স্বাস্থ্য
নিজস্ব প্রতিনিধি
অফিসের কাজ এখন অনেকটাই কম্পিউটারনির্ভর। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ডেস্কে বসে কাজ করা, একের পর এক অনলাইন মিটিং, দীর্ঘ সময় ল্যাপটপ বা ডেস্কটপের সামনে কাটানো—এসবই আধুনিক কর্মজীবনের অংশ। কিন্তু এই জীবনযাত্রার একটি বড় সমস্যা হলো ঘাড়, কাঁধ ও কোমরের ব্যথা। অনেকেই মনে করেন, এটি বয়সের স্বাভাবিক প্রভাব। অথচ চিকিৎসকদের মতে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এর পিছনে থাকে ভুলভাবে বসা, দীর্ঘক্ষণ একই ভঙ্গিতে থাকা এবং পর্যাপ্ত নড়াচড়ার অভাব। সুখবর হলো, প্রতিদিনের কিছু সহজ অভ্যাস বদলালেই এই ধরনের ব্যথার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।মানবদেহ দীর্ঘ সময় একই অবস্থায় স্থির থাকার জন্য তৈরি নয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা একভাবে বসে থাকলে পেশি ও লিগামেন্টের উপর চাপ পড়ে। বিশেষ করে ঘাড়, কাঁধ, কোমর এবং মেরুদণ্ডের নিচের অংশে এই চাপ বেশি অনুভূত হয়। এর ফলে প্রথমে হালকা অস্বস্তি, পরে ব্যথা, পেশি শক্ত হয়ে যাওয়া বা হাত-পায়ে ঝিনঝিন ভাবের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সঠিক বসার ভঙ্গি। চেয়ারে বসার সময় পিঠ চেয়ারের ব্যাকরেস্টে ঠেকিয়ে রাখুন এবং কোমরের স্বাভাবিক বাঁককে সমর্থন দিন। কাঁধ যেন ঝুঁকে না থাকে এবং মাথা সামনের দিকে বেশি না এগিয়ে যায়। অনেকেই স্ক্রিনের দিকে তাকাতে গিয়ে অজান্তেই ঘাড় সামনে বাড়িয়ে দেন।কম্পিউটারের মনিটরের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। স্ক্রিনের উপরের অংশ যেন চোখের সমান উচ্চতায় থাকে এবং স্ক্রিনটি চোখ থেকে সাধারণত ৫০ থেকে ৭০ সেন্টিমিটার দূরে রাখা ভালো। ল্যাপটপে কাজ করলে প্রয়োজনে ল্যাপটপ স্ট্যান্ড এবং আলাদা কিবোর্ড ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে ঘাড় নিচু করে দীর্ঘক্ষণ কাজ করার প্রয়োজন পড়ে না।চেয়ার ও ডেস্কের উচ্চতা এমন হওয়া উচিত, যাতে কনুই প্রায় ৯০ ডিগ্রি কোণে থাকে এবং কবজি স্বাভাবিক অবস্থায় থাকে। পা পুরোপুরি মেঝেতে রাখার চেষ্টা করুন। যদি পা মাটিতে না পৌঁছায়, তাহলে ফুটরেস্ট ব্যবহার করা যেতে পারে। ঝুলন্ত অবস্থায় পা রেখে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলে কোমর ও উরুর উপর অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটানা ৩০ থেকে ৪৫ মিনিটের বেশি বসে থাকা উচিত নয়। প্রতি আধঘণ্টা বা এক ঘণ্টা অন্তর অন্তত দুই থেকে পাঁচ মিনিট উঠে হাঁটুন, জল পান করুন বা হালকা স্ট্রেচিং করুন। এই ছোট বিরতিগুলি রক্তসঞ্চালন বাড়ায় এবং পেশির উপর চাপ কমাতে সাহায্য করে। অনেক অফিসকর্মী মোবাইলে রিমাইন্ডার সেট করে এই অভ্যাস গড়ে তুলছেন।ঘাড় ও কাঁধের জন্য কয়েকটি সহজ ব্যায়ামও উপকারী হতে পারে। ধীরে ধীরে ঘাড় ডান-বামে ঘোরানো, কাঁধ সামনে ও পিছনে ঘোরানো, হাত মাথার উপর তুলে স্ট্রেচ করা বা কোমর সামান্য বাঁকিয়ে টান দেওয়ার মতো ব্যায়াম কয়েক মিনিটেই করা যায়। তবে যদি তীব্র ব্যথা থাকে, তাহলে নিজে থেকে ব্যায়াম শুরু না করে ফিজিওথেরাপিস্ট বা চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।অনেকেই কাজের চাপে জল পান করতে ভুলে যান। কিন্তু শরীরে জলের ঘাটতি হলে পেশির ক্লান্তি ও অস্বস্তি বাড়তে পারে। তাই ডেস্কে সবসময় একটি জলের বোতল রাখুন এবং নিয়মিত জল পান করুন। পাশাপাশি সুষম খাদ্যাভ্যাসও পেশি ও হাড়ের সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি, প্রোটিন এবং ম্যাগনেসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার খাদ্যতালিকায় রাখার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।অফিসের বাইরে নিয়মিত শরীরচর্চাও জরুরি। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা, যোগব্যায়াম, সাঁতার বা শক্তিবর্ধক ব্যায়াম মেরুদণ্ড ও পেশিকে শক্তিশালী রাখতে সাহায্য করে। শুধু অফিসে বসার ভঙ্গি ঠিক করলেই হবে না; শরীরকে সক্রিয় রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।ঘাড় বা কোমরের ব্যথা যদি কয়েক সপ্তাহ ধরে থাকে, রাতে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়, হাত বা পায়ে অসাড়তা আসে, দুর্বলতা অনুভূত হয় বা ব্যথা ক্রমশ বাড়তে থাকে, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ কিছু ক্ষেত্রে ডিস্কের সমস্যা, স্নায়ুর উপর চাপ বা অন্য কোনও শারীরিক অসুস্থতার কারণেও এই উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
মনে রাখতে হবে, দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করা আধুনিক কর্মজীবনের বাস্তবতা হলেও তার প্রভাব কমানো সম্ভব। সঠিক বসার ভঙ্গি, নিয়মিত বিরতি, হালকা স্ট্রেচিং, পর্যাপ্ত জল পান এবং নিয়মিত শরীরচর্চা—এই কয়েকটি সহজ অভ্যাসই ঘাড় ও কোমরের ব্যথা অনেকাংশে প্রতিরোধ করতে পারে। শরীরের ছোট ছোট অস্বস্তিকে অবহেলা না করে সময়মতো যত্ন নিলে ভবিষ্যতে বড় সমস্যা এড়ানো সম্ভব।