বাড়িঘর
নিজস্ব প্রতিনিধি
পুজো আসছে মানেই বাঙালির মনে একরাশ আনন্দের সঙ্গে শুরু হয়ে যায় ঘর গোছানোর ব্যস্ততা। আলমারি থেকে বেরিয়ে আসে নতুন জামাকাপড়, পুরনো জিনিসের হিসেব শুরু হয়, রান্নাঘরের কৌটো থেকে বারান্দার টব—সবকিছুতেই যেন একটু নতুন করে হাত দিতে ইচ্ছে করে। কিন্তু ঘর সাজাতে গেলেই যে অনেক টাকা খরচ করতে হবে, এমন কোনও কথা নেই। বরং একটু পরিকল্পনা, কিছুটা সৃজনশীলতা আর ঘরে থাকা জিনিসকে নতুনভাবে ব্যবহার করার বুদ্ধি থাকলে পুজোর আগেই কম খরচে বদলে দেওয়া যায় গোটা ঘরের আবহ।
ঘর সাজানোর প্রথম কাজ আসলে নতুন জিনিস কেনা নয়, অপ্রয়োজনীয় জিনিস সরানো। বছরের পর বছর জমে থাকা পুরনো কাগজ, ভাঙা শোপিস, ব্যবহার না করা প্লাস্টিকের বাক্স, মেয়াদ পেরিয়ে যাওয়া প্রসাধনী কিংবা আলমারির কোণে পড়ে থাকা অপ্রয়োজনীয় জিনিস আলাদা করুন। যা ব্যবহারযোগ্য কিন্তু নিজের প্রয়োজন নেই, তা অন্য কাউকে দেওয়া যেতে পারে। এতে ঘর যেমন ফাঁকা ও পরিষ্কার হবে, তেমনই নতুন কিছু কেনার আগে বুঝতে পারবেন আসলে কী প্রয়োজন।
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার পরেই আসে ঘরের রং ও আলো। পুরো বাড়িতে নতুন রং করার বাজেট না থাকলে শুধু একটি দেওয়ালকে নতুন করে রাঙানো যায়। বসার ঘরের একটি দেওয়ালে হালকা রং, কিংবা শোওয়ার ঘরে একটু উষ্ণ টোনের রং পুরো ঘরের চেহারাই বদলে দিতে পারে। আরও কম খরচে পরিবর্তন চাইলে দেওয়ালে নতুন ছবি, ফ্রেম, আয়না কিংবা নিজের হাতে তৈরি কোনও শিল্পকর্ম ব্যবহার করা যায়। পুরনো ফ্রেমে নতুন ছবি বসিয়েও অনেক সময় একেবারে নতুন লুক পাওয়া সম্ভব।
আলো ঘরের পরিবেশ বদলে দেওয়ার অন্যতম সহজ উপায়। খুব দামি ঝাড়বাতি কেনার দরকার নেই। বসার ঘরের কোনও কোণে একটি উষ্ণ আলো, জানালার পাশে ছোট ল্যাম্প কিংবা বারান্দায় নিরাপদভাবে ব্যবহারযোগ্য সাজসজ্জার আলো বসানো যেতে পারে। পুজোর সময় প্রদীপ, মোমবাতি বা বৈদ্যুতিক আলোকসজ্জা ব্যবহার করলে অবশ্যই আগুনের নিরাপত্তার দিকে নজর রাখতে হবে। পর্দা, কাগজ বা কাপড়ের সাজসজ্জার খুব কাছে খোলা আগুন রাখা উচিত নয়।
পর্দা বদলানোর ইচ্ছে থাকলে পুরো বাড়ির সব পর্দা একসঙ্গে বদলানোর প্রয়োজন নেই। বসার ঘরের পর্দাই বদলে দেওয়া যেতে পারে। অথবা পুরনো পর্দা ভালো করে ধুয়ে ইস্ত্রি করে নতুনভাবে ঝুলিয়ে দিন। অনেক সময় ধোয়া ও সঠিকভাবে সাজিয়ে দেওয়াতেই কাপড়ের চেহারা অনেকটা বদলে যায়। পুরনো শাড়ি বা কাপড়ের ভালো অংশ দিয়ে ছোট কুশন কভার, টেবিল রানার বা আলংকারিক কাপড় তৈরি করা গেলে খরচও কমবে, আবার ঘরে আসবে ব্যক্তিগত ছোঁয়া।
কুশন ও সোফার ক্ষেত্রেও একই কৌশল কাজে লাগতে পারে। সব কুশন বদলে না ফেলে শুধু কয়েকটি কুশন কভার পরিবর্তন করুন। পুজোর সময় লাল, হলুদ, সাদা, কমলা কিংবা মাটির রঙের মতো উৎসবমুখর টোন ব্যবহার করলে ঘরে আলাদা আবহ তৈরি হতে পারে। তবে ঘরের মূল রঙ যদি ইতিমধ্যে গাঢ় হয়, তাহলে অতিরিক্ত রঙ না এনে দু’টি বা তিনটি পরস্পরের সঙ্গে মানানসই রঙে সীমাবদ্ধ থাকাই ভালো।
বাঙালির বাড়িতে বইয়ের তাক বা পুরনো কাঠের আসবাবের আলাদা আকর্ষণ রয়েছে। সেগুলি পালিশ করাতে অনেক খরচ হলে নিজেরাই ভালোভাবে পরিষ্কার করে নিতে পারেন। কাঠের আসবাবে কোনও নতুন রঙ করার আগে উপকরণের ধরন বুঝে কাজ করা দরকার। পুরনো টেবিলের উপর একটি সুন্দর কাপড়ের রানার, ফুলের ছোট ваз কিংবা একটি মাটির প্রদীপ রাখলেও চেহারায় পরিবর্তন আসে। আসবাবপত্রের অবস্থান বদল করাও বিনামূল্যের একটি দুর্দান্ত সাজসজ্জার কৌশল। সোফা বা চেয়ার অন্যভাবে সাজিয়ে দেখুন, জানালার সামনে অপ্রয়োজনীয় আসবাব সরিয়ে দিন, ঘরের চলাচলের জায়গা খোলা রাখুন।
পুজোর আগে রান্নাঘরেও একটু নতুন করে নজর দেওয়া যায়। নতুন কৌটো বা তাক কেনার আগে পুরনো কৌটোগুলি ধুয়ে শুকিয়ে লেবেল লাগিয়ে সাজিয়ে নিন। একই ধরনের মশলা এক জায়গায়, ডাল অন্য জায়গায় এবং প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় জিনিস হাতের কাছে রাখলে রান্নাঘর অনেক গোছানো দেখায়। রান্নাঘরের যে জিনিসগুলি বহুদিন ব্যবহার করা হয়নি, সেগুলি আলাদা করুন। তবে খাদ্য সংরক্ষণের কৌটো ব্যবহার করার আগে ভালোভাবে পরিষ্কার ও সম্পূর্ণ শুকনো করে নেওয়া জরুরি।
বারান্দা বা জানালার পাশে সামান্য সবুজও ঘরের চেহারা বদলে দিতে পারে। নতুন অনেক গাছ কেনার প্রয়োজন নেই। ঘরে থাকা গাছগুলিকে অন্যভাবে সাজিয়ে দিন। পুরনো মাটির টব রাঙিয়ে নেওয়া যায়। ব্যবহৃত কাচের বোতল পরিষ্কার করে ছোট কাটিং বা জলপছন্দ গাছ রাখার পাত্র হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে, যদি তা নিরাপদ ও উপযোগী হয়। কয়েকটি গাছকে একসঙ্গে বিভিন্ন উচ্চতায় সাজালে ছোট্ট জায়গাতেও সুন্দর একটি সবুজ কোণ তৈরি হয়।
পুজোর সাজে আলপনার কথা না বললেই নয়। দরজার সামনে বা ঠাকুরঘরের কাছে নিজের হাতে একটি ছোট আলপনা আঁকুন। চালের গুঁড়ি বা পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবহার করে ঐতিহ্যবাহী নকশা করা যায়। যাঁরা আলপনা আঁকতে পারেন না, তাঁরা বাজারের সহজ পুনর্ব্যবহারযোগ্য স্টেনসিল ব্যবহার করতে পারেন। তবে এমন কোনও উপকরণ ব্যবহার না করাই ভালো যা মেঝেকে পিচ্ছিল করে দেয়।
ঠাকুরঘর সাজাতে আলাদা করে দামি জিনিস কেনারও প্রয়োজন নেই। পরিষ্কার কাপড়, ফুল, প্রদীপ এবং কয়েকটি ছোট মাটির পাত্র দিয়েই সুন্দর করে সাজানো যায়। পুরনো পিতলের বা ধাতুর পুজোর সামগ্রী ভালোভাবে পরিষ্কার করলে অনেকটাই নতুনের মতো দেখাতে পারে। ফুলের সাজে অতিরিক্ত কৃত্রিম উপকরণের বদলে স্থানীয় ও সহজলভ্য ফুল ব্যবহার করলে সাজে আরও স্বাভাবিক সৌন্দর্য আসে।
পুজোর সময় অতিথি আসবেন, তাই বসার জায়গাটিকে আরামদায়ক করে তোলা জরুরি। খুব বেশি শোপিস দিয়ে ঘর ভরিয়ে না দিয়ে চলাচলের জায়গা খোলা রাখুন। অতিরিক্ত আসবাব সরিয়ে রাখলে ছোট ঘরও অনেক বড় মনে হয়। অতিথিদের বসার জন্য কয়েকটি পরিষ্কার কুশন বা মেঝেতে ব্যবহারযোগ্য সুন্দর চাদর রাখা যেতে পারে। ঘরের সৌন্দর্যের পাশাপাশি আরাম ও ব্যবহারিক দিকটিও মাথায় রাখা দরকার।ঘর সাজানোর ক্ষেত্রে ‘সব নতুন’ করার প্রবণতা অনেক সময় বাজেট নষ্ট করে। বরং পুরনো ও নতুনের মিশ্রণেই তৈরি হতে পারে সবচেয়ে সুন্দর সাজ। ঠাকুমার পুরনো পিতলের প্রদীপ, মায়ের পুরনো শাড়ির কাপড় দিয়ে বানানো কুশন, পুরনো কাঠের চেয়ার, নিজের হাতে আঁকা ছবি—এই জিনিসগুলির মধ্যেই তো থাকে বাড়ির গল্প। পুজোর সাজ যদি শুধু দোকান থেকে কেনা জিনিসে ভরে যায়, তাহলে সেই ব্যক্তিগত উষ্ণতাটা অনেক সময় থাকে না।
তবে কম খরচে সাজাতে গিয়ে অনলাইন কেনাকাটার ফাঁদে পড়ারও দরকার নেই। ‘পুজোর আগে ঘর বদলে দিন’ ধরনের অফার দেখে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি জিনিস কিনে ফেললে শেষ পর্যন্ত বাজেটই বেড়ে যায়। আগে ঠিক করুন কোন জায়গাটিতে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন দরকার। ধরুন বসার ঘরটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তাহলে সেখানেই বাজেটের বড় অংশ ব্যবহার করুন। বাকি ঘরগুলিতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, আলো ও সামান্য সাজ দিয়েই কাজ চালানো যায়।
একটি ছোট বাজেট তৈরি করে নিলে কাজ অনেক সহজ হয়। যেমন, রং বা দেওয়াল সাজানোর জন্য নির্দিষ্ট অর্থ, আলো ও কাপড়ের জন্য নির্দিষ্ট অর্থ, গাছ বা ছোট সাজসজ্জার জন্য নির্দিষ্ট অর্থ। কেনাকাটার সময় সেই সীমা অতিক্রম না করার চেষ্টা করুন। পুজোর আনন্দের সঙ্গে যেন পরের মাসের আর্থিক চাপ না জুড়ে যায়, সেদিকেও নজর রাখা দরকার।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, পুজোর আগে ঘর সাজানোর কাজ যেন শুধু একজনের দায়িত্ব না হয়ে যায়। পরিবারের সবাই মিলে একদিন ‘ঘর গোছানোর দিন’ ঠিক করা যায়। কেউ বই সাজাবেন, কেউ আলমারি, কেউ বারান্দা, কেউ রান্নাঘর। শিশুরাও নিজেদের ঘর বা পড়ার টেবিল গুছিয়ে নিতে পারে। এতে কাজ দ্রুত শেষ হবে, পাশাপাশি ঘর সাজানোর মধ্যেও তৈরি হবে উৎসবের আনন্দ।
শেষ পর্যন্ত সুন্দর বাড়ির জন্য সবসময় দামি আসবাব, বিদেশি সাজসজ্জা বা বড় বাজেটের প্রয়োজন হয় না। পরিষ্কার ঘর, সঠিক আলো, একটু সবুজ, প্রিয় কিছু স্মৃতি আর মানুষের ভালোবাসা—এই কয়েকটি জিনিসই বাড়িকে সত্যিকারের সুন্দর করে। তাই এই পুজোয় ঘর সাজানোর মন্ত্র হোক, ‘কম কিনব, বেশি গুছোব, পুরনোকে নতুন করে ব্যবহার করব।’ নতুন জামার মতোই নতুন করে সাজানো ঘরেও যেন জেগে থাকে সেই চেনা বাঙালি বাড়ির উষ্ণতা।