19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

বাংলার ঐতিহ্য, মুর্শিদাবাদী সিল্ক থেকে জামদানি..

প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিনিধি


বাংলা শুধু সাহিত্য ও সঙ্গীতের দেশ নয়, এটি এক বুননশিল্পের মন্দির। এখানকার তাঁতের ঘরে ঘরে লুকিয়ে আছে এক হাজার বছরের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও শিল্পবোধের গল্প। প্রাচীনকাল থেকেই বাংলার তাঁতের শাড়ি, মসলিন, সিল্ক, জামদানি ও ধনেখলির কাপড় বিদেশ পর্যন্ত রপ্তানি হয়েছে। এই বুননশিল্প কেবল অর্থনীতির নয়, বাংলার নারীসত্তারও এক চিরন্তন পরিচয় বহন করে। আজও এক একটি মুর্শিদাবাদী সিল্ক বা ঢাকাই জামদানি হাতে তুলে নিলে মনে হয়, যেন ইতিহাসের পাতা থেকে এক টুকরো সৌন্দর্য জীবন্ত হয়ে উঠছে।


মুর্শিদাবাদের সিল্ক 

মুর্শিদাবাদ, নবাব সিরাজউদ্দৌলার রাজ্যের রাজধানী, শুধু রাজনীতি নয়—সুন্দর শিল্পকলারও কেন্দ্র ছিল। এখানেই তৈরি হতো বিখ্যাত মুর্শিদাবাদী সিল্ক—যা একসময় ইউরোপ পর্যন্ত রপ্তানি হত। ১৭শ শতাব্দীতে মুর্শিদ কুলি খাঁ বাংলার রাজধানী মুর্শিদাবাদে স্থানান্তর করলে এখানে সিল্ক উৎপাদনের প্রসার ঘটে। পারস্য ও চীন থেকে আগত কারিগরদের সাহায্যে সূক্ষ্ম সিল্ক তৈরির কৌশল শেখা হয়। মুর্শিদাবাদ শহরের বাণিজ্যিক গৌরবের একটি বড় অংশ ছিল এই রেশম শিল্প। মুর্শিদাবাদী সিল্কে ব্যবহৃত হয় প্রাকৃতিক তুঁত রেশম (mulberry silk)। এর রেশা অত্যন্ত সূক্ষ্ম, ফলে তৈরি কাপড় হয় হালকা, মসৃণ ও চকচকে। তাঁতিরা হ্যান্ডলুমে সুতাগুলো বুনে তৈরি করেন নিখুঁত প্যাটার্ন—যার ওপর ফুটে ওঠে ফুল, লতা, পাখি বা জ্যামিতিক নকশা। সাধারণত প্রাকৃতিক রঙে রাঙানো হয় এই সিল্ক। লাল, সোনালি, হালকা সবুজ, নীল—এই চার রঙের ব্যবহার ঐতিহ্যবাহী। বর্তমানে আধুনিক ডিজাইনাররা এর সঙ্গে জুড়েছেন ব্লক প্রিন্ট, টাই-অ্যান্ড-ডাই, এবং বাতিক কৌশল। ফলে ঐতিহ্য আর আধুনিকতার মিলনে মুর্শিদাবাদী সিল্ক আজও আন্তর্জাতিক ফ্যাশন জগতে উজ্জ্বল।


বালুচরী 

মুর্শিদাবাদের বালুচর গ্রাম থেকেই জন্ম নেয় বালুচরী শাড়ি, যা এক অর্থে বাংলার “গল্প বলা কাপড়”। ১৮শ শতকের শেষ দিকে বেনারসের বুননশিল্পীরা বালুচরে এসে স্থায়ী হন। তাঁদের হাতেই তৈরি হয় প্রথম বালুচরী, যেখানে সূক্ষ্ম সুতোর নকশায় ফুটে উঠত পুরাণ ও রাজদরবারের দৃশ্য। একসময় এই শাড়ি কেবল রাজপরিবার ও অভিজাতদের পোশাক ছিল। বালুচরীর পাড়ে ও আঁচলে থাকে সূক্ষ্ম ‘ব্রোকেড’ কাজ—যেখানে রামায়ণ-মহাভারতের কাহিনি, রাজা-রানির সভা, বা সংগীত নৃত্যের দৃশ্য বোনা থাকে। এর রেশম আসে মুর্শিদাবাদ থেকেই, এবং নকশা তৈরি হয় ক্ষুদ্র কাঠের চাকায় বসানো নকশা কার্ডের সাহায্যে—যা এক সময়ে সম্পূর্ণ হস্তনির্মিত হত। ২০শ শতকের মাঝামাঝি বালুচর গ্রামে বন্যায় ধ্বংস হলে এই শিল্প প্রায় হারিয়ে যায়। পরবর্তীতে বিষ্ণুপুরের কারিগররা এই ঐতিহ্য পুনরুজ্জীবিত করেন। আজ “বিষ্ণুপুরী বালুচরী” জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে গৌরবের প্রতীক।


ঢাকাই মসলিন

বাংলার তাঁতের ঐতিহ্য বলতে ঢাকাই মসলিন না বললে ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যায়। প্রাচীন গ্রিক ও রোমান লেখায় “Gangetic cloth” নামে যে কাপড়ের উল্লেখ আছে, সেটিই ছিল মসলিন। ১৬শ থেকে ১৮শ শতাব্দীতে এটি ছিল বাংলার প্রধান রপ্তানি পণ্য। ইউরোপীয় রাজন্যবর্গ থেকে শুরু করে সম্রাট নেপোলিয়নের স্ত্রী জোসেফিন পর্যন্ত ছিলেন এর অনুরাগী। মসলিনের সূতা এত সূক্ষ্ম যে একটি শাড়ি এক আঙুলের মধ্যে গুটিয়ে রাখা যেত। নরম, স্বচ্ছ, ও হালকা এই কাপড় তৈরি করতে একজন তাঁতির প্রায় এক বছর লেগে যেত। গঙ্গার পারের বিশেষ তুঁতের গাছ থেকে পাওয়া সূক্ষ্ম তুলাই ছিল এর কাঁচামাল। ব্রিটিশ আমলে ইংল্যান্ডের মেশিনে তৈরি কাপড় বাজার দখল করলে ঢাকাই মসলিন হারিয়ে যায়। তবে সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের কারিগররা আবার এই শিল্পকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন। “Muslin Revival Project” আজ নতুন আশার আলো।


জামদানি 

জামদানি, নাম শুনলেই মনে পড়ে সূক্ষ্ম ধুতির ভাঁজ, ঢাকাই শাড়ির লাবণ্য। এটি একদিকে কাপড়, অন্যদিকে শিল্পকর্ম। “জামদানি” শব্দটি এসেছে ফার্সি “জাম” (ফুল) এবং “দানি” (ফোঁটা) থেকে—অর্থাৎ ফুলের ফোঁটা। এটি মূলত মসলিনের ওপর হাতে বোনা নকশার ফল। ঢাকাই তাঁতিদের কুশলতা আজও বিশ্ববিখ্যাত। জামদানির নকশা তৈরি হয় সুতো দিয়ে বুননের সময়েই। তাঁতিরা সূক্ষ্ম সুতায় ফুল, লতা, কলি, মাছ, পাখির নকশা বুনে তুলেন। একেকটি জামদানি সম্পূর্ণ করতে লাগে মাসের পর মাস।বিখ্যাত নকশাগুলির মধ্যে “Duria”, “Kalka”, “Panna Hazar”, “Tercha” ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। ২০১৩ সালে UNESCO জামদানিকে “Intangible Cultural Heritage of Humanity” হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এটি শুধু একটি পোশাক নয়, এটি বাংলার নারীর সৌন্দর্য, কারিগরের ধৈর্য এবং ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।


ধনেখলির কটন

হুগলির ধনেখলি অঞ্চলের তাঁত শিল্পও কম ঐতিহ্যময় নয়। এখানে তৈরি হয় হালকা কটন শাড়ি, গামছা, ও লুঙ্গি। ধনেখলির কাপড়ের প্রধান গুণ তার নরমতা ও আরামদায়কতা। গ্রীষ্মপ্রধান বাংলার আবহাওয়ায় এই কাপড়ই সবচেয়ে উপযোগী। বর্তমানে এই কাপড়ে যুক্ত হয়েছে নতুন নকশা, রঙ, এবং ব্লক প্রিন্টিং কৌশল। অনেক ফ্যাশন ডিজাইনার এই ধনেখলি কাপড় ব্যবহার করে “sustainable fashion” আন্দোলনে নতুন দিশা এনেছেন।

এই ঐতিহ্যের মূল শক্তি হলেন আমাদের তাঁতিরা। গ্রামের সরু ঘরে বসে তাঁরা আজও হাতের তাঁতে বুনে চলেছেন ঐতিহ্য। কিন্তু আধুনিক মেশিন, সস্তা সিনথেটিক কাপড়, এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের শোষণে তাঁতিরা আজও সংগ্রাম করছেন, সরকারি উদ্যোগে বর্তমানে “Tantuja”, “Banglar Tanter Haat”, “Biswa Bangla” ইত্যাদি প্রকল্পের মাধ্যমে তাঁতিদের পুনর্বাসন ও বাজার সম্প্রসারণের কাজ চলছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বিক্রির সুযোগও এখন অনেক বেড়েছে।


আধুনিক যুগে ঐতিহ্যের পুনর্জন্ম

আজকের প্রজন্ম যখন ফ্যাশনে দ্রুত পরিবর্তন খোঁজে, তখনও মুর্শিদাবাদী সিল্ক বা জামদানি নতুন রূপে ফিরে আসছে।

  • ফিউশন পোশাক, যেমন—সিল্ক টপ, জামদানি স্কার্ফ, ও তাঁতের জ্যাকেট তরুণ প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয়।

  • আন্তর্জাতিক র‍্যাম্পেও দেখা যাচ্ছে বাংলার কাপড়ের পুনরাবিষ্কার।

  • অনেক ডিজাইনার এখন তাঁতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে “Ethical Fashion” এর ধারণাকে বাস্তবে রূপ দিচ্ছেন।

বাংলার বুননশিল্প শুধু একটি কারিগরি দক্ষতা নয়, এটি আমাদের পরিচয়। প্রতিটি সুতোর মাঝে লুকিয়ে আছে একেকটি প্রার্থনা, একেকটি গল্প, একেকটি জীবন।
মুর্শিদাবাদী সিল্কের মাধুর্য, বালুচরীর কাহিনি, মসলিনের হালকাতা, জামদানির জটিল নকশা—সব মিলিয়ে এ এক অনন্ত ঐতিহ্যের বুনন। বাংলা আজও এই সূক্ষ্ম শিল্পে গর্বিত, কারণ যতদিন রেশমের সুতায় আঁকা থাকবে মানুষের হাতের উষ্ণতা, ততদিন এই ঐতিহ্য জীবন্ত থাকবে—বাংলার বুকে, নারীর আঁচলে, আর আমাদের সংস্কৃতির প্রতিটি স্পন্দনে।

Archive

Most Popular