প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
শরতের আকাশে তখনও মেঘের ভেলা। কাশফুলের দোলায় বাংলার মাঠে মাঠে শরৎ এসে পৌঁছেছে, অথচ পুজোর কোলাহল এখনও সর্বত্র শুরু হয়নি। সেই সময়েই বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুরে দেবী আরাধনার প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। ঢাকের শব্দ, পুরনো মন্দিরের গায়ে টেরাকোটার কারুকাজ, রাজপরিবারের স্মৃতি আর শতাব্দী পেরিয়ে আসা নানা আচার—সব মিলিয়ে এখানকার দুর্গাপুজোর আবহ অন্যরকম। কারণ বিষ্ণুপুরে দুর্গাপুজো শুধুমাত্র শরতের কয়েকটি দিনের উৎসব নয়। এই পুজোর সঙ্গে মিশে রয়েছে মল্লরাজাদের ইতিহাস, একটি প্রাচীন জনপদের উত্থান এবং এক দেবীকে ঘিরে গড়ে ওঠা হাজার বছরের বিশ্বাস।
বিষ্ণুপুরকে আজ আমরা মূলত টেরাকোটার মন্দিরের শহর হিসেবে চিনি। রাসমঞ্চ, জোড়বাংলা, শ্যামরায়, মদনমোহন—প্রতিটি স্থাপত্যই মল্লভূমের গৌরবময় অতীতের সাক্ষী। কিন্তু এই শহরের ইতিহাসের আরও গভীরে গেলে দেখা যায়, বিষ্ণুপুরের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে মা মৃন্ময়ীর আরাধনা। বাঁকুড়া জেলা প্রশাসনের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মৃন্ময়ী মন্দির বিষ্ণুপুরের প্রাচীনতম মন্দির এবং রাজা জগৎ মল্ল ৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। স্থানীয় ইতিহাস অনুযায়ী, দেবী দুর্গাই এখানে ‘মা মৃন্ময়ী’ নামে পূজিত হন। মন্দিরটি পরবর্তী সময়ে পুনর্নির্মিত হলেও গঙ্গার মাটি দিয়ে তৈরি মূল দেবীমূর্তির ধারাটি অটুট রয়েছে।
মা মৃন্ময়ীর পুজোর বয়স নিয়ে স্থানীয় ঐতিহ্যে যে দাবি প্রচলিত, তার শিকড় সেই ৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে। সেই হিসেবেই এই পুজোকে বাংলার অন্যতম প্রাচীন, এমনকি বাংলার প্রাচীনতম দুর্গাপুজো হিসেবেও উল্লেখ করা হয়। তবে ‘প্রাচীনতম’ কথাটি মূলত স্থানীয় ঐতিহ্য ও প্রচলিত ইতিহাসের দাবির ভিত্তিতে ব্যবহৃত—এই পার্থক্যটি মনে রাখা জরুরি। সরকারি বাঁকুড়া জেলা প্রশাসনের পর্যটন-তথ্যেও মৃন্ময়ী পুজোকে ‘বাংলার প্রাচীনতম দুর্গাপুজো’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই পুজোর শুরু নিয়েও রয়েছে এক আশ্চর্য কিংবদন্তি। কথিত আছে, মল্লরাজা জগৎ মল্ল একদিন শিকারে বেরিয়ে ঘন অরণ্যের মধ্যে প্রবেশ করেছিলেন। জঙ্গলের গভীরে গিয়ে তিনি পথ হারিয়ে ফেলেন এবং ক্লান্ত হয়ে একটি গাছের নীচে আশ্রয় নেন। এরপর তাঁর সামনে ঘটে একের পর এক অলৌকিক ঘটনা। স্থানীয় কাহিনির একটি প্রচলিত সংস্করণে বলা হয়, রাজা একটি হরিণকে অনুসরণ করতে গিয়ে এমন এক জায়গায় পৌঁছেছিলেন যেখানে তাঁর বাজপাখিকে একটি পাখি পরাস্ত করে। পরে তিনি এক দৈব নারীমূর্তির দর্শন পান। সেই দেবী নিজেকে মৃন্ময়ী বলে পরিচয় দেন এবং রাজাকে নির্দেশ দেন ওই স্থানেই তাঁর মন্দির প্রতিষ্ঠা করতে। তাঁকে ঘিরেই নতুন রাজধানী স্থাপনের নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল বলে লোককথায় প্রচলিত।
কিংবদন্তির সঙ্গে ইতিহাসের রেখা এখানে মিলেমিশে যায়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মল্লরাজাদের দশম রাজা জগৎ মল্ল তাঁদের রাজ্য বিষ্ণুপুরে স্থানান্তর করেছিলেন। স্থানীয় কাহিনি বলে, দেবীর দৈব নির্দেশের পরই ঘন জঙ্গলে ঘেরা এই অঞ্চলকে রাজধানী হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। অর্থাৎ মৃন্ময়ী মায়ের মন্দির শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, বিষ্ণুপুর নগরের ইতিহাসের সঙ্গেও তার জন্মলগ্ন থেকেই একটি সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। ‘মৃন্ময়ী’ নামটির মধ্যেও রয়েছে বিশেষ তাৎপর্য। মৃন্ময়ী অর্থ মাটি দিয়ে নির্মিত। এই দেবীমূর্তির সঙ্গে গঙ্গার মাটির সম্পর্কের কথা স্থানীয় ঐতিহ্যে রয়েছে। মন্দির পুনর্নির্মিত হলেও দেবীর মূল মূর্তির ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে বলে বাঁকুড়া জেলা প্রশাসনের পর্যটন-তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। এই দিক থেকে মৃন্ময়ী মায়ের পুজো আজকের প্রচলিত বারোয়ারি বা বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোর থেকে অনেকটাই আলাদা। সাধারণ দুর্গাপুজোয় যেখানে প্রতি বছর নতুন প্রতিমা তৈরি হয় এবং দশমীতে বিসর্জন দেওয়া হয়, সেখানে মৃন্ময়ী মা স্থায়ীভাবে মন্দিরে অধিষ্ঠিত।এই পুজোর সময়কালও বিস্ময়কর। আজকের শহুরে দুর্গাপুজো মূলত ষষ্ঠী থেকে দশমীকে ঘিরে আবর্তিত হলেও বিষ্ণুপুরের মৃন্ময়ী পুজোর আচারপরম্পরা অনেক দীর্ঘ। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এই পুজোকে ১৮ দিনের উৎসব হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। আবার পুজোর প্রস্তুতিও প্রচলিত দুর্গাপুজোর কয়েক দিন আগে শুরু হয়। প্রাচীন নিয়ম মেনে দুর্গাপুজোর প্রায় পনেরো দিন আগে থেকেই নবম্যাদি কল্পারম্ভের মাধ্যমে মৃন্ময়ীর পুজো শুরু হয়। এই দীর্ঘ আচারপরম্পরার শুরুতেই রয়েছে তিন বিশেষ রূপ—বড় ঠাকুরানি, মেজো ঠাকুরানি এবং ছোট ঠাকুরানি। মৃন্ময়ী মায়ের পাশাপাশি এই তিন রূপেরও আরাধনা করা হয়। স্থানীয় পুজোর ঐতিহ্যে তাঁদের আবাহন, স্নান, বেলবরণ এবং বিভিন্ন আচার নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে সম্পন্ন হয়। তিন ঠাকুরানির পটচিত্রেরও রয়েছে আলাদা ঐতিহ্য। তিনটি পটের মূল রূপ একই হলেও তাঁদের শাড়ির রঙে পার্থক্য থাকে। এই পটচিত্র তৈরির সঙ্গে বিষ্ণুপুরের ফৌজদার পরিবারের দীর্ঘ সম্পর্ক রয়েছে। মৃন্ময়ী পুজোর সঙ্গে পটচিত্রের এই সম্পর্ক বিষ্ণুপুরের শিল্পসংস্কৃতির আর একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ২০২৫ সালের একটি আনন্দবাজার প্রতিবেদনে ফৌজদার পরিবারের পটচিত্র আঁকার ঐতিহ্য এবং মৃন্ময়ীর পটের সঙ্গে তাঁদের দীর্ঘ সম্পর্কের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, মল্লরাজাদের আমল থেকেই এই পরিবারের হাতে মৃন্ময়ীর পট আঁকার দায়িত্ব ছিল। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সেই শিল্পচর্চা চলে এসেছে।
মৃন্ময়ী পুজোর অন্যতম আকর্ষণ মহাষ্টমীর সন্ধিপুজো। এই বিশেষ মুহূর্তে কামান দাগার প্রথা আজও মানুষের কৌতূহলের অন্যতম কারণ। বাঁকুড়া জেলা প্রশাসনের সরকারি পর্যটন-তথ্যেও মহাষ্টমী-সন্ধিপুজোর সময় কামান নিক্ষেপের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সংবাদসূত্রে এই কামান ব্যবহারের ঐতিহ্যকে মল্লরাজা ধাড়ি মল্লের সময়, অর্থাৎ ষোড়শ শতকের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
ভাবা যায়, কয়েক শতাব্দী আগে রাজপ্রাসাদ ও মন্দিরঘেরা মল্লভূমের আকাশে যখন কামানের শব্দ প্রতিধ্বনিত হত, তখন সেটি শুধু পুজোর মুহূর্তের ঘোষণা ছিল না; রাজশক্তিরও এক প্রতীক ছিল। আজ সেই রাজশক্তি নেই। কিন্তু কামানের আওয়াজটি রয়ে গিয়েছে ঐতিহ্যের অংশ হয়ে। সেই শব্দ যেন অতীত আর বর্তমানের মধ্যে একটি অদৃশ্য সেতু তৈরি করে। এই পুজোর আর একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হল দেবীর মূল প্রতিমার বিসর্জন হয় না। বিজয়া দশমীর দিন পটচিত্রের দুর্গাকে বিসর্জন দেওয়া হলেও মৃন্ময়ী মায়ের মূল প্রতিমা মন্দিরেই থেকে যান। ফলে দেবীর সঙ্গে মানুষের সম্পর্কটি পাঁচ দিনের উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তিনি সারা বছরই সেখানে অধিষ্ঠিত।
মৃন্ময়ী পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও একটি বিশেষ লোকাচার। কিছু পুজোর মন্ত্রোচ্চারণের সময় পুরোহিত দেবীর দিকে পিঠ দিয়ে বসে পুজো করেন বলে ঐতিহ্যে উল্লেখ রয়েছে। এই প্রথার সঙ্গে স্থানীয় বিশ্বাস ও নানা কিংবদন্তিও জড়িয়ে আছে। এ ধরনের রীতিই দেখিয়ে দেয়, বিষ্ণুপুরের পুজো কেবল শাস্ত্রীয় বিধানের ধারাবাহিকতা নয়; এর মধ্যে স্থানীয় লোকবিশ্বাসেরও গভীর প্রভাব রয়েছে।
দশমীর সঙ্গে এই পুজোর সবকিছু শেষ হয়ে যায় না। বিজয়া দশমী থেকে দ্বাদশী পর্যন্ত বিষ্ণুপুরে রাবণকাটা পুজোরও আয়োজন হয়। রামায়ণের চরিত্রগুলিকে কেন্দ্র করে মুখোশ পরে নৃত্য, অভিনয় ও নানা আচার পালিত হয়। দশমীতে কুম্ভকর্ণ বধ, একাদশীতে ইন্দ্রজিৎ বধ এবং দ্বাদশীর রাতে রাবণ বধের মাধ্যমে এই পর্বের সমাপ্তি ঘটে বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। ফলে মৃন্ময়ী পুজোকে ঘিরে উৎসবের পরিসর আরও বিস্তৃত হয়ে ওঠে।
রাজপরিবারের পৃষ্ঠপোষকতায় শুরু হওয়া এই পুজো সময়ের সঙ্গে অনেক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গিয়েছে। মল্লরাজাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা ক্রমে কমেছে। ব্রিটিশ আমলে রাজপরিবারের আর্থিক অবস্থাতেও পরিবর্তন আসে। একসময় যে রাজপরিবারের কেন্দ্র ঘিরে এই পুজোর আয়োজন হত, সেই পরিবার পরবর্তীকালে নানা জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। তবু পুজো থেমে যায়নি। পুরনো আচারগুলির অনেকটাই এখনও পালন করা হয়।
এখানেই মৃন্ময়ী পুজোর সবচেয়ে বড় শক্তি। রাজা চলে গিয়েছেন, রাজত্বের অবসান হয়েছে, সময় বদলেছে, কিন্তু দেবী থেকে গিয়েছেন মানুষের মধ্যে। রাজপরিবারের ব্যক্তিগত পুজো ধীরে ধীরে জনসমাজের ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। আজ বিষ্ণুপুরে মৃন্ময়ী পুজো দেখতে গেলে শুধু রাজবাড়ির ইতিহাস নয়, গোটা শহরের সাংস্কৃতিক স্মৃতির সঙ্গে পরিচয় ঘটে।
বিষ্ণুপুরের এই পুজো দেখতে গেলে তাই শুধু মন্দিরে গিয়ে ফিরে আসা উচিত নয়। মৃন্ময়ী মন্দিরের পাশাপাশি শহরের টেরাকোটা স্থাপত্যগুলিও ঘুরে দেখা যায়। রাসমঞ্চ, জোড়বাংলা মন্দির, শ্যামরায় মন্দির, মদনমোহন মন্দির—প্রতিটি স্থাপত্য মল্লভূমের ইতিহাসের আলাদা অধ্যায় বহন করে। বাঁকুড়া জেলা প্রশাসনের পর্যটন তথ্যেও বিষ্ণুপুরের এই ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কলকাতা থেকে বিষ্ণুপুর যাওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায়গুলির একটি হল ট্রেন। হাওড়া থেকে বিষ্ণুপুরগামী একাধিক ট্রেন রয়েছে এবং দক্ষিণ-পূর্ব রেলের পথে সরাসরি বিষ্ণুপুর স্টেশনে পৌঁছনো যায়। পুজোর সময়ে ট্রেনের সময়সূচি ও পরিষেবায় পরিবর্তন হতে পারে, তাই যাত্রার দিন রেলওয়ের বর্তমান সময়সূচি দেখে নেওয়াই নিরাপদ। বিষ্ণুপুর স্টেশন থেকে মৃন্ময়ী মন্দির ও ঐতিহাসিক মন্দিরাঞ্চলে স্থানীয় টোটো, অটো বা গাড়িতে যাওয়া যায়। সড়কপথেও কলকাতা থেকে বিষ্ণুপুর যাওয়া যায়। গাড়িতে গেলে কলকাতা থেকে আরামবাগ হয়ে বিষ্ণুপুরের দিকে যাওয়া একটি প্রচলিত পথ। আবার বর্ধমান, দুর্গাপুর ও বাঁকুড়া হয়ে বিষ্ণুপুর পৌঁছনোর পথও নেওয়া যায়। পুজোর সময়ে যানজট, রাস্তার অবস্থা এবং যাত্রাপথের পরিস্থিতির উপর সময় নির্ভর করবে। তাই যাঁরা একই দিনে ঘুরে ফিরে আসতে চান, তাঁদের ভোরে রওনা হওয়া সুবিধাজনক। আর যাঁরা বিষ্ণুপুরের ইতিহাস একটু ধীরে অনুভব করতে চান, তাঁদের অন্তত এক রাত থাকার পরিকল্পনা করলে শহরের মন্দির ও পুজোর আবহ ভালোভাবে দেখা সম্ভব। কলকাতার কোন প্রান্ত থেকে যাত্রা শুরু হচ্ছে তার উপর নির্ভর করে হাওড়া পৌঁছনোর জন্য মেট্রো, বাস, ট্রেন বা গাড়ি ব্যবহার করা যায়।
তবে মৃন্ময়ী মায়ের পুজো দেখতে গেলে যাত্রার পরিকল্পনা করার সময় একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। এটি সাধারণ পুজোমণ্ডপ দর্শনের মতো নয়। নির্দিষ্ট আচার ও পুজোর সময়ের সঙ্গে দর্শনের অভিজ্ঞতাও বদলে যায়। তাই শুধু মহাষষ্ঠী বা অষ্টমীর দিন গিয়ে মন্দির দেখে ফিরে না এসে, পুজোর বিশেষ আচারগুলির সময়সূচি আগে থেকে জেনে গেলে অভিজ্ঞতা অনেক বেশি সমৃদ্ধ হবে। আজকের বিষ্ণুপুরে দাঁড়িয়ে যখন মৃন্ময়ী মায়ের মন্দিরের দিকে তাকানো যায়, তখন ইতিহাস যেন একসঙ্গে কয়েকটি সময়কে সামনে এনে দাঁড় করায়। একদিকে মল্লরাজা জগৎ মল্লের সেই কিংবদন্তি, অন্যদিকে টেরাকোটার মন্দির গড়ে ওঠার যুগ, তার পরে ঔপনিবেশিক সময়, রাজপরিবারের পরিবর্তন এবং শেষে আধুনিক পর্যটননির্ভর বিষ্ণুপুর। এত পরিবর্তনের মধ্যেও একটি জায়গা একই রয়ে গেছে—মৃন্ময়ী মায়ের আসন। শরতের কাশফুল, ঢাকের শব্দ আর নতুন জামাকাপড়ের ভিড়ে দুর্গাপুজোকে আমরা সাধারণত আনন্দের উৎসব হিসেবেই দেখি। বিষ্ণুপুর সেই আনন্দের সঙ্গে যোগ করে ইতিহাসের গভীরতা। এখানে পুজো মানে শুধু দেবীকে দেখতে যাওয়া নয়, বরং এমন একটি ঐতিহ্যের সামনে দাঁড়ানো, যার শুরু নিয়ে কথা বলতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হয় এক হাজার বছরেরও বেশি আগে।
তাই এই শরতে বিষ্ণুপুর গেলে টেরাকোটার মন্দিরের গায়ে চোখ রাখো, পুরনো রাজবাড়ির স্মৃতি খুঁজে দেখো, আর সময় পেলে মৃন্ময়ী মায়ের মন্দিরের সামনে একটু দাঁড়াও। হয়তো চারপাশে তখন ভিড় থাকবে, ক্যামেরার ঝলকানি থাকবে, পর্যটকদের ব্যস্ততা থাকবে। তবু সেই কোলাহলের মধ্যেও অনুভব করা যায়—এই মন্দিরের ভিতরে যে দেবী অধিষ্ঠিত, তাঁর পুজো দেখেছে মল্লরাজাদের উত্থান, রাজশক্তির পতন, ঔপনিবেশিক শাসন, স্বাধীনতা এবং আধুনিক বাংলার জন্ম। হাজার বছরের বেশি সময় ধরে তাই শরৎ এলেই বিষ্ণুপুরে ফিরে আসে সেই পুরনো ডাক। দেবীর নাম মৃন্ময়ী। তাঁর মূর্তি মাটির, কিন্তু তাঁকে ঘিরে মানুষের বিশ্বাসের বয়স মাটির চেয়েও গভীর। রাজা নেই, রাজত্ব নেই, সেই পুরনো সময়ও নেই—তবু মৃন্ময়ী মা আছেন। আর তাঁর পুজোর মধ্যেই আজও বেঁচে আছে মল্লভূমের এক দীর্ঘ, অনন্ত শরৎকথা।
তথ্যসূত্র ঋনস্বীকার:
বাঁকুড়া জেলা প্রশাসন, পশ্চিমবঙ্গ সরকার—Culture and Heritage.
আনন্দবাজার অনলাইন
The Telegraph, “Royal rituals”.