6th Oct 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কোন কোন কোর্স হতে পারে কেরিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট?

প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিনিধি



উচ্চমাধ্যমিক বা দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষা শেষ হলেই অনেক পড়ুয়ার সামনে একটাই প্রশ্ন এসে দাঁড়ায় এবার কী? প্রচলিত পথে স্নাতক ডিগ্রি, তারপর চাকরি এই পথ এখনও গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু কেরিয়ারের জগৎ অনেক বদলে গিয়েছে। প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, ডিজিটাল পরিষেবা, ডিজাইন, অ্যানিমেশন, ফিনান্স, বিমান পরিষেবা, হসপিটালিটি, প্যারামেডিক্যাল, এমনকি দক্ষতাভিত্তিক নানা পেশায় তৈরি হয়েছে নতুন সুযোগ। ফলে স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কেবল ‘কোন কলেজে ভর্তি হব’ নয়, বরং ‘কোন দক্ষতা তৈরি করলে আগামী কয়েক বছরে নিজের জন্য ভালো সুযোগ তৈরি করতে পারব’ এই প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার কেরিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট হতে পারে এমন কোনও একটি কোর্স সবার জন্য এক নয়। যে পড়ুয়ার গণিত ও প্রযুক্তিতে আগ্রহ, তার জন্য যে পথ উপযুক্ত, মানবিক বিষয়ে আগ্রহী পড়ুয়ার জন্য সেটি নাও হতে পারে। আবার শুধু কোনও কোর্সের নাম শুনে বা বন্ধুরা সেই বিষয়ে ভর্তি হচ্ছে বলে একই পথে হাঁটাও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। নিজের আগ্রহ, যোগ্যতা, পড়াশোনার ধরন, আর্থিক সামর্থ্য এবং ভবিষ্যতে কোন ধরনের কাজ করতে চান—এই কয়েকটি বিষয় একসঙ্গে বিচার করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

প্রযুক্তিনির্ভর কেরিয়ারের দিকে যাঁদের আগ্রহ, তাঁদের জন্য কম্পিউটার সায়েন্স, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, ডেটা অ্যানালিটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা মেশিন লার্নিংয়ের মতো ক্ষেত্র গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে শুধু ‘এআই’ লেখা কোনও কোর্সে ভর্তি হলেই চাকরি নিশ্চিত এমন ধারণা ঠিক নয়। প্রোগ্রামিংয়ের ভিত্তি, গণিত ও পরিসংখ্যানের ধারণা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা এবং বাস্তব প্রকল্পে কাজ করার অভিজ্ঞতা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের Future of Jobs Report 2025-এ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বিগ ডেটা, নেটওয়ার্ক ও সাইবারসিকিউরিটি এবং প্রযুক্তিগত সাক্ষরতাকে দ্রুত বাড়তে থাকা দক্ষতার মধ্যে রাখা হয়েছে।

সাইবারসিকিউরিটিও এমন একটি ক্ষেত্র, যার গুরুত্ব আগামী দিনে আরও বাড়তে পারে। ব্যাঙ্কিং থেকে স্বাস্থ্য পরিষেবা, ই-কমার্স থেকে সরকারি পরিষেবা প্রায় সব ক্ষেত্রই ডিজিটাল হওয়ায় তথ্য সুরক্ষার প্রয়োজন তৈরি হচ্ছে। কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, ক্লাউড সিকিউরিটি, এথিক্যাল হ্যাকিং, ডিজিটাল ফরেনসিকস কিংবা ইনফরমেশন সিকিউরিটির মতো বিষয়ে বিশেষায়িত শিক্ষা নেওয়া যায়। তবে এই ক্ষেত্রে নামী প্রতিষ্ঠানের কোর্সের পাশাপাশি কোর্সটির স্বীকৃতি, সিলেবাস, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ এবং শিল্পক্ষেত্রে তার গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করা জরুরি।

ডেটা নিয়ে কাজ করার আগ্রহ থাকলে ডেটা অ্যানালিটিক্সও একটি সম্ভাবনাময় পথ। কোনও সংস্থার বিপুল তথ্যকে বিশ্লেষণ করে ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তে সাহায্য করা এই ক্ষেত্রের অন্যতম কাজ। Excel, SQL, Python, ডেটা ভিজুয়ালাইজেশন এবং পরিসংখ্যানের ভিত্তি জানা থাকলে শুরুটা শক্তিশালী হতে পারে। শুধু সার্টিফিকেট সংগ্রহ না করে কয়েকটি বাস্তব ডেটাসেট নিয়ে নিজে কাজ করে সেই কাজের নমুনা তৈরি করা অনেক বেশি কার্যকর। চাকরির সময় সেটিই আপনার দক্ষতার বাস্তব প্রমাণ হিসেবে কাজ করতে পারে।

প্রযুক্তি ছাড়াও স্বাস্থ্যক্ষেত্রে পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে। চিকিৎসক বা নার্স হওয়ার প্রচলিত পথের বাইরে ফিজিওথেরাপি, মেডিক্যাল ল্যাবরেটরি টেকনোলজি, রেডিওলজি ও ইমেজিং, অপারেশন থিয়েটার টেকনোলজি, অপটোমেট্রি, ফার্মাসি এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য-সহায়ক ক্ষেত্রে কোর্স করা যায়। এই ধরনের কোর্স বেছে নেওয়ার সময় প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি এবং সংশ্লিষ্ট পেশায় কাজ করার জন্য কোনও নির্দিষ্ট রেজিস্ট্রেশন বা লাইসেন্স প্রয়োজন কি না, তা আগে জেনে নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্যক্ষেত্রে শুধুমাত্র অনলাইনে পাওয়া কোনও সার্টিফিকেটকে পেশাগত যোগ্যতার সমতুল্য ভাবা উচিত নয়।

ডিজাইন ও সৃজনশীল কাজের জগৎও বদলেছে। গ্রাফিক ডিজাইন, ইউআই/ইউএক্স ডিজাইন, মোশন গ্রাফিক্স, অ্যানিমেশন, ভিডিও এডিটিং, থ্রিডি ডিজাইন, ইলাস্ট্রেশন কিংবা ফ্যাশন ডিজাইনের মতো ক্ষেত্রে আগ্রহী পড়ুয়ারা বিশেষায়িত কোর্স করতে পারেন। এই ধরনের কেরিয়ারে ডিগ্রির পাশাপাশি ‘পোর্টফোলিও’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ আপনি কী করতে পারেন, তার বাস্তব কাজের নমুনা। একজন ডিজাইনের পড়ুয়া যদি কোর্স শেষ করার আগেই কয়েকটি ভালো প্রকল্প, পোস্টার, ওয়েব ইন্টারফেস, অ্যানিমেশন বা ব্র্যান্ডিং কাজের নমুনা তৈরি করতে পারেন, তাহলে ভবিষ্যৎ চাকরি বা ফ্রিল্যান্স কাজের ক্ষেত্রে তা বড় সুবিধা দিতে পারে।

ডিজিটাল মার্কেটিংও তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। সোশ্যাল মিডিয়া ম্যানেজমেন্ট, সার্চ ইঞ্জিন অপ্টিমাইজেশন, কনটেন্ট মার্কেটিং, পারফরম্যান্স মার্কেটিং, ই-মেইল মার্কেটিং এবং অ্যানালিটিক্স—এই ক্ষেত্রগুলিতে কাজের সুযোগ রয়েছে। তবে এখানেও শুধু একটি ছ’মাসের সার্টিফিকেট যথেষ্ট নয়। লেখার দক্ষতা, যোগাযোগের ক্ষমতা, সংখ্যাগত বিশ্লেষণ, বিজ্ঞাপনের মৌলিক ধারণা এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বোঝার ক্ষমতা একসঙ্গে তৈরি করতে হয়। নিজের একটি ছোট প্রকল্প, ব্লগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পেজ বা কাল্পনিক ব্র্যান্ডের জন্য প্রচার পরিকল্পনা তৈরি করে পোর্টফোলিও বানানো যেতে পারে।

যাঁদের ভাষা, ইতিহাস, সমাজ, সংস্কৃতি বা মানুষের সঙ্গে কাজ করার বিষয়ে আগ্রহ, তাঁদের জন্যও কেরিয়ারের দরজা কম নয়। মনোবিজ্ঞান, সমাজকর্ম, সাংবাদিকতা, গণযোগাযোগ, ভাষা ও অনুবাদ, শিক্ষা, মানবসম্পদ, আইন কিংবা জননীতি—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই উচ্চশিক্ষা ও বিশেষ প্রশিক্ষণের সুযোগ রয়েছে। আজকের চাকরির বাজারে যোগাযোগের দক্ষতা, সৃজনশীল চিন্তা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা এবং নেতৃত্বের মতো মানবিক দক্ষতার গুরুত্বও কমছে না। Future of Jobs Report 2025-এ analytical thinking-কে নিয়োগদাতাদের কাছে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ core skill হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

হসপিটালিটি, ট্রাভেল ও এভিয়েশনেও আগ্রহী পড়ুয়ারা বিভিন্ন ডিপ্লোমা বা ডিগ্রি কোর্স করতে পারেন। হোটেল ম্যানেজমেন্ট, ফুড প্রোডাকশন, ফ্রন্ট অফিস, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কিংবা ট্রাভেল-ট্যুরিজমের মতো বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেওয়া যায়। যাঁদের মানুষের সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগে, পরিষেবা দিতে আগ্রহ রয়েছে এবং নতুন পরিবেশে কাজ করার মানসিকতা আছে, তাঁদের জন্য এই ক্ষেত্র আকর্ষণীয় হতে পারে। তবে এখানে ইংরেজির পাশাপাশি প্রয়োজনে অন্যান্য ভাষা শেখা এবং বাস্তব প্রশিক্ষণ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

আরেকটি পথ হল দক্ষতাভিত্তিক কারিগরি শিক্ষা। ইলেকট্রিশিয়ান, ফিটার, ওয়েল্ডার, অটোমোটিভ টেকনিশিয়ান, রেফ্রিজারেশন ও এয়ার-কন্ডিশনিং, মেশিন অপারেশন, ইন্ডাস্ট্রিয়াল অটোমেশন, ড্রোন-সম্পর্কিত প্রযুক্তি কিংবা অন্যান্য টেকনিক্যাল ট্রেডে প্রশিক্ষণ নিয়ে দক্ষ কর্মী হিসেবে কেরিয়ার তৈরি করা যায়। হাতে-কলমে কাজ শেখার এই পথকে অনেক পরিবার এখনও ‘দ্বিতীয় সারির’ শিক্ষা মনে করেন, কিন্তু বাস্তবে দক্ষতার বাজারে ভালো প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতার মূল্য রয়েছে। নিজের আগ্রহ ও দক্ষতার সঙ্গে মিললে এই পথও অত্যন্ত সম্মানজনক এবং স্থায়ী কেরিয়ার তৈরি করতে পারে।

তবে কোর্স বেছে নেওয়ার আগে কয়েকটি প্রশ্ন নিজেকেই করতে হবে। এই কোর্স শেষ করলে ঠিক কোন ধরনের কাজ করতে পারব? সেই কাজের জন্য এই প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতা গ্রহণযোগ্য কি না? কোর্সে বাস্তব প্রশিক্ষণ আছে কি? ইন্টার্নশিপের সুযোগ রয়েছে কি? প্রাক্তন পড়ুয়ারা কোথায় কাজ করছেন? মোট খরচ কত? কোর্স শেষ করার পর উচ্চশিক্ষার সুযোগ থাকবে কি? এই প্রশ্নগুলির উত্তর না জেনে শুধুমাত্র বিজ্ঞাপনের ‘১০০ শতাংশ প্লেসমেন্ট’ বা ‘উচ্চ বেতনের চাকরি’ দেখে ভর্তি হওয়া উচিত নয়।

বিশেষ করে অনলাইন কোর্সের ক্ষেত্রে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। অনলাইনে শেখা এখন অত্যন্ত কার্যকর, কিন্তু সব অনলাইন কোর্সের মূল্য এক নয়। কোর্সটি কে পরিচালনা করছে, শিক্ষক কারা, সিলেবাস কী, মূল্যায়ন কীভাবে হয়, প্রকল্প বা ইন্টার্নশিপের সুযোগ আছে কি না এবং সার্টিফিকেটটি শিল্পক্ষেত্রে কতটা গ্রহণযোগ্য—সবই যাচাই করা দরকার। বিনামূল্যে পাওয়া ভালো মানের শিক্ষাসামগ্রী ব্যবহার করেও অনেক দক্ষতা তৈরি করা সম্ভব। তাই দামি কোর্স মানেই ভালো কোর্স—এই ধারণা থেকেও বেরিয়ে আসা জরুরি।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল ইংরেজি ও যোগাযোগ দক্ষতা। প্রযুক্তি, ডিজাইন বা ডেটা—যে ক্ষেত্রেই যান না কেন, নিজের কাজ অন্যকে বোঝাতে পারা অত্যন্ত জরুরি। বিদেশে বা বহুজাতিক সংস্থায় কাজের লক্ষ্য থাকলে ইংরেজির পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দেশের ভাষা ও কাজের সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা বাড়তি সুবিধা দিতে পারে। একই সঙ্গে সাক্ষাৎকারে নিজের দক্ষতা তুলে ধরা, ই-মেল লেখা, উপস্থাপনা করা এবং পেশাগতভাবে যোগাযোগ করার অভ্যাস তৈরি করা উচিত।

সবশেষে, স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে প্রথম সিদ্ধান্তটাই যে সারাজীবনের সিদ্ধান্ত হতে হবে, এমন নয়। সময়ের সঙ্গে মানুষের আগ্রহ বদলাতে পারে, নতুন দক্ষতা শেখা যায়, একটি ক্ষেত্র থেকে অন্য ক্ষেত্রেও যাওয়া যায়। কিন্তু শুরুটা যত বেশি সচেতনভাবে করা যায়, পথ তত সহজ হয়। আজকের কেরিয়ার দুনিয়ায় একটি ডিগ্রির সঙ্গে একটি বাস্তব দক্ষতা, তার সঙ্গে যোগাযোগক্ষমতা এবং নিয়মিত নতুন কিছু শেখার মানসিকতা এই সমন্বয়ই সবচেয়ে শক্তিশালী সম্পদ। তাই ‘কোন কোর্সে ভর্তি হব’ প্রশ্নটির পাশাপাশি নিজের কাছে আরও একটি প্রশ্ন রাখুন ‘এই কোর্স আমাকে আগামী পাঁচ বছর পরে কী করতে সক্ষম করে তুলবে?’ উত্তরটি যত স্পষ্ট হবে, কেরিয়ারের প্রথম পদক্ষেপটিও তত দৃঢ় হবে।

Archive

Most Popular