স্বাস্থ্য
নিজস্ব প্রতিনিধি
গান শুনতে, সিনেমা দেখতে, অনলাইন মিটিং করতে কিংবা ফোনে কথা বলতে—ইয়ারফোন বা ইয়ারবাড এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। অফিসে যাওয়ার পথে, জিমে, পড়াশোনার সময়, এমনকি ঘুমোতে যাওয়ার আগেও অনেকেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা ইয়ারফোন ব্যবহার করেন। কিন্তু এই অভ্যাস কি দীর্ঘমেয়াদে শ্রবণশক্তির ক্ষতি করতে পারে? বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তর হলো—হ্যাঁ, যদি দীর্ঘ সময় ধরে বেশি শব্দের মাত্রায় ইয়ারফোন ব্যবহার করা হয়। তবে সঠিক নিয়ম মেনে ব্যবহার করলে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।আমাদের কানের ভিতরে অসংখ্য সূক্ষ্ম হেয়ার সেল বা সংবেদনশীল কোষ রয়েছে, যা শব্দতরঙ্গকে মস্তিষ্কের কাছে পৌঁছে দেয়। খুব জোরে শব্দ বা দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চমাত্রার আওয়াজের সংস্পর্শে থাকলে এই কোষগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সমস্যা হলো, একবার এই কোষ নষ্ট হয়ে গেলে তা আর আগের অবস্থায় ফিরে আসে না। ফলে ধীরে ধীরে স্থায়ী শ্রবণশক্তি হ্রাসের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।চিকিৎসকদের মতে, শুধু ইয়ারফোন নয়, যেকোনও উচ্চমাত্রার শব্দই কানের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তবে ইয়ারফোনের ক্ষেত্রে শব্দের উৎস কানের খুব কাছাকাছি থাকায় ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। অনেকেই বাইরের শব্দ ঢাকতে গিয়ে মোবাইলের ভলিউম প্রায় সর্বোচ্চ পর্যায়ে বাড়িয়ে দেন। বিশেষ করে বাস, ট্রেন বা মেট্রোর মতো শব্দপূর্ণ পরিবেশে এই অভ্যাস বেশি দেখা যায়।শ্রবণ বিশেষজ্ঞরা সাধারণভাবে ৬০/৬০ নিয়ম মেনে চলার পরামর্শ দেন। অর্থাৎ সর্বোচ্চ ভলিউমের ৬০ শতাংশের বেশি নয় এবং একটানা ৬০ মিনিটের বেশি ইয়ারফোন ব্যবহার না করাই ভালো। এরপর অন্তত কয়েক মিনিট কানের বিশ্রাম দেওয়া উচিত। এতে দীর্ঘমেয়াদে কানের উপর চাপ অনেকটাই কমে।অনেকেই ভাবেন, শুধু জোরে গান শুনলেই সমস্যা হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় মাঝারি মাত্রার শব্দেও ইয়ারফোন ব্যবহার করলে কানের উপর ক্রমাগত চাপ পড়তে পারে। তাই শুধু ভলিউম নয়, ব্যবহারের সময়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যদি প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা ইয়ারফোন ব্যবহার করতেই হয়, তাহলে মাঝেমধ্যে বিরতি নেওয়া উচিত।শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রাথমিক লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে কথাবার্তা স্পষ্টভাবে শুনতে অসুবিধা হওয়া, বারবার অন্যকে কথা পুনরায় বলতে বলা, কানে ভোঁ ভোঁ বা শিসের মতো শব্দ শোনা (টিনিটাস), কিংবা জোরে শব্দ শোনার পর সাময়িকভাবে কম শোনা। এই ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে কান-নাক-গলা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।শুধু শ্রবণশক্তিই নয়, দীর্ঘক্ষণ ইয়ারফোন ব্যবহারে কানের স্বাস্থ্য সম্পর্কিত আরও কিছু সমস্যা দেখা দিতে পারে। একই ইয়ারবাড দীর্ঘদিন পরিষ্কার না করলে সেখানে ধুলো, ঘাম ও জীবাণু জমতে পারে, যা কানের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই নিয়মিত ইয়ারফোন পরিষ্কার করা এবং অন্যের ইয়ারফোন ব্যবহার না করাই ভালো।ইয়ারফোনের ধরনও কিছুটা গুরুত্বপূর্ণ। নয়েজ-ক্যানসেলিং ইয়ারফোন ব্যবহার করলে অনেক সময় বাইরের শব্দ কম শোনা যায়। ফলে গান শোনার জন্য খুব বেশি ভলিউম বাড়ানোর প্রয়োজন পড়ে না। তবে রাস্তা পার হওয়া, সাইকেল চালানো বা গাড়ি চালানোর সময় নয়েজ-ক্যানসেলিং ইয়ারফোন ব্যবহার করলে আশপাশের সতর্কতামূলক শব্দ শোনা কঠিন হতে পারে। তাই নিরাপত্তার দিকটিও মাথায় রাখা জরুরি।শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে আরও বেশি সতর্কতা প্রয়োজন। ছোটবেলা থেকেই দীর্ঘ সময় উচ্চমাত্রার শব্দে গান শোনার অভ্যাস ভবিষ্যতে শ্রবণশক্তির উপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই অভিভাবকদের উচিত শিশুদের ইয়ারফোন ব্যবহারের সময় ও ভলিউমের দিকে নজর রাখা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিনের জীবনে কিছু সহজ অভ্যাস শ্রবণশক্তি রক্ষা করতে সাহায্য করতে পারে। অপ্রয়োজনীয়ভাবে ভলিউম না বাড়ানো, দীর্ঘ সময় একটানা ইয়ারফোন ব্যবহার না করা, নিয়মিত কানের বিশ্রাম দেওয়া এবং কানে কোনও অস্বস্তি অনুভব করলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া—এই কয়েকটি নিয়মই যথেষ্ট কার্যকর।
ইয়ারফোন আধুনিক জীবনের একটি প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি। তাই এটি ব্যবহার করতেই হবে। কিন্তু সচেতনভাবে ব্যবহার করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শ্রবণশক্তি একবার স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা ফিরিয়ে আনা খুবই কঠিন। তাই আজ থেকেই ভলিউম কমান, ব্যবহারের সময় সীমিত করুন এবং নিজের কানের যত্ন নিন। সুস্থ শ্রবণশক্তিই আপনাকে দীর্ঘদিন শব্দের পৃথিবীকে উপভোগ করার সুযোগ করে দেবে।