স্বাস্থ্য
নিজস্ব প্রতিনিধি
ডায়াবেটিস এখন এক বিশ্বজনীন স্বাস্থ্যসমস্যা। প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসে সামান্য অসাবধানতা রক্তে শর্করার মাত্রাকে প্রভাবিত করতে পারে। অনেকেই মনে করেন ডায়াবেটিক রোগীরা ফল খেতে পারবেন না, কারণ ফলে প্রাকৃতিক চিনি (ফ্রুক্টোজ) থাকে। কিন্তু সত্যি হলো সব ফল খাওয়া ক্ষতিকর নয়। বরং কিছু নির্দিষ্ট ফল ডায়াবেটিক রোগীর জন্য অত্যন্ত উপকারী। সঠিক ফল বেছে নিলে শুধু রক্তে শর্করার মাত্রাই নিয়ন্ত্রণে থাকে না, শরীরে ভিটামিন, খনিজ ও ফাইবারের ঘাটতিও পূরণ হয়।
ফল বেছে নেওয়ার আগে কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখা জরুরি
গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (GI):
যে ফলের GI কম, সেই ফল রক্তে শর্করার মাত্রা ধীরে বাড়ায়। কম GI যুক্ত ফল ডায়াবেটিকদের জন্য বেশি নিরাপদ।
গ্লাইসেমিক লোড (GL):
শুধু GI নয়, খাবারের পরিমাণ (portion size) অনুযায়ী রক্তে শর্করার প্রভাব নির্ধারণ করে GL। তাই কম GI + নিয়ন্ত্রিত পরিমাণ = সঠিক সমাধান।
পরিমাণ ও সময়:
একসঙ্গে বেশি ফল না খেয়ে দিনে ২–৩ বার ছোট পরিমাণে খাওয়া ভালো। সাধারণত দুপুর বা বিকেলের দিকে ফল খাওয়া উপযুক্ত।
প্রসেস করা ফল এড়িয়ে চলা:
ক্যানের ফল, ফলের জুস, প্যাকেটজাত ফল এগুলোতে বাড়তি চিনি ও ক্যালোরি থাকে, যা ডায়াবেটিকদের জন্য ক্ষতিকর।
ডায়াবেটিক রোগীরা সব ফল সমানভাবে খেতে পারেন না। যেসব ফলে চিনি ও GI উভয়ই বেশি, সেগুলো এড়িয়ে চলাই ভালো। যেমন
আঙুর (বেশি পরিমাণে)
কাঁঠাল
লিচু
আম (অতিরিক্ত মিষ্টি জাত)
কলা (অতিরিক্ত পাকা হলে)
খেজুর, কিশমিশ, শুকনো ফল
এগুলো মাঝে মধ্যে অল্প পরিমাণে খাওয়া যেতে পারে, তবে দৈনন্দিন ডায়েটে রাখা উচিত নয়।
প্রবাদ আছে, An apple a day keeps the doctor away। আপেলের ফাইবার ও ভিটামিন সি রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। এর GI খুব কম (প্রায় ৩৮–৪০)। আপেল খেলে দীর্ঘসময় পেট ভরা থাকে, ফলে অপ্রয়োজনীয় খিদে কম লাগে।
ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য পেয়ারা অসাধারণ ফল। এতে প্রচুর ফাইবার ও ভিটামিন সি আছে। GI খুব কম (প্রায় ৩০–৩৫)। খোসাসহ খেলে রক্তে শর্করার শোষণ ধীর হয়। তবে খুব বেশি না খেয়ে প্রতিদিন ১–২ টুকরো খেলেই যথেষ্ট।
কমলা, মাল্টা বা মিষ্টি লেবু এগুলো ভিটামিন সি, ক্যালসিয়াম ও ফাইবারের ভাণ্ডার। GI প্রায় ৪০। মিষ্টি কম হলেও এরা শরীরে শক্তি যোগায়। তবে জুস নয়, গোটা ফল খাওয়াই উত্তম।
নাশপাতি জলের আধিক্যে ভরপুর, ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বাড়তে পারে না। এতে ফাইবারও প্রচুর, যা হজমে সাহায্য করে।
এই ফলগুলোর অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সহায়ক। GI কম, ফাইবার বেশি, ভিটামিন সমৃদ্ধ। প্রতিদিন সামান্য পরিমাণে খেলে হৃদ্রোগ প্রতিরোধেও সাহায্য করে।
জাম বা ব্ল্যাক প্লাম (Java plum) ডায়াবেটিকদের জন্য ঐতিহ্যগতভাবে অন্যতম সেরা ফল। জাম খেলে ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়ে, শর্করার মাত্রা কমে। এর বীজ শুকিয়ে গুঁড়ো করে খাওয়া হলে আরও উপকার পাওয়া যায়।
কিউইতে ভিটামিন সি ও অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট প্রচুর। GI কম (প্রায় ৫০)। প্রতিদিন একটিমাত্র কিউই খাওয়া রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে।
ডালিমে পলিফেনল ও অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট আছে, যা রক্তে কোলেস্টেরল কমায়। এর GI ৩৫। অল্প অল্প দানা খাওয়া ডায়াবেটিকদের জন্য নিরাপদ।
আমড়া ভিটামিন সি–তে ভরপুর, আর GI মাত্র ৩০। এটি রক্তে শর্করার মাত্রা ধীরে বাড়ায়। যারা টক ফল পছন্দ করেন, তাদের জন্য এটি দারুণ বিকল্প।
যদিও পাকা কলা ডায়াবেটিকদের জন্য ক্ষতিকর, কাঁচা বা অল্প আধপাকা কলায় রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ থাকে, যা ধীরে হজম হয় এবং রক্তে শর্করা হঠাৎ বাড়তে দেয় না।
১. গোটা ফল খাওয়া ভালো, জুস নয়।
২. একসঙ্গে অনেক ফল না খেয়ে ভাগ করে খাওয়া উচিত।
3. খালি পেটে না খেয়ে খাবারের পর বা নাস্তার অংশ হিসেবে ফল খাওয়া ভালো।
4. মৌসুমি ফল খাওয়াই সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর।
5. ডাক্তার বা নিউট্রিশনিস্টের পরামর্শ অনুযায়ী ফল বাছাই করুন।
ডায়াবেটিক রোগীরা প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ২–৩ ধরনের ফল রাখতে পারেন। তবে শর্করার মাত্রা মাপা, শরীরের ওজন ও শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী ফলের পরিমাণ নির্ধারণ করা উচিত। অনেক সময় ওষুধ বা ইনসুলিন নেওয়ার সময়ও ফল খাওয়ার সময়সূচি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাই চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করাই শ্রেয়।
ডায়াবেটিক মানেই ফল খাওয়া যাবে না এটি একেবারেই ভ্রান্ত ধারণা। সঠিক ফল বেছে নিলে তা শুধু শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণেই নয়, শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় ভিটামিন, খনিজ ও অ্যান্টিঅক্সিড্যান্টও সরবরাহ করে। আপেল, পেয়ারা, কমলা, জাম বা বেরি জাতীয় ফল হতে পারে ডায়াবেটিকদের সেরা বন্ধু। তবে মনে রাখবেন পরিমাণে নিয়ন্ত্রণই হলো মূল মন্ত্র।