কার্তিক
মান গাছ : দেবী কার্তিকা
অশোক পাতা : দেবী শোকরহিতা
দাড়িম পাতা : রক্তদন্তিকা
এইভাবে কলাগাছকে কেন্দ্র করে আট প্রকার গাছের পাতা জড়িয়ে নবপত্রিকা তৈরি করা হয়, যা দেবীশক্তির সম্মিলিত প্রতীক।
কলা গাছ বাঙালির জীবনে এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। এটি শুভ, মঙ্গলজনক এবং উর্বরতার প্রতীক। বিয়ের ঘর থেকে শুরু করে পূজার্চনায় কলাগাছ ব্যবহার হয়। এমনকি কলার পাতা খাবার পরিবেশনের জন্যও পবিত্র ধরা হয়। ফলে দেবীশক্তির প্রতীক হিসেবে কলাগাছকে কেন্দ্র করাই স্বাভাবিক ছিল। মহাসপ্তমীর ভোরে কলা বৌ স্নান হয়। একে আবার নবপত্রিকা স্নানও বলা হয়। প্রথা অনুযায়ী, পুরোহিত ভোরে গঙ্গার ঘাটে যান। কলাগাছসহ অন্যান্য পাতাকে স্নান করিয়ে লাল শাড়ি পরে নববধূর রূপ দেন। তারপর কলা বৌকে ঘটা করে শঙ্খধ্বনি, ঢাক ও উলুধ্বনি সহকারে মণ্ডপে আনা হয়। এই পর্বকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের মধ্যে এক বিশেষ আনন্দমুখর পরিবেশ তৈরি হয়।
নবপত্রিকা আসলে প্রকৃতির শক্তির পূজা। ধান, কলা, কচু, বিল্ব সবই আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অঙ্গ। এগুলিকে দেবীর রূপ হিসেবে পূজা করার মধ্য দিয়ে প্রকৃতি ও মানুষের ঐক্য প্রকাশিত হয়.. বাংলার কৃষিজীবী সমাজে ধান, কলা, কচুর গুরুত্ব অপরিসীম। এই পূজা কৃষিজীবনের সমৃদ্ধি কামনার প্রতীক! নববধূর মতো সাজানো কলা বৌ আসলে উর্বরতা ও নতুন জীবনের সূচনার প্রতীক। গ্রামে-গঞ্জে অনেকেই হাস্যরসের সঙ্গে কলা বৌকে গণেশের বউ বলে ডাকেন। অনেকে আবার বলেন, কলা বৌ দুর্গার গোপন সখী, যিনি দেবীর সঙ্গে শাশ্বত বন্ধনের প্রতীক। এসব লোককথা পূজার আনন্দকে আরও রঙিন করে তোলে। আজকের দিনে শহুরে দুর্গাপুজোতেও কলা বৌ পূজা অঙ্গীকারের সঙ্গে মানা হয়। তবে এখন অনেক ক্ষেত্রেই গঙ্গার বদলে কাছাকাছি পুকুর বা কৃত্রিম জলাশয়ে স্নান করানো হয়। শাড়ির রঙ ও সাজেও ভিন্নতা দেখা যায়। তবু পূজার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে কলা বৌ রীতি অটুট রয়েছে। কলা বৌ আসলে কেবল একটি গাছ নয়, বরং বাংলার লোকজ সংস্কৃতির এক অমূল্য প্রতীক। তিনি একাধারে নবপত্রিকা, দেবীশক্তির রূপ, প্রকৃতির প্রতীক, আবার লোকবিশ্বাসে গণেশের পত্নী। কলা বৌর মধ্যে দিয়ে বাঙালি তার কৃষিভিত্তিক সংস্কৃতি, প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা এবং দেবীর প্রতি ভক্তিকে প্রকাশ করে। অতএব, কলা বৌ মানে শুধু পূজার এক রীতি নয়, বরং বাঙালির চিরন্তন সংস্কৃতির ধারক ও বাহক।