6th Oct 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

কলকাতা থেকে উইকএন্ড ট্রিপে গ্রামবাংলার সেরা ৫ ঠিকানা!

ভ্রমণ

নিজস্ব প্রতিনিধি


উইকএন্ড মানেই কি পাহাড়, সমুদ্র কিংবা নামী কোনও পর্যটনকেন্দ্র? তা কিন্তু একেবারেই নয়। কলকাতার খুব কাছেই ছড়িয়ে রয়েছে এমন কিছু জায়গা, যেখানে দু’দিনের ছুটিতে পৌঁছে যাওয়া যায় বাংলার একেবারে অন্য রূপের কাছে। সেখানে নেই শহরের চেনা ব্যস্ততা, নেই সারাক্ষণ হর্নের শব্দ। আছে ধানখেত, পুকুরপাড়, মাটির রাস্তা, পুরনো জমিদারবাড়ি, টেরাকোটার মন্দির, নদী, জঙ্গল আর সন্ধ্যার পর ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। পুজোর আগে যখন শহর ধীরে ধীরে উৎসবের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত হয়ে উঠছে, তখন তার মধ্যেই একটু নিরিবিলি সময় কাটাতে চাইলে গ্রামবাংলার এই পাঁচ গন্তব্য হতে পারে আপনার পরবর্তী উইকএন্ডের ঠিকানা।

প্রথমেই আসা যাক শান্তিনিকেতনে। নামটি শুনলেই রবীন্দ্রনাথ, বিশ্বভারতী, লাল মাটি আর সোনাঝুরি গাছের কথা মনে পড়ে। কিন্তু শান্তিনিকেতনকে শুধুমাত্র একটি পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে দেখলে তার আসল সৌন্দর্য ধরা পড়ে না। এখানকার সৌন্দর্য আসলে ছড়িয়ে রয়েছে চারপাশের প্রকৃতিতে এবং ধীরগতির জীবনযাপনে। সকালে একটু তাড়াতাড়ি উঠে বেরিয়ে পড়লে দেখা যায় নরম আলোয় ভেজা লাল মাটির রাস্তা, গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে রোদ আর দূরে কোনও গ্রামের ঘর থেকে ভেসে আসা রান্নার গন্ধ। রবীন্দ্রভবন, উত্তরায়ণ, ছাতিমতলা ঘুরে দেখার পাশাপাশি খোয়াইয়ের প্রাকৃতিক ভূদৃশ্য এবং সোনাঝুরি অঞ্চলের হাট ঘুরে দেখতে পারেন। স্থানীয় হস্তশিল্প, কাঁথা, বাটিক, মাটির সামগ্রী কিংবা হাতে তৈরি গয়না কেনারও সুযোগ রয়েছে। আর কোথাও যদি বাউল গানের আসর বসে, তা হলে সেই সন্ধ্যাটি আপনার ভ্রমণের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে উঠতে পারে।

শান্তিনিকেতনের উইকএন্ডে খুব বেশি কিছু করার পরিকল্পনা না করাই ভালো। বরং দু’দিনের মধ্যে নিজের জন্য একটু সময় রাখুন। সকালে হাঁটুন, দুপুরে স্থানীয় রান্নার স্বাদ নিন, বিকেলে হাটে ঘুরুন এবং সন্ধ্যায় প্রকৃতির কাছে বসে থাকুন। শহুরে জীবনে যে নীরবতা আমরা প্রায় ভুলেই গিয়েছি, শান্তিনিকেতন সেই নীরবতাটুকু ফিরিয়ে দিতে পারে। সপ্তাহান্তে পর্যটকের ভিড় বাড়তে পারে, তাই থাকার জায়গা আগে থেকে ঠিক করে নেওয়া ভালো।

এর পরের গন্তব্য বিষ্ণুপুর। বাংলার ইতিহাস, স্থাপত্য আর শিল্পের প্রতি যাঁদের আগ্রহ রয়েছে, তাঁদের জন্য এই শহর যেন খোলা ইতিহাসের বই। মল্লরাজাদের আমলের টেরাকোটা মন্দিরগুলি বিষ্ণুপুরের প্রধান আকর্ষণ। রাসমঞ্চ, জোড়বাংলা মন্দির, মদনমোহন মন্দির কিংবা শ্যামরাই মন্দিরের গায়ে পোড়ামাটির কারুকাজ দেখলে বোঝা যায়, বাংলার শিল্পীরা কত সূক্ষ্মভাবে ইতিহাস ও পুরাণকে মন্দিরের দেওয়ালে ধরে রেখেছিলেন। কৃষ্ণলীলা থেকে যুদ্ধ, শিকার থেকে রাজদরবার—টেরাকোটার ছোট ছোট ফলকে যেন সেই সময়ের সমাজজীবনের ছবি ফুটে উঠেছে।

তবে বিষ্ণুপুরের ভ্রমণ শুধু মন্দির দেখা দিয়ে শেষ করবেন না। এখানকার বালুচরি ও অন্যান্য স্থানীয় তাঁতশিল্পের সঙ্গে পরিচিত হতে পারেন। কারিগরদের কাজ দেখার সুযোগ পেলে আরও ভালো। স্থানীয় মিষ্টির মধ্যে ল্যাংচা অবশ্যই চেখে দেখতে পারেন। এক রাত থেকে দু’দিনের পরিকল্পনায় বিষ্ণুপুর বেশ আরাম করে ঘোরা যায়। ইতিহাসের সঙ্গে যদি প্রকৃতিকেও ভ্রমণের অংশ করতে চান, তা হলে কাছাকাছি জয়পুর অরণ্যকে পরিকল্পনায় যুক্ত করা যায়।

জয়পুর অরণ্যই হতে পারে তৃতীয় গন্তব্য। শহরের কংক্রিটের দেওয়াল থেকে বেরিয়ে যদি সত্যিই সবুজের মধ্যে হারিয়ে যেতে চান, তা হলে বাঁকুড়ার এই জঙ্গলাঞ্চল আপনাকে অন্যরকম অভিজ্ঞতা দেবে। শাল, সেগুন, মহুয়া, পলাশের গাছ আর লাল মাটির পথ জয়পুরের প্রকৃতির নিজস্ব একটি চরিত্র আছে। বর্ষার পরে এবং শরতের শুরুতে জঙ্গলের রং আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ভোরের দিকে পাখির ডাক শোনা, গাছের ছায়ায় হাঁটা কিংবা কোনও নিরিবিলি জায়গায় বসে থাকা এখানে মূল আকর্ষণই হল ধীরে সময় কাটানো।জয়পুরে গেলে প্রকৃতির প্রতি দায়িত্বশীল থাকা জরুরি। জঙ্গলের ভিতরে নিজের ইচ্ছেমতো ঢুকে পড়া, প্লাস্টিক ফেলে আসা কিংবা উচ্চস্বরে গান বাজানো কোনওটাই কাম্য নয়। স্থানীয় গাইড বা অনুমোদিত পর্যটন ব্যবস্থার সাহায্য নিয়ে ঘোরা নিরাপদ। বিষ্ণুপুর ও জয়পুরকে একসঙ্গে নিয়ে দুই দিনের একটি পরিকল্পনাও করা যায়। একদিকে কয়েকশো বছরের স্থাপত্য, অন্যদিকে জঙ্গলের সবুজ একটি ছোট ভ্রমণেই দু’রকম অভিজ্ঞতা পাওয়া সম্ভব।

চতুর্থ গন্তব্য ঝাড়গ্রাম। যাঁরা গ্রামবাংলার সঙ্গে জঙ্গল ও আদিবাসী সংস্কৃতির একটি স্বতন্ত্র মেলবন্ধন দেখতে চান, তাঁদের জন্য ঝাড়গ্রাম আকর্ষণীয়। শহর থেকে কিছুটা দূরে গেলেই বদলে যায় দৃশ্য। লাল মাটির রাস্তা, শালবন, ছোট ছোট গ্রাম, মাটির বাড়ি আর জঙ্গলের সবুজ সব মিলিয়ে এই অঞ্চল শহুরে জীবনের থেকে অনেকটাই আলাদা। ঝাড়গ্রামের আশপাশে বিভিন্ন গ্রাম ও প্রকৃতিনির্ভর জায়গায় হোমস্টেতে থাকার অভিজ্ঞতাও নিতে পারেন।ঝাড়গ্রাম ভ্রমণের অন্যতম আনন্দ হল স্থানীয় জীবনের কাছাকাছি থাকা। কোনও গ্রামের হাটে গেলে স্থানীয় মানুষ কীভাবে নিজেদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনাবেচা করেন, তা দেখা যায়। স্থানীয় খাবারের স্বাদ নেওয়া যায়। তবে মনে রাখতে হবে, গ্রাম কোনও ‘পর্যটন প্রদর্শনী’ নয়। স্থানীয় মানুষের ব্যক্তিগত জীবন ও সংস্কৃতির প্রতি সম্মান রেখেই ঘোরাফেরা করা উচিত। ছবি তোলার আগে অনুমতি নেওয়া এবং স্থানীয় শিল্পীদের কাছ থেকে তাঁদের তৈরি জিনিস কিনে নেওয়া ভ্রমণকে আরও অর্থবহ করে তুলতে পারে।

ঝাড়গ্রামের সঙ্গে চাইলে আমলাশোলের মতো অপেক্ষাকৃত নিরিবিলি অঞ্চলও ভ্রমণসূচিতে রাখা যায়। চারপাশের জঙ্গল, পাহাড়ি-উঁচুনিচু পথ, গ্রামীণ পরিবেশ এবং স্থানীয় জীবনযাত্রা শহরের মানুষের কাছে অন্যরকম অভিজ্ঞতা এনে দেয়। তবে এমন প্রত্যন্ত অঞ্চলে যাওয়ার আগে রাস্তার অবস্থা, থাকার ব্যবস্থা এবং স্থানীয় যাতায়াত সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে নেওয়া প্রয়োজন। শুধু সামাজিক মাধ্যমে কোনও জায়গার ছবি দেখে সেখানে পৌঁছে যাওয়ার পরিকল্পনা না করে বাস্তব পরিস্থিতি জেনে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

পঞ্চম গন্তব্য হিসেবে রাখা যায় পুরুলিয়ার মুরুগুমা। জল, পাহাড়, জঙ্গল আর আকাশ এই চার উপাদান একসঙ্গে দেখতে চাইলে মুরুগুমা দারুণ। জলাধারের পাশে পাহাড়ের রেখা এবং চারপাশের সবুজ প্রকৃতি বিশেষ করে ভোর ও বিকেলে অন্যরকম সুন্দর লাগে। শহরের ব্যস্ততা থেকে দূরে দু’দিন কাটানোর জন্য এখানকার পরিবেশ যথেষ্ট শান্ত। কাছাকাছি অযোধ্যা পাহাড়, বামনি ফলস কিংবা চড়িদা গ্রামের ছৌ মুখোশের শিল্পকে ভ্রমণের অংশ করা যায়।

চড়িদা গ্রামে গেলে ছৌ মুখোশ তৈরির শিল্পীদের সঙ্গে দেখা করার অভিজ্ঞতা আলাদা। কাগজ, মাটি, কাপড় ও রঙের ব্যবহারে তৈরি এই মুখোশগুলি পুরুলিয়ার লোকসংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কারিগরের হাতের কাজ কাছ থেকে দেখলে বোঝা যায়, একটি মুখোশ তৈরি করতে কতটা ধৈর্য ও দক্ষতা প্রয়োজন। বাড়ি ফেরার সময় একটি স্থানীয় হস্তশিল্প কিনে আনলে সেটি যেমন ভ্রমণের স্মৃতি হয়ে থাকবে, তেমনই স্থানীয় শিল্পের প্রতিও আপনার ছোট্ট সমর্থন জানানো হবে।

এই পাঁচটি জায়গার প্রত্যেকটির চরিত্র আলাদা। শান্তিনিকেতন আপনাকে দেবে শিল্প, সাহিত্য, প্রকৃতি ও বাউল সংস্কৃতির স্বাদ। বিষ্ণুপুর নিয়ে যাবে বাংলার ইতিহাস ও টেরাকোটার শিল্পের কাছে। জয়পুর অরণ্য দেবে জঙ্গলের নীরবতা। ঝাড়গ্রাম পরিচয় করাবে জঙ্গলঘেরা গ্রাম ও স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে। আর মুরুগুমা দেখাবে পাহাড়, জল আর লোকশিল্পের এক অপূর্ব সমন্বয়। তাই কোথায় যাবেন, তা ঠিক করার আগে ভেবে নিন আপনি এই উইকএন্ডে আসলে কী খুঁজছেন—ইতিহাস, প্রকৃতি, সংস্কৃতি নাকি নিছক একটু নিরিবিলি সময়।

আর একটি বিষয় মাথায় রাখা জরুরি উইকএন্ড ট্রিপ মানেই যত বেশি সম্ভব জায়গা দেখে ফেলা নয়। দু’দিনের ছুটিতে পাঁচটি জায়গা ছুটে ছুটে দেখার চেয়ে একটি অঞ্চল বেছে নিয়ে ধীরে ঘোরা অনেক বেশি আনন্দের। স্থানীয় খাবার খান, স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলুন, হাটে ঘুরুন, হাতে তৈরি সামগ্রী কিনুন এবং সন্ধ্যার পর একটু আকাশ দেখুন। মোবাইলের ক্যামেরায় মুহূর্ত ধরে রাখার পাশাপাশি কিছু মুহূর্ত ক্যামেরার বাইরেও থাকুক।

পুজোর আগে শহর যখন আলো, বাজার, কেনাকাটা আর প্রস্তুতিতে ধীরে ধীরে ব্যস্ত হয়ে উঠবে, তখন তারই ফাঁকে দু’দিনের জন্য বাংলার মাটির কাছে ফিরে আসা মনকে অনেকটাই হালকা করে দিতে পারে। কারণ ভ্রমণ মানেই সবসময় অনেক দূরে যাওয়া নয়। কখনও কখনও নিজের চারপাশের পরিচিত বাংলাকেই একটু নতুন করে আবিষ্কার করাই সবচেয়ে সুন্দর ভ্রমণ।

Archive

Most Popular