প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
বাসন্তী পুজো হল দেবী দুর্গার একটি বিশেষ উপাসনা, যা মূলত চৈত্র মাসে (মার্চ-এপ্রিল) অনুষ্ঠিত হয়। এটি মূলত পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা এবং বাংলাদেশের কিছু অংশে পালন করা হয়। পুরাণে দেবীর মর্ত্যে আসা-যাওয়ার জন্য চারটি বাহনের উল্লেখ পাওয়া যায়। এই চার বাহন হল গজ বা হাতি, ঘোটক বা ঘোড়া, দোলা বা পালকি এবং নৌকা। দেবীর প্রতিটি বাহনের নিজস্ব মাহাত্ম্য রয়েছে। এই বছর বাসন্তী পুজোয় দুর্গা আগমন ও গমন দুইই গজে হবে। পুরাণ অনুসারে হাতিতে চড়ে দেবীর ভ্রমণ শুভ লক্ষ্মণ। এর ফলে মর্ত্যবাসীর সৌভাগ্য ও সম্পদ বৃদ্ধি পায়।
বাসন্তী পুজোর বৈশিষ্ট্য:
1. সময়কাল: চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষে হয়, যা সাধারণত বসন্তকালেই পড়ে। তাই একে "বাসন্তী" পুজো বলা হয়।
2. দুর্গা পুজোর প্রাচীন রূপ: এটি মূলত শারদীয় দুর্গা পুজোর মতোই, তবে শারদীয়া দুর্গোৎসব জনপ্রিয় হওয়ার আগে বাসন্তী পুজোর প্রচলন ছিল।
3. উপাচার ও বিধান: এই পুজোতে চণ্ডীপাঠ, নবপত্রিকা স্নান, অষ্টমীর অঞ্জলি, সন্ধিপুজো এবং বলিদান (অনেক ক্ষেত্রে প্রতীকী বলি) করা হয়।
4. পরিচিত স্থান: পশ্চিমবঙ্গের অনেক জায়গায় এবং নদিয়ার কৃষ্ণনগর, বাঁকুড়া, মেদিনীপুর, মুর্শিদাবাদ, ওড়িশার কিছু অঞ্চলে এই পুজো ধুমধাম করে পালিত হয়।
5. বৈষ্ণব ও শাক্ত প্রভাব: অনেক ক্ষেত্রে বৈষ্ণব ভাবধারা মিশে গিয়ে বাসন্তী পুজোকে রামনবমীর সঙ্গে যুক্ত করে উদযাপন করা হয়।
এবছর বাসন্তী দুর্গাপূজা কবে?
ষষ্ঠী ৩ এপ্রিল ২০২৫- দেবী দুর্গার প্রতিমা স্থাপন
সপ্তমী ৪ এপ্রিল ২০২৫- নবপত্রিকা স্নান ও পুজোর বাকি আচার পালন
অষ্টমী ৫ এপ্রিল ২০২৫- অষ্টমীর পুজো ও সন্ধিপুজো
নবমী ৬ এপ্রিল ২০২৫- নবমীর পুজো বিধি পালন। এ দিন রামনবমীও পালিত হয়
দশমী ৭ এপ্রিল ২০২৫-দেবীর বিসর্জন ও উৎসবের সমাপ্তি
বাসন্তী পুজোর সূচনা হলো কীভাবে?
বাসন্তী পূজোর সূচনা মূলত চৈত্র মাসে নবরাত্রির সময় দুর্গাপূজার আয়োজনের মধ্য দিয়ে হয়েছিল। পুরাণ অনুসারে, রামায়ণের সঙ্গে এর একটি ঐতিহাসিক যোগ আছে।
প্রচলিত কাহিনী অনুযায়ী, শ্রীরামচন্দ্র রাবণবধের আগে দেবী দুর্গার আশীর্বাদ নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু দুর্গাপূজা সাধারণত শরৎকালে হয় (শারদীয় দুর্গাপূজা)। রাম তখন চৈত্র মাসে দেবীকে আহ্বান করেন এবং এক বিশেষ পূজা করেন, যা "অকাল বোধন" নামে পরিচিত। সেই থেকেই এই চৈত্র মাসের দুর্গাপূজার প্রচলন শুরু হয়, যা পরে বাসন্তী পূজা নামে জনপ্রিয় হয়।
পরবর্তী প্রচলন:
যদিও শারদীয় দুর্গাপূজাই সবচেয়ে জনপ্রিয়, তবুও বহু জায়গায় বাসন্তী পূজার প্রচলন রয়েছে, বিশেষত পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা ও বিহারের কিছু অংশে। বহু রাজবাড়িতেও বাসন্তী পূজার প্রচলন ছিল। বর্তমানে, বাসন্তী পূজা মূলত একই রীতিতে হয়, তবে শারদীয় দুর্গাপূজার মতো বড় মণ্ডপ বা বিসর্জনের আয়োজন সাধারণত কম হয়। এটি মূলত পারিবারিক বা মন্দিরভিত্তিক পূজা হিসেবে বেশি প্রচলিত।
কেন পালিত হয় রামনবমী উৎসব?
রামনবমী হল ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের জন্মতিথি, যা চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষের নবমী তিথিতে উদযাপিত হয়। এটি বিশেষ করে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব এবং ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে এটি মহাসমারোহে পালিত হয়।
রামনবমীর মাহাত্ম্য ও ইতিহাস
পুরাণ অনুসারে, ত্রেতাযুগে রাক্ষসরাজ রাবণের অত্যাচারে বিশ্ব জর্জরিত হয়েছিল। সেই সময় ব্রহ্মার আশীর্বাদে রাবণকে কোনো দেবতা, দৈত্য বা গন্ধর্ব হত্যা করতে পারবে না, তবে একজন মানুষ পারবে। তাই বিষ্ণু নিজে রামের রূপে অযোধ্যার রাজা দশরথ ও রানী কৌশল্যার সন্তান হিসেবে জন্মগ্রহণ করেন।
উদযাপন পদ্ধতি:
1.উপবাস ও পূজা – অনেক ভক্ত এই দিনে উপবাস রাখেন ও রামের মূর্তি বা চিত্রের সামনে পুজো করেন।
2. রামকথা ও পাঠ – রামায়ণ পাঠ, বিশেষত রামচরিতমানস পাঠ করা হয়।
3. রামলীলার আয়োজন – বিভিন্ন স্থানে রামলীলার মঞ্চায়ন করা হয়, যেখানে শ্রীরামের জীবনচরিত অভিনয়ের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়।
4. শোভাযাত্রা – কিছু স্থানে রামের মূর্তি নিয়ে বিশাল শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়।
5. গঙ্গাস্নান ও দানধর্ম – এই দিনে গঙ্গাস্নান ও দান-ধর্ম করলে বিশেষ পূণ্য অর্জিত হয় বলে মনে করা হয়।
বিশেষ স্থান:
অযোধ্যা, যা শ্রীরামের জন্মস্থান, সেখানে রামনবমী অত্যন্ত জাঁকজমকের সাথে পালিত হয়। ভারতের অন্যান্য জায়গা যেমন উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু, কর্ণাটকেও এটি বিশেষভাবে উদযাপিত হয়। এই উৎসব কেবলমাত্র ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি ন্যায়পরায়ণতা ও সত্যের বিজয়ের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
এবছর রামনবমী কবে?
রাম নবমী ২০২৫ সালে রবিবার, ৬ই এপ্রিল পালিত হবে। এই তিথি চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষের নবমী তিথিতে উদযাপিত হয়, যা ২০২৫ সালের ৫ই এপ্রিল সন্ধ্যা ৭:২৬ মিনিটে শুরু হয়ে ৬ই এপ্রিল সন্ধ্যা ৭:২২ মিনিটে শেষ হবে। পূজার শুভসময় (মধ্যাহ্ন মুহূর্ত) ৬ই এপ্রিল সকাল ১১:০৮ মিনিট থেকে দুপুর ১:৩৯ মিনিট পর্যন্ত নির্ধারিত হয়েছে।