স্বাস্থ্য
নিজস্ব প্রতিনিধি
একসময় চুল পড়া নিয়ে মূলত বয়স বাড়ার পরেই আলোচনা হত। এখন কলেজপড়ুয়া কিংবা কুড়ির কোঠায় পা দেওয়া তরুণ-তরুণীর মুখেও শোনা যায়, “চুলটা অসম্ভব পড়ছে!” স্নানের সময় মুঠো মুঠো চুল উঠে আসা, বালিশে চুলের স্তর, চিরুনিতে জমে থাকা গোছা গোছা চুল কিংবা মাথার সামনের অংশ ক্রমশ পাতলা হয়ে যাওয়া সব মিলিয়ে কম বয়সেই চুল নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে। সামাজিক মাধ্যমে তাই এমন কথাও শোনা যায় যে মিলেনিয়ালদের তুলনায় জেন জি-র চুল নাকি দ্রুত ঝরে যাচ্ছে। কিন্তু সত্যিই কি প্রজন্মভেদে চুল পড়ার হার এতটা আলাদা? বৈজ্ঞানিকভাবে এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো যথেষ্ট প্রমাণ নেই। বরং বিশেষজ্ঞদের মতে, বয়স, বংশগত প্রবণতা, পুষ্টি, মানসিক চাপ, হরমোন, অসুস্থতা, ওষুধ, ঘুম এবং চুলের যত্নের অভ্যাস সব মিলিয়েই চুল পড়ার সমস্যা তৈরি হতে পারে।
প্রথমে বোঝা দরকার, প্রতিদিন কিছু চুল পড়া স্বাভাবিক। মানুষের মাথায় থাকা চুল সবসময় একই পর্যায়ে থাকে না। কিছু চুল বাড়ে, কিছু বিশ্রামের পর্যায়ে থাকে এবং নির্দিষ্ট সময় পরে পুরনো চুল ঝরে গিয়ে তার জায়গায় নতুন চুল আসে। ফলে চিরুনিতে কয়েকটি চুল দেখা গেলেই আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। সমস্যা তখনই, যখন স্বাভাবিকের তুলনায় হঠাৎ চুল পড়ার পরিমাণ বেড়ে যায়, দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে, মাথার নির্দিষ্ট জায়গা ফাঁকা হতে শুরু করে অথবা চুলের ঘনত্ব চোখে পড়ার মতো কমে যায়।
জেন জি-র জীবনযাপনের দিকে তাকালে অবশ্য কিছু সম্ভাব্য কারণ চোখে পড়ে। অনিয়মিত ঘুম, দীর্ঘ সময় পড়াশোনা বা কাজের চাপ, খাবারের সময়ের অনিয়ম, অতিরিক্ত প্রসেসড খাবার, দ্রুত ওজন কমানোর চেষ্টা এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ এসবের কোনওটিই চুলের স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো নয়। বিশেষ করে পর্যাপ্ত প্রোটিন, আয়রন, জিঙ্ক, ভিটামিন বি১২ কিংবা ভিটামিন ডি-র ঘাটতি থাকলে কিছু মানুষের চুল পড়া বাড়তে পারে। তবে শুধু চুল পড়ছে বলেই নিজে থেকে ভিটামিন বা আয়রনের ওষুধ শুরু করা উচিত নয়। ঘাটতি রয়েছে কি না, তা প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা করে দেখা ভালো।
আজকের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে দ্রুত ওজন কমানোর প্রবণতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কয়েক সপ্তাহে অনেকটা ওজন কমিয়ে ফেলা, অত্যন্ত কম ক্যালরির খাবার খাওয়া কিংবা কোনও একটি খাদ্যগোষ্ঠী সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া শরীরের উপর চাপ তৈরি করতে পারে। এর কয়েক মাস পর অতিরিক্ত চুল ঝরার সমস্যা দেখা দিতে পারে। একে অনেক সময় টেলোজেন এফ্লুভিয়াম বলা হয়। জ্বর বা গুরুতর অসুস্থতা, অস্ত্রোপচার, প্রচণ্ড মানসিক চাপ, দ্রুত ওজন কমা কিংবা কিছু হরমোনগত পরিবর্তনের পরেও এই ধরনের সাময়িক চুল পড়া দেখা দিতে পারে। কারণ ও ট্রিগার ঠিক হলে অনেক ক্ষেত্রেই ধীরে ধীরে চুলের বৃদ্ধি স্বাভাবিক হতে পারে।
আর একটি বড় কারণ হতে পারে ঘুমের অভাব। রাত জেগে মোবাইল দেখা, পড়াশোনা বা কাজের চাপ, অনিয়মিত সময়ে ঘুমানো—এসব অভ্যাস দীর্ঘদিন চললে সামগ্রিক স্বাস্থ্যে প্রভাব পড়তে পারে। চুল পড়ার সঙ্গে ঘুমের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা এখনও চলছে এবং শুধু কম ঘুমকে চুল পড়ার একমাত্র কারণ বলা যায় না। তবে পর্যাপ্ত ও নিয়মিত ঘুম শরীরের সামগ্রিক সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই চুল বাঁচাতে কোনও দামি সিরামের আগে ঘুমের সময়টুকু ঠিক করার চেষ্টা করাই বেশি বুদ্ধিমানের কাজ।
চুলের সঙ্গে মানসিক চাপের সম্পর্কও উপেক্ষা করা যায় না। পরীক্ষা, চাকরি, কর্মক্ষেত্রের প্রতিযোগিতা, সম্পর্কের সমস্যা কিংবা ব্যক্তিগত উদ্বেগ—দীর্ঘদিনের স্ট্রেস শরীরে নানা পরিবর্তন আনতে পারে। কখনও কোনও বড় মানসিক বা শারীরিক চাপের কয়েক মাস পরে চুল পড়া বেড়ে যেতে দেখা যায়। আবার চুল পড়া নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বেগও সমস্যাটিকে আরও মানসিকভাবে কঠিন করে তুলতে পারে। তাই চুল পড়ার সমস্যা হলে প্রথমেই আতঙ্কিত না হয়ে কারণ খুঁজে বের করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, চুলের উপর অতিরিক্ত প্রসাধনী ব্যবহারও ক্ষতির কারণ হতে পারে। নিয়মিত হেয়ার কালার, ব্লিচ, কেমিক্যাল ট্রিটমেন্ট, রিবন্ডিং কিংবা অতিরিক্ত তাপ প্রয়োগ চুলের বাইরের অংশকে দুর্বল করে দিতে পারে। এতে চুল ভেঙে যেতে পারে। মনে রাখতে হবে, ‘চুল পড়া’ আর ‘চুল ভেঙে যাওয়া’ এক জিনিস নয়। মাথার গোড়া থেকে চুল ঝরে পড়া এক ধরনের সমস্যা, আর চুলের মাঝখান থেকে ভেঙে যাওয়া অন্য সমস্যা। দুটির কারণ এবং সমাধানও এক নয়।
খুব শক্ত করে চুল বাঁধার অভ্যাসও দীর্ঘদিন চললে বিপদ ডেকে আনতে পারে। শক্ত পনিটেল, টাইট বিনুনি, খোঁপা কিংবা নিয়মিত এমন হেয়ারস্টাইল যাতে চুলের গোড়ায় টান পড়ে, তা ট্র্যাকশন অ্যালোপেশিয়ার কারণ হতে পারে। শুরুতেই অভ্যাস পরিবর্তন করা জরুরি। প্রতিদিন একই জায়গায় শক্ত করে চুল বাঁধার বদলে চুলকে কিছুটা স্বাভাবিক রাখুন এবং মাথার ত্বকে অপ্রয়োজনীয় টান এড়িয়ে চলুন।
চুলের যত্নে সবচেয়ে বড় ভুলগুলির একটি হল সামাজিক মাধ্যমে দেখা ‘ম্যাজিক’ টোটকা অনুসরণ করা। পেঁয়াজের রস, নানা ধরনের তেল, ঘরোয়া মাস্ক কিংবা অজানা উপাদান ব্যবহার করে রাতারাতি নতুন চুল গজানোর দাবি শুনতে পাওয়া যায়। কিন্তু প্রত্যেকের মাথার ত্বক ও চুলের সমস্যা এক নয়। কোনও উপাদান কারও ক্ষেত্রে সহনীয় হলেও অন্যের ক্ষেত্রে অ্যালার্জি বা জ্বালা তৈরি করতে পারে। তাই নতুন কিছু মাথার ত্বকে লাগানোর আগে সতর্ক থাকা উচিত। চুলের সমস্যা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, সোশ্যাল মিডিয়ার টোটকার বদলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
শ্যাম্পু নিয়েও রয়েছে নানা ভুল ধারণা। অনেকে ভাবেন, চুল বেশি পড়ছে মানেই শ্যাম্পু কম করতে হবে। আসলে মাথার ত্বক পরিষ্কার রাখা জরুরি। তবে কত ঘন ঘন শ্যাম্পু করা উচিত, তা চুলের ধরন, মাথার ত্বকের তৈলাক্ততা, খুশকি এবং ব্যক্তিগত প্রয়োজনের উপর নির্ভর করে। অতিরিক্ত গরম জল দিয়ে মাথা ধোয়া, নখ দিয়ে জোরে মাথার ত্বক ঘষা কিংবা ভেজা চুলে জোরে আঁচড়ানো এড়ানো ভালো। চুল ধোয়ার পর তোয়ালে দিয়ে ঘষে ঘষে শুকানোর বদলে আলতো করে জল শুষে নেওয়া উচিত।
খাবারের দিকে একটু নজর দিলেই চুলের যত্নের অনেকটাই হয়ে যায়। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত প্রোটিন থাকা জরুরি। ডিম, মাছ, মাংস, দুধ ও দইয়ের মতো খাবার যাঁরা খান, তাঁদের পাশাপাশি নিরামিষভোজীদের জন্য ডাল, ছোলা, রাজমা, সয়াবিন, বাদাম ও বীজ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। শাকসবজি, ফল এবং বিভিন্ন ধরনের সম্পূর্ণ শস্যও খাদ্যতালিকায় থাকা উচিত। তবে কোনও একটি খাবারকে ‘চুল গজানোর খাবার’ বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। শরীরের সামগ্রিক পুষ্টিই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
যাঁরা নিরামিষভোজী, যাঁদের অতিরিক্ত মাসিক রক্তক্ষরণ হয়, যাঁরা খুব কম খাবার খান অথবা যাঁদের কোনও শারীরিক সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পুষ্টির ঘাটতির ঝুঁকি আলাদা হতে পারে। চুল পড়া যদি নতুন করে শুরু হয় বা দ্রুত বেড়ে যায়, চিকিৎসক প্রয়োজন মনে করলে রক্তাল্পতা, আয়রনের ঘাটতি, থাইরয়েড বা অন্য কোনও কারণ খতিয়ে দেখতে পারেন। পরীক্ষার ফল না জেনে নিজের মতো করে আয়রন, বায়োটিন কিংবা অন্য সাপ্লিমেন্ট খাওয়া ঠিক নয়।
বংশগত কারণকেও ভুললে চলবে না। পুরুষ ও নারী, দুই ক্ষেত্রেই অ্যান্ড্রোজেনেটিক অ্যালোপেশিয়া হতে পারে। অনেক সময় কপালের সামনের অংশ বা মাথার মাঝখান থেকে চুল পাতলা হতে শুরু করে এবং ধীরে ধীরে সমস্যা বাড়ে। পরিবারের কারও এমন ইতিহাস থাকলে কম বয়সেও লক্ষণ দেখা দিতে পারে। এই ধরনের চুল পড়ায় যত তাড়াতাড়ি কারণ শনাক্ত করা যায়, তত দ্রুত উপযুক্ত চিকিৎসার বিষয়ে আলোচনা করা সম্ভব।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন? চুল হঠাৎ অস্বাভাবিকভাবে ঝরতে শুরু করলে, মাথায় গোল গোল ফাঁকা জায়গা তৈরি হলে, ভ্রু বা শরীরের অন্য অংশের চুলও পড়তে শুরু করলে, মাথার ত্বকে ব্যথা, লালচে ভাব, খোসা বা প্রদাহ থাকলে কিংবা কয়েক মাস ধরে চুল পড়া কমার বদলে বাড়তে থাকলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। একইভাবে চুল পড়ার সঙ্গে অতিরিক্ত ক্লান্তি, ওজনের অস্বাভাবিক পরিবর্তন, মাসিকের অনিয়ম বা অন্য কোনও নতুন উপসর্গ থাকলেও চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা প্রয়োজন।
চুলের যত্নের ক্ষেত্রে তাই ‘জেন জি বনাম মিলেনিয়াল’ তুলনার চেয়ে আসল বিষয় হল জীবনযাপন ও ব্যক্তিগত কারণ। যে তরুণ নিয়মিত ঘুমোয় না, অস্বাস্থ্যকর খাবার খায়, দ্রুত ওজন কমানোর চেষ্টা করে, প্রচণ্ড মানসিক চাপে থাকে এবং নিয়মিত চুলে রাসায়নিক ব্যবহার করে, তার চুল পড়ার ঝুঁকি শুধু বয়সের কারণে বাড়বে, এমন কথা বলা যায় না। আবার স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করেও কেউ বংশগত বা হরমোনজনিত কারণে চুল পড়ার সমস্যায় ভুগতে পারেন।
তাই চুল পড়া শুরু হলেই দামি তেল, সিরাম কিংবা সাপ্লিমেন্টের দিকে ছুটে না গিয়ে প্রথমে নিজের জীবনযাপনের দিকে তাকান। খাবার ঠিক করুন, পর্যাপ্ত ঘুমের চেষ্টা করুন, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ কমানোর পথ খুঁজুন, চুলে অতিরিক্ত টান ও রাসায়নিক ব্যবহার কমান এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। কারণ চুলের সৌন্দর্য শুধু বাহ্যিক যত্নে নয়, শরীরের ভিতরের সুস্থতার সঙ্গেও জড়িয়ে। প্রজন্ম বদলেছে, চুলের ফ্যাশন বদলেছে, বদলেছে জীবনযাপনের ধরনও, কিন্তু সুন্দর চুলের জন্য সুস্থ শরীরের প্রয়োজনীয়তাটা আজও বদলায়নি।