19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

সম্পর্কে ব্রেক জরুরি!

প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিনিধি


গাড়ি যেমন চলতে চলতে কখনও কখনও ব্রেক চায়, তেমনই আমাদের জীবনেরও দরকার পড়ে ‘ব্রেক’-এর। দিনভর দৌড়ঝাঁপ, কাজের চাপ, সম্পর্কের জট, প্রযুক্তির ব্যস্ততা এইসবের ভিড়ে আমরা ভুলে যাই, থেমে যাওয়া মানে পিছিয়ে পড়া নয়, বরং নিজের গতি নিয়ন্ত্রণের এক মহৎ কৌশল। “সম্পর্কে ব্রেক জরুরি” এই তিনটি শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক গভীর জীবনবোধ: কখন থামতে হবে, সেটাই জানা সবচেয়ে বড় বুদ্ধি। অনেকেই মনে করেন বিশ্রাম নেওয়া মানে আলস্য। কিন্তু আসলে এটি শরীর ও মনের এক প্রাকৃতিক চাহিদা। যেমন অতিরিক্ত গতি গাড়িকে দুর্ঘটনার দিকে ঠেলে দেয়, তেমনি অতিরিক্ত কাজ, দুশ্চিন্তা, বা মানসিক চাপ মানুষকে ক্লান্ত ও নিস্তেজ করে তোলে। জীবনের যাত্রায় ‘ব্রেক’ মানে থেমে যাওয়া নয় এটি নিজেকে পুনর্গঠনের সুযোগ। এটি সেই মুহূর্ত, যখন আমরা নিজের সঙ্গে কথা বলি, নতুনভাবে চিন্তা করি, এবং সামনের পথের দিকনির্দেশনা ঠিক করি।


শরীরের জন্য ‘ব্রেক’ কেন জরুরি

১. অতিরিক্ত চাপের বিপদ

আধুনিক কর্মজীবনে একটানা কাজ করা, কম ঘুম, অনিয়মিত খাবার এই সবই শরীরের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, আর ফলশ্রুতিতে দেখা দেয় ক্লান্তি, মাথাব্যথা, ও অবসাদ।

২. ঘুমই শরীরের ব্রেক

যেভাবে যন্ত্র ঠান্ডা না হলে পুড়ে যায়, তেমনি মানুষ ঘুম না পেলে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। ৬-৮ ঘণ্টার গভীর ঘুম শরীরের পুনর্গঠন করে, মস্তিষ্ককে রিফ্রেশ করে, ও মনকে প্রশান্ত রাখে।

৩. সঠিক খাদ্য ও বিশ্রাম

শরীরের ব্রেক মানে শুধু ঘুম নয়, সঠিক খাবার, পর্যাপ্ত জল, আর মাঝেমধ্যে রিল্যাক্সেশন থেরাপি। শরীর আমাদের যানবাহনের মতো যত্ন না নিলে পথের মাঝেই থেমে যাবে।


মনের জন্য ব্রেক কেন প্রয়োজন

মানসিক চাপই আজকের যুগের মহামারি। অফিসের ডেডলাইন, সম্পর্কের চাপ, সোশ্যাল মিডিয়ার তুলনা সব মিলিয়ে মন যেন সবসময় এক দৌড়ে।

১. তথ্যের অতিপ্রবাহ

প্রতিদিন আমরা শত শত তথ্য, নিউজ, পোস্ট, রিল—সব কিছুই গ্রহণ করি। এই তথ্যভার আমাদের মনকে ক্লান্ত করে তোলে। মাঝে মাঝে নিজের জন্য "ডিজিটাল ব্রেক" নেওয়া মানসিকভাবে প্রয়োজনীয়।

২. আত্মচিন্তার সময়

থেমে না গেলে চিন্তা সম্ভব নয়। প্রতিদিন অন্তত কিছুক্ষণ নিজের সঙ্গে একান্তে থাকা, কোনও স্ক্রিন ছাড়া এটাই আসল ‘মাইন্ডফুল ব্রেক’। এখানেই তৈরি হয় সৃজনশীলতা ও মানসিক স্বস্তি।

৩. আবেগের রিসেট

রাগ, হতাশা, বা দুঃখ জমে গেলে মন ভারী হয়ে যায়। তখন একটি ছোট ভ্রমণ, প্রিয় গান, বা এক কাপ চা এগুলোই হতে পারে মনো-ব্রেক। এতে আবেগ নতুনভাবে প্রবাহিত হয়।


সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ব্রেক প্রয়োজন

মানুষের সম্পর্কও একরকম চলন্ত গাড়ি। সব সময় মসৃণ নয় কখনও উত্থান, কখনও পতন। কখনও কখনও অযথা তর্ক, ভুল বোঝাবুঝি, বা ক্লান্তির কারণে সম্পর্কের গতি হারিয়ে যায়।

১. ‘স্পেস’ দেওয়ার গুরুত্ব

প্রেম, বন্ধুত্ব বা পারিবারিক সম্পর্কে ‘ব্রেক’ মানে বিচ্ছেদ নয়, বরং একে অপরকে একটু স্পেস দেওয়া। এতে সম্পর্ক আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও পরিণত হয়।

২. যোগাযোগের ভারসাম্য

সবসময় একে অপরকে বোঝাতে গিয়ে অনেক সময় ক্লান্তি আসে। তাই কিছুটা নীরবতাও দরকার, যা সম্পর্কের মধ্যে নতুন বাতাস আনে।

৩. নতুন করে শুরু

কখনও সম্পর্কের মধ্যে সাময়িক দূরত্বই প্রমাণ করে ভালোবাসার গভীরতা। এই বিরতিই সম্পর্ককে নতুনভাবে বুঝতে সাহায্য করে।


কাজের জগতে ব্রেকের গুরুত্ব

১. ‘বার্নআউট’ সিন্ড্রোম

কর্মক্ষেত্রে একটানা কাজ, প্রতিযোগিতা, টার্গেট—সব মিলিয়ে মানুষ এক সময় মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। এটি ‘বার্নআউট’। এর লক্ষণ—অবসাদ, অনুপ্রেরণার অভাব, অস্থিরতা।

২. ক্ষুদ্র বিরতি, বড় উপকার

কাজের মাঝে ১০ মিনিটের বিরতি মনোযোগ বাড়ায়। অফিসের ব্যালকনিতে দাঁড়ানো, চা খাওয়া, বা চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নেওয়া—এগুলো ক্ষুদ্র হলেও অত্যন্ত ফলপ্রসূ।

৩. ছুটি নেওয়া অপরাধ নয়

অনেকেই মনে করেন ছুটি মানে অলসতা। কিন্তু সত্যি হলো, বিশ্রামই উৎপাদনশীলতার উৎস। ভ্রমণ বা অফ-ডে মানুষকে নতুন এনার্জি দেয়, যা কাজে আরও দক্ষ করে তোলে।


প্রকৃতির কাছ থেকে শেখা ‘ব্রেক’-এর পাঠ

প্রকৃতি নিজেই জানে কখন বিশ্রাম নিতে হয়। শীতকালে গাছের পাতা ঝরে যায়, নদী শুকিয়ে আসে, প্রাণীরা শীতনিদ্রায় যায়। তারা জানে, বিশ্রাম মানেই নতুন সূচনার প্রস্তুতি। মানুষও যদি এই নিয়ম অনুসরণ করে, তবে তার জীবনও হবে ভারসাম্যপূর্ণ। প্রতিটি ঋতুর মতো আমাদের জীবনেও দরকার বিরতি, যাতে আবার ফুল ফোটে, আলো জ্বলে।


কবে বুঝব, ব্রেক জরুরি

১. যখন ঘুমে প্রশান্তি মেলে না

আপনি যদি রাতে ঘুমিয়েও সকালে ক্লান্ত বোধ করেন, বুঝবেন শরীর বিশ্রাম চায়।

২. যখন ছোট বিষয়েও রাগ উঠে যায়

এটি মানসিক ক্লান্তির চিহ্ন। আপনার মস্তিষ্ক অতিরিক্ত চাপ বহন করছে।

৩. যখন কাজ আনন্দ নয়, বোঝা মনে হয়

এই সময়েই দরকার সাময়িক বিরতি—নিজেকে পুনরায় উদ্দীপিত করার জন্য।

৪. যখন মন শুনতে চায় না

নিজের অনুভূতিকে যদি দমন করে রাখেন, একসময় তা বিস্ফোরিত হয়। তাই থেমে মনকে কথা বলতে দিন।


কীভাবে নেবেন জীবনের ‘ব্রেক’

১. সকালে কিছু সময় নিজের জন্য রাখুন

সকালে ১০ মিনিটের মেডিটেশন বা হাঁটা দিনটিকে ইতিবাচক করে তুলবে।

২. ডিজিটাল ডিটক্স

প্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টা মোবাইল, টিভি, বা ইন্টারনেট থেকে দূরে থাকুন। মন যেন আবার শান্ত হয়।

৩. প্রকৃতির সান্নিধ্যে যান

পার্কে বসা, নদীর ধারে হাঁটা বা ছুটির দিনে পাহাড়ে যাওয়া এই ছোট্ট পরিবর্তনই মনকে রিফ্রেশ করে।

৪. নিজের পছন্দের কাজ করুন

গান শোনা, আঁকা, রান্না, বা পড়া যা ভালো লাগে, তাই করুন। এটি আত্মার বিশ্রাম।

৫. নির্জনে কিছুক্ষণ

চুপচাপ বসে থাকা বা ডায়েরি লেখা আপনাকে নিজের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সাহায্য করবে।


জীবনের ‘রিসেট বোতাম’

ব্রেক মানেই ‘রিসেট’। এটি এক ধরণের আত্মসমালোচনা ও পুনর্জাগরণ। জীবনে ব্রেক না নিলে আমরা মেশিনে পরিণত হই। কিন্তু যখন থেমে নিজের ভেতর তাকাই, তখনই শুরু হয় নতুন যাত্রা একটি সচেতন, সজীব, ও সুস্থ জীবন।


বাস্তব উদাহরণ

১. কাজের চাপ থেকে পালানো নয়, পুনরুজ্জীবন:
একজন কর্পোরেট কর্মী প্রতিদিন ১২ ঘণ্টা কাজ করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। এক মাসের ‘সাব্বাটিকাল লিভ’ নিয়ে তিনি ভ্রমণে যান। ফিরে এসে তিনি শুধু কর্মক্ষমই হননি, বরং নতুন প্রজেক্টে সৃজনশীল আইডিয়া দিয়েছেন।

২. একজন মা’র গল্প:
দৈনন্দিন সংসার, সন্তান, রান্না সব মিলিয়ে নিজের জন্য এক মুহূর্তও সময় পাচ্ছিলেন না। প্রতিদিনের ক্লান্তি থেকে তিনি প্রতি রবিবার আধঘণ্টা একা পার্কে বসা শুরু করলেন। সেই সামান্য সময়েই ফিরে পেলেন আত্মবিশ্বাস ও মানসিক প্রশান্তি। ভারতীয় দর্শনে বলা হয়েছে, “প্রতিনিয়ত ক্রিয়া নয়, বিরতিই ধ্যানের জন্ম দেয়।” অর্থাৎ, থেমে যাওয়াই চিন্তার জন্ম দেয়। বুদ্ধদেবও বলেছেন, “Silence is not empty, it is full of answers.” এই নীরব বিরতিতেই মানুষ নিজের অন্তর্গত সত্তাকে চিনতে পারে।

জীবন এক অন্তহীন পথচলা। গন্তব্যে পৌঁছনোর তাড়ায় আমরা প্রায়ই ভুলে যাই, রাস্তার সৌন্দর্যও উপভোগ করতে হয়। কখনও কখনও থেমে যাওয়া মানে নিজেকে পুনরায় গুছিয়ে নেওয়া। তাই মনে রাখুন ব্রেক জরুরি। শুধু গাড়ির জন্য নয়, আমাদের মন, শরীর ও আত্মার জন্যও। কারণ, থেমে যাওয়া মানেই শেষ নয়, বরং নতুন সূচনার পূর্বাভাস। যেমন সূর্য প্রতিদিন অস্ত যায়, আবার ওঠে নতুন আলো নিয়ে তেমনি জীবনের প্রতিটি ব্রেকই পরের গিয়ার বদলানোর আগে এক প্রয়োজনীয় বিরতি।

Archive

Most Popular