প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
বর্ধমান রাজবাড়ির দুর্গাপুজোর গল্প শুরু হয় এমন এক দেবীমূর্তিকে ঘিরে, যাঁকে দেখতে মৃৎশিল্পীর হাতে গড়া দশভুজা প্রতিমার সামনে দাঁড়াতে হয় না। এখানে দেবী আসেন পটে। শালকাঠের কাঠামোর উপর আঁকা একচালা পটচিত্রেই পূজিতা হন দশভুজা। তাই তিনি ‘পটেশ্বরী’—বর্ধমান রাজপরিবারের দুর্গাপুজোর এমন এক পরিচয়, যা বাংলার বনেদি বাড়ির পুজোর দীর্ঘ ইতিহাসে একেবারেই স্বতন্ত্র।
বর্ধমান রাজবাড়ির এই পুজোকে ঘিরে প্রচলিত ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রায় সাড়ে তিনশো বছরের স্মৃতি। তবে পুজোর সূচনাকাল নিয়ে বিভিন্ন প্রকাশিত সূত্রে কিছু মতভেদ রয়েছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে প্রায় ৩৫০ বছরের ঐতিহ্যের কথা বলা হয়েছে এবং রাজপরিবারের মহারাজ মেহতাব চাঁদের স্বপ্নাদেশের সঙ্গে পটেশ্বরীর পুজোর সূচনাকে যুক্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে ইতিহাসভিত্তিক গবেষণায় রাজা তেজচাঁদের সময় থেকেই পটদুর্গার প্রচলনের উল্লেখ রয়েছে এবং পরে প্রণয়চন্দ মহতাব নতুন করে পট আঁকিয়ে পুজোর ধারাকে এগিয়ে দেন। ফলে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, বর্ধমান রাজপরিবারে পটে দুর্গার আরাধনা বহু প্রজন্মের পুরনো এবং বর্তমান পটের সঙ্গে অন্তত দুই শতাব্দীর ধারাবাহিকতার যোগ রয়েছে।
এই পুজোর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্যই হল—দেবীর মৃন্ময়ী প্রতিমা বিসর্জনের জন্য তৈরি হয় না। পটই এখানে দেবীর আধার। ফলে যেখানে বাংলার অন্যত্র মহালয়ার পর থেকে প্রতিমা গড়ার ব্যস্ততা শুরু হয়, সেখানে বর্ধমান রাজবাড়ির পুজোর প্রস্তুতির কেন্দ্রে থাকে সেই পুরনো পট। দেবীর রূপ আঁকা থাকে শালকাঠের কাঠামোর উপর। একচালা বিন্যাসে দশভুজা দুর্গার সঙ্গে আঁকা থাকে তাঁর সন্তানদেরও।
এই পটেশ্বরীর রূপও সাধারণ দুর্গামূর্তির থেকে আলাদা। দেবীর অবয়ব দীর্ঘ, সরু এবং রেখায় বেশ তীক্ষ্ণ। লক্ষ্মী, সরস্বতী ও কার্তিকের মুখেও রয়েছে বিশেষ বৈশিষ্ট্য—গণেশ ছাড়া অন্যদের মুখ এমনভাবে আঁকা, যাতে একটি চোখই দৃশ্যমান। আর দেবীর বাহন সিংহের চেহারাতেও রয়েছে বিস্ময়। তার মুখে ঘোড়ার আদল। এই অদ্ভুত অথচ ঐতিহ্যবাহী রূপটিই বছরের পর বছর ধরে বর্ধমানের পটেশ্বরীকে আলাদা পরিচয় দিয়েছে।
পটের দেবীর এই রূপ একবার আঁকা হয়ে গেলেই প্রতি বছর নতুন করে বদলে যায় না। এটাই এই পুজোর আর একটি বিস্ময়। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, একই পটচিত্রে প্রায় দুই শতাব্দী ধরে পুজো হয়ে আসছে। অতীতে প্রতি বছর পটে রংয়ের সংস্কার করা হলেও পরবর্তীকালে সেই নিয়ম বদলে এখন প্রায় ১২ বছর অন্তর পটের রং সংস্কার করা হয়। আশ্চর্যের বিষয়, সংস্কারের পরেও দেবীর মূল রূপে কোনও পরিবর্তন আনা হয় না।
অর্থাৎ, সময় বদলেছে, রাজপরিবারের জীবনযাত্রা বদলেছে, রাজকীয় ক্ষমতা হারিয়ে গিয়েছে, কিন্তু পটেশ্বরীর মুখ বদলায়নি। এই একই রূপের মধ্যে দিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাঁদের পূর্বপুরুষদের পুজোকে চিনে এসেছে। নতুন করে তৈরি হওয়া প্রতিমার বদলে একটি পুরনো পটকে ঘিরে এই ধারাবাহিকতা তাই শুধু ধর্মীয় আচার নয়, পারিবারিক স্মৃতিরও এক অনন্য সংরক্ষণ।
প্রতিপদের ঘটস্থাপনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় পুজোর পর্ব। পুজো চলে দশ দিন ধরে। রাজবাড়ির পুরনো রীতি অনুযায়ী নবরাত্রির আবহও এই উৎসবের সঙ্গে মিশে আছে। বর্ধমানের গুজরাটি সমাজের সঙ্গে রাজবাড়ির পুজোর সম্পর্কেরও দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। অতীতে নবরাত্রির নয় দিন সন্ধ্যায় রাজবাড়ির প্রাঙ্গণে ডান্ডিয়া নৃত্যের আয়োজন করা হত। বাংলার দুর্গাপুজোর সঙ্গে গুজরাটি নবরাত্রির এই সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন বর্ধমানের পুজোকে আরও স্বতন্ত্র করে তুলেছে।
একসময় অবশ্য এই পুজোর জৌলুস ছিল আরও অনেক বেশি। রাজ আমলে রাজবাড়ির পুজোকে কেন্দ্র করে জমে উঠত বিশাল আয়োজন। ঝাড়বাতির আলোয় আলোকিত হত রাজবাড়ি। পুজোর দিনগুলিতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, যাত্রাপালা এবং নানা আয়োজন চলত। দামোদর নদীর ওপার থেকেও মানুষ গরুর গাড়িতে, পায়ে হেঁটে আসতেন রাজবাড়ির পুজো দেখতে। রাজপরিবারের ক্ষমতা ও ঐশ্বর্যের সঙ্গে দুর্গোৎসবের সেই আয়োজনও হয়ে উঠেছিল এক বৃহৎ সামাজিক অনুষ্ঠান।
আজ সেই রাজকীয় জাঁকজমকের অনেকটাই অতীত। কিন্তু পুজোর মূল রীতিগুলি এখনও ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়। এটাই সম্ভবত বর্ধমান রাজবাড়ির পুজোর সবচেয়ে বড় শক্তি—আয়োজন বদলেছে, কিন্তু দেবীর পরিচয় বদলায়নি।
পুজোর নির্দিষ্ট আচারেও রয়েছে নিজস্বতা। নবমীর দিন পটেশ্বরীর সামনে নবকুমারী পুজো অনুষ্ঠিত হয়। দশভুজার সামনে কুমারীকে দেবীর প্রতীক হিসেবে আরাধনা করার এই প্রথা বাংলার শক্তিসাধনার বৃহত্তর পরম্পরার সঙ্গে যুক্ত। রাজপরিবারের নিজস্ব নিয়ম মেনেই আজও এই আচার পালিত হয়।পুজোর ভোগেও বর্ধমান রাজবাড়ির ইতিহাসের একটি আলাদা ছাপ রয়েছে। বাংলার বহু বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোয় যেখানে খিচুড়ি প্রধান ভোগ হিসেবে পরিচিত, সেখানে পটেশ্বরীর ভোগে রয়েছে ছোলা, পুরি ও হালুয়া। এই খাবারের বিন্যাসের সঙ্গে রাজপরিবারের পাঞ্জাবি-খত্রি শিকড়ের সম্পর্কের কথাও ঐতিহাসিক গবেষণায় উঠে এসেছে। অর্থাৎ দেবীর ভোগের থালাতেও যেন বর্ধমানের মাটিতে এসে মিশে যাওয়া বহুসাংস্কৃতিক ইতিহাসের একটি চিহ্ন রয়ে গেছে।এই ভোগের স্বাদে তাই শুধু রান্নাঘরের ঐতিহ্য নেই, আছে ইতিহাসের যাত্রাপথ। পাঞ্জাব থেকে আসা এক পরিবার বাংলায় বসতি গড়ে ধীরে ধীরে বাঙালি সমাজের সঙ্গে একাত্ম হয়েছে। তাঁদের উত্তর ভারতীয় উত্তরাধিকার হারিয়ে যায়নি সম্পূর্ণ; বরং তা কোথাও কোথাও রয়ে গেছে পুজোর আচার, নবরাত্রির রীতি এবং ভোগের পদে। রাজপরিবারের উত্তরসূরিরাও বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তাঁদের পারিবারিক ইতিহাসের কথা উল্লেখ করেছেন, যদিও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাঁরা নিজেদের জীবনযাত্রায় সম্পূর্ণ বাঙালি সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছেন।
বর্ধমান রাজবাড়ির পুজোর ইতিহাসে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে রাজবাড়ির দুর্গাদালানের সঙ্গে। একসময় যে দুর্গাদালানে ধুমধাম করে পুজো হত, সময়ের সঙ্গে সেই স্থাপত্যের অনেকটাই হারিয়ে যায়। পরে লক্ষ্মীনারায়ণ জিউ মন্দিরে পটেশ্বরীর পুজো অনুষ্ঠিত হতে থাকে। ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে সেই মন্দিরের নাটমন্দিরের একটি অংশ ভেঙে পড়ার খবরও প্রকাশিত হয়েছিল। ফলে ঐতিহ্যবাহী পুজো চালিয়ে যাওয়া এবং ঐতিহাসিক স্থাপত্য সংরক্ষণ—দুইয়েরই গুরুত্ব নতুন করে সামনে আসে।
এই পরিবর্তনের মধ্যেই আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে পটেশ্বরীর গুরুত্ব। কারণ স্থাপত্য ক্ষয় হতে পারে, রাজবাড়ির জৌলুস হারিয়ে যেতে পারে, কিন্তু একটি পটচিত্রের মধ্যে ধরে রাখা দেবীর রূপ প্রজন্মের স্মৃতিকে বহন করে যেতে পারে। সেই পট যেন এক ধরনের জীবন্ত দলিল—যেখানে শুধু দেবীর ছবি নেই, আছে একটি পরিবারের ইতিহাস, একটি শহরের পরিবর্তন এবং বাংলার পটশিল্পের ধারাবাহিকতার সাক্ষ্য।বর্ধমান রাজবাড়ির পুজো তাই শুধু ‘পুরনো রাজবাড়ির পুজো’ নয়। এটি বাংলার পটদুর্গার ঐতিহ্যেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বর্ধমান জেলায় পটে দুর্গা আঁকার আরও কিছু প্রাচীন দৃষ্টান্তের উল্লেখ পাওয়া যায়, কিন্তু রাজপরিবারের পটেশ্বরীই এই ধারার সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণগুলির একটি।
আজকের দিনে যখন দুর্গাপুজোর সঙ্গে নতুন নতুন থিম, নতুন প্রতিমার রূপ, আলোর কারুকাজ এবং বিশাল আয়োজন জুড়ে যায়, তখন বর্ধমান রাজবাড়ির পটেশ্বরী যেন তার বিপরীত এক দর্শন সামনে রাখেন। এখানে নতুনত্বের চেয়ে পুরনোকে ধরে রাখাই বড় কথা। প্রতি বছর একই দেবীর মুখ, একই পট, একই রীতির পুনরাবৃত্তি—তবু ভক্তির অনুভূতিতে কোনও পুনরাবৃত্তি নেই।কারণ উৎসবের সৌন্দর্য সবসময় পরিবর্তনের মধ্যে থাকে না। কখনও কখনও সৌন্দর্য থাকে একই জিনিসকে যত্ন করে ধরে রাখার মধ্যে।
বর্ধমানের রাজবাড়িতে সেই সৌন্দর্য ধরা পড়ে পটেশ্বরীর মুখে। তাঁর চোখের রেখায়, ঘোড়ামুখো সিংহে, একচালা পটের বিন্যাসে, দশ দিনের আচার-অনুষ্ঠানে, নবকুমারী পুজোয় এবং ছোলা-পুরি-হালুয়ার ভোগে। রাজা নেই, রাজত্ব নেই, নেই আগেকার সেই জাঁকজমক। কিন্তু দেবী এখনও আছেন—সেই পুরনো রূপেই।তাই শরতের আকাশে যখন কাশফুল দোলে, ঢাকের শব্দে শহর জেগে ওঠে, তখন বর্ধমান রাজবাড়ির কোনও এক পুরনো পরিসরে আবারও শুরু হয় পটেশ্বরীর আরাধনা। মৃন্ময়ী প্রতিমা বিসর্জনের জলে চলে যায়, কিন্তু এই দেবীর বিসর্জন নেই। তিনি থেকে যান তাঁর পটে, তাঁর রঙে, তাঁর চিরচেনা মুখে।
আর সেই কারণেই বর্ধমান রাজবাড়ির দুর্গাপুজো আসলে সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া একটি রাজপরিবারের গল্প নয় শুধু—এটি এমন এক দেবীর গল্প, যাঁর রূপ বদলায়নি, অথচ যাঁকে ঘিরে বদলে গেছে একটি শহর, একটি সমাজ এবং কয়েক শতাব্দীর ইতিহাস।