19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

যিনি ডাক দেন চির নূতনের, তিনি যে রসনায় বৈচিত্রবিলাসী হবেনই, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। সেই রবীন্দ্রনাথ আর জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির হেঁশেলের খবর নিলেন তৃষা নন্দী।

প্রতিবেদন

তৃষা নন্দী


রবি ঠাকুরের কলমে নানা রঙের স্বাদ মিলেমিশে একাকার- বাঙালির সুখের রবীন্দ্রনাথ, বিরহের রবীন্দ্রনাথ, প্রবল বর্ষার রবীন্দ্রনাথ, ভরা জোছনার রবীন্দ্রনাথ। সেই রবীন্দ্রনাথ তো রসনা পরিতুষ্টিতে মিলিয়ে দেবেনই দেশ-বিদেশের আস্বাদনকে। আসলে পাতের শুরু থেকে শেষ সবটা নিয়েই বড্ড খুঁতখুঁতে শুধু রবীন্দ্রনাথ একাই নন, ঠাকুরবাড়িরই রেওয়াজ এটা। তা না হলে, নতুন বউ ঘরেও ঢোকেনি, তার আগেই নাকি তাকে 'রান্নার ক্ষমতা সম্বন্ধে' জিজ্ঞাসা করে উঠতেন কবিগুরুর ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী। তীব্র রন্ধন ভালোবাসার জন্যই একটা লম্বা খাতায় নথিবদ্ধ করে গিয়েছেন কত শত রান্নার ফর্দ। পরবর্তীতে ঠাকুর বাড়িরই কন্যা নলিনী দেবীর মেয়ে পূর্ণিমাদেবী তাঁর মায়ের হাতের রান্নার সাথে পুরোনো সেই লম্বা খাতার রান্নাকে মিলিয়ে মিশিয়ে সংকলন করলেন 'ঠাকুরবাড়ির রান্না'-র। আধুনিকা গৃহিনীর মড্যুলার কিচেনেও সে বই আজও ঝলমলে।

বিচিত্র রান্নার ঝোঁক ছিল অবনীন্দনাথ ঠাকুরেরও। লেখক, ছবি আঁকিয়ে মানুষটা সুযোগ পেলেই পরীক্ষা চালাতেন হেঁশেলে। ভাঙতে পছন্দ করতেন প্রচলিত রান্নার নিয়ম কানুন। পেঁয়াজ ভাজার কথা শুরুতে বলা হলে তিনি ভাজতেন শেষে। এমনি উল্টে পাল্টেই সৃষ্টি করলেন 'মুর্গির মাছের ঝোল' কিংবা 'মাছের মাংসের কারি'। খামখেয়ালী অবন ঠাকুরের উদ্যোগে নাকি তৈরি হল বিচিত্র রান্নার ক্লাবও। শোনা যায় রান্না শেষে বাড়তি উপকরণ দিয়েও নাকি নতুন রান্না করে ফেলতেন অবনীন্দ্রনাথ।

রবীন্দ্রনাথের বড় দাদা দ্বিজেন্দ্রনাথ ছিলেন খুঁতখুঁতে। লুচি খাওয়ার সময় হাতে ঘি লাগলে সরিয়ে দিতেন থালা। চাকরকে বললেন, জল দিয়ে লুচি ভেজে আনতে। পুত্রবধূ হেমলতা দেবী ঘি দিয়ে লুচি বেলার পরিবর্তে সামান্য শুকনো ময়দা দিয়ে বেলে লুচি ভাজিয়ে আনলেন। মোচার ঘন্টে গরম মশলা পড়লে খেতে বসে তুলকালাম বাঁধাতেন দ্বিজেন্দ্রনাথ।

সেই কোন ছোটবেলায় বালক রবি, বাবা দেবেন্দ্রনাথের সাথে পাড়ি দিলেন বিদেশ ভ্রমণে। আর যখন ফিরে এলেন, বিপ্লব এলো ঠাকুরবাড়ির হেঁশেলে। দেশ বিদেশের ভালো লাগার পদগুলো একে একে হাত ধরল সুদূর কলকাতার জোড়াসাঁকোয়। ইউরোপিয়ান, কন্টিনেন্টাল, জাপানের চা, স্যালাড একে একে দেশী হল।

বালক রবির পছন্দের কাঁচা আম লুকিয়ে এনে দিতেন বৌঠান কাদম্বরী দেবী। আচারের প্রতি ছিল প্রবল অনুরাগ। ঠাকুরবাড়িতে প্রায়শই খামখেয়ালি সভা বসত। মধ্যমণি রবীন্দ্রনাথ। সেই খামখেয়ালিপনা থেকেই মধ্যরাতে কবিপত্নী মৃণালিনী দেবীকে ঘুম থেকে উঠে রাঁধতে বসতে হতো নতুন পদ। কবি পরখ করে বলতেন দোষ-গুণ। মৃণালিনী দেবীর রান্নার খ্যাতি ছিল বিশেষ রকমের। কবির রান্নার এক্সপেরিমেন্টের একমাত্র সঙ্গী ছিলেন তিনি। জোড়াসাঁকোর পরে শান্তিনিকেতনেও অব্যহত থেকেছে সে ধারা। হেঁশেলের নানান টুকিটাকির বিষয়েও বৈজ্ঞানিক নির্দেশ দিতেন রবীন্দ্রনাথ। পছন্দ করতেন পরীক্ষা-নিরীক্ষা। মৈত্রেয়ীকে দেবী কবি বলেছেন, "... 'সামন' মাছের কচুরি বানাও না, সে রীতিমতো ভাল হয়। আমি যখন মেজদার ওখানে ছিলুম তখন বৌঠাকরুনকে দিয়ে নানা রকম এক্সপেরিমেন্ট করিয়েছি। তাছাড়া রথীর মার কাছে তো একটা বড় খাতা ছিল আমার রান্নার, সে কোথায় গেছে কে জানে! টিনের মাছের কচুরি আর জ্যামের প্যারাকী, সে সব মন্দ খাদ্য নয়!"

কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথের 'পিতৃস্মৃতি'-র পাতা ভরে উঠেছে বাবা-মার দ্বৈত রন্ধনের গল্পে। স্ত্রীর হাতের নতুন রান্নার পরখই নয়, নতুন নামকরণ করতেন রবীন্দ্রনাথ। মৃণালিনী দেবীর হাতে তৈরি গজা নতুন নাম পেল 'পরিবন্ধ'। তীব্র আপত্তির পরেও স্বামীর নির্দেশে বানাতে হয়েছিল মানকচুর জিলিপি। শান্তিনিকেতনের ছোট্ট রান্নাঘরে বাসনপত্র সীমিত, উপকরণও তথৈবচ। অথচ কবি কেমন বলে গেলেন স্ত্রীকে, "পারবে কি তোমার আমের মিঠাই, দইয়ের মালপো, চিড়ের পুলি প্রভৃতি খাবারগুলি করতে?” স্ত্রীও কম যান না। হেসে বলেছিলেন, "হবে, সব হবে।” সেই মৃণালিণী দেবীর অসুস্থ শয্যায় পথ্যির ভার নিলেন রবীন্দ্রনাথ।
মাংসের সুরুয়া বেঁধে ওষুধের সাথে খাইয়ে দিতেন স্ত্রীকে ভুলিয়ে। উনি যে মাংস খান না, অথচ শরীরের যা হাল তাতে মাংস না খাইয়ে গতি

নেই।

অকালে চলে গেলেন মৃণালিনী দেবী। তারপর বহু বছর নিরামিষ খেয়েছেন কবি। ছেড়ে দিয়েছেন খাবার বাতুলতা। ভেজানো মুগডাল খেয়েও কাটিয়েছেন একেক দিন। শাশুড়িমা স্বহস্তে রান্না করে মাছের পদ পাতে দিলে না বলতে পারেননি কবি। হাসিমুখে খেয়েছেন। সকালের জলখাবারে মায়ের মতো স্বযত্নে থালায় সাজিয়েছেন এক টিন বিলাতী দুধ, পরিজ, জ্যাম, ফল। কাঁটা চামচে মিশিয়ে খাইয়েছেন সন্তানদের।

রানী চন্দ লিখেছেন, তিনি খেতেন কম। তবে সাজানোর আড়ম্বর চাই। খাবার পাতে বিলি হয়ে যেত বেশিরভাগটাই। দীর্ঘ ট্রেন যাত্রায় খাবার দিতে হতো এমন করে যাতে সঙ্গের মানুষগুলোও আয়েশ করে খেতে পারে।

শেষ বয়সে অসুখের সময় খেতে চাইতেন না প্রায় কিছুই। কবিরাজের নির্দেশে বন্ধ অনেক খাবার। ভাপা দই, তোপসে মাছ ভাজা আর হরেক রকম পছন্দের খাবার আনছেন সকলেই। সামান্য খেতেন, কখনও খেতেন না। অপারেশনের ঠিক আগে বহুদিন পর হালকা মাছের ঝোল খেয়েছিলেন তৃপ্তি করে।

"বাবা মনে করতেন খাওয়াটা উপলক্ষ্য মাত্র, রান্না ভালো হলেই হল না- খাবার পাত্র, পরিবেশনের প্রণালী, ঘর সাজানো সবই সুন্দর হওয়া চাই।” ভোজনবিলাসী বাবার স্মৃতিকথায় বলেছেন রথীন্দ্রনাথ। শান্তিনিকেতন আশ্রমে কত কত মহিলার হাতের স্নেহমাখা পদ চেখে দেখেছেন কবি, শুধুই মন রক্ষার জন্য।

১৯১৩ সালে তিনি নোবেল পুরস্কার পান। ঠিক তার আগের বছর লন্ডনে গীতাঞ্জলির ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয়। ওই দিনের অনুষ্ঠান আয়োজন করেছিল ইন্ডিয়ান সোসাইটি, লন্ডন। কবির পছন্দের খাবারে সেজেছিল সেদিনের ভোজসভা। লিস্টটা ছিল এইরকম- গ্রিন ভেজিটেবল স্যুপ, ক্রিম অফ টমেটো স্যুপ, স্যামন ইন হল্যান্ডেন সস এ্যান্ড কিউকামবার, প্রি সলটেড ল্যাম্ব উইথ গ্রিন ভেজিটেবল, রোস্ট চিকেন, ফেঞ্চ ফ্রাই, গ্রিন স্যালাড ও আইসক্রিম।

Archive

Most Popular