6th Oct 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

মুর্শিদাবাদের রাজবাড়ির দুর্গাপুজো। নবাবি বাংলার পাশে শাক্ত আরাধনার নিজস্ব ইতিহাস।

প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিনিধি


মুর্শিদাবাদ বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে হাজারদুয়ারির দীর্ঘ করিডর, ভাগীরথীর ধীর স্রোত, নবাবি আমলের স্থাপত্য, মুর্শিদাবাদের রেশম আর ইতিহাসের অসংখ্য স্তর। কিন্তু এই শহর ও জেলার ইতিহাস শুধু নবাবদের রাজনীতি কিংবা প্রাসাদের গম্বুজে আটকে নেই। সেই ইতিহাসের আর একটি গভীর অধ্যায় ছড়িয়ে আছে রাজবাড়ির ঠাকুরদালানে, জমিদারবাড়ির অন্দরমহলে, পুরনো পুজোর আচার-অনুষ্ঠানে। শরৎ এলেই সেই ইতিহাস যেন নতুন করে জেগে ওঠে। ধূপের গন্ধ, ঢাকের শব্দ, শঙ্খধ্বনি আর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা রীতির মধ্যে দিয়ে মুর্শিদাবাদের রাজবাড়িগুলি মনে করিয়ে দেয়—দুর্গাপুজো কেবল উৎসব নয়, এও এক জীবন্ত উত্তরাধিকার।

মুর্শিদাবাদের বিভিন্ন রাজবাড়ি ও জমিদার পরিবারে দুর্গাপুজোর রীতি এক নয়। কোথাও রয়েছে রাজকীয় আড়ম্বর, কোথাও সাবেকি প্রতিমা, কোথাও কুমারী পুজো, কোথাও আবার ভোগের পদেও রয়েছে নিজস্ব ঐতিহ্য। আর কোথাও পুজোর দায়িত্ব পরিবারের সদস্যদের হাতে না থেকে চলে এসেছে একটি নির্দিষ্ট পেশাজীবী সম্প্রদায়ের হাতে। এই বৈচিত্র্যই মুর্শিদাবাদের বনেদি পুজোগুলিকে অন্য মাত্রা দিয়েছে।

কাশিমবাজার রাজবাড়ির পুজো এই ঐতিহ্যের অন্যতম উজ্জ্বল উদাহরণ। প্রকাশিত ইতিহাস অনুযায়ী, অযোধ্যারাম রায় ১৭৪০ সালে কাশিমবাজার ছোট রাজবাড়িতে দুর্গাপুজোর সূচনা করেন। তাঁর আদি নিবাস ছিল বাঁকুড়ার পাত্রসায়র। ব্যবসার সূত্রে মুর্শিদাবাদে এসে তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ান পদে নিযুক্ত হন। তাঁর হাত ধরে যে পুজোর শুরু, তা আজ প্রায় তিনশো বছরের ঐতিহ্য বহন করছে। রাজবাড়ির নিজস্ব পুঁথি মেনে সাত জন পুরোহিত পুজো পরিচালনা করেন। রথের দিন কাঠামো পুজোর মধ্য দিয়ে প্রস্তুতি শুরু হয়। সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত কুমারী পুজোর রীতিও চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরে।

কাশিমবাজারের পুজোর আর একটি দিক হল পারিবারিক যোগাযোগের সেই পুরনো রীতি। একসময় পান-সুপারি দিয়ে আত্মীয় ও প্রতিবেশীদের বাড়ি বাড়ি আমন্ত্রণ জানানোর প্রথা ছিল। আজকের ব্যস্ত জীবনে সেই পুরনো সামাজিকতার অনেকটাই বদলে গেলেও পুজো এলে রাজবাড়ির সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ এখনও অটুট। দশমীর দিন বিসর্জনের আগে সিঁদুরখেলা, পরিবারের সদস্যদের মিলন এবং রাজবাড়ির পুরনো পরিবেশ—সব মিলিয়ে এই পুজো আজও অতীতের এক টুকরো আবহ ধরে রেখেছে।

মুর্শিদাবাদের আর একটি উল্লেখযোগ্য নাম নিমতিতা। সামশেরগঞ্জের নিমতিতা রাজবাড়ি শুধু দুর্গাপুজোর জন্য নয়, তার স্থাপত্য, সংস্কৃতি এবং চলচ্চিত্র-স্মৃতির জন্যও বিশেষ পরিচিত। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, উনিশ শতকের মাঝামাঝি গৌরসুন্দর চৌধুরী ও দ্বারকানাথ চৌধুরীর উদ্যোগে বিশাল জমিদারবাড়িটির নির্মাণ শুরু হয়। ইতালীয় স্থাপত্যের প্রভাব থাকা এই প্রাসাদসদৃশ বাড়িতে একসময় ছিল পাঁচটি উঠোন ও প্রায় দেড়শো ঘর। বাড়ির বিশালতা ও আভিজাত্যের জন্যই স্থানীয় মানুষের মুখে এটি ‘রাজবাড়ি’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।

একসময় নিমতিতা রাজবাড়ির দুর্গাপুজো ছিল মুর্শিদাবাদের অন্যতম বড় আকর্ষণ। লোকমুখে প্রচলিত আছে, পুজোর সময় একসঙ্গে ১০১ জন ঢাকি ঢাক বাজাতেন। পাঁচ দিন ধরে গ্রামের মানুষকে পাত পেড়ে খাওয়ানোর আয়োজনও ছিল। অর্থাৎ দুর্গাপুজো তখন কেবল পরিবারের ধর্মীয় অনুষ্ঠান ছিল না; তা হয়ে উঠেছিল গোটা এলাকার সামাজিক উৎসব।নিমতিতা রাজবাড়ির সঙ্গে হিন্দুস্তানি সংগীত এবং নাট্যচর্চারও দীর্ঘ সম্পর্ক রয়েছে। চৌধুরী পরিবারের পৃষ্ঠপোষকতায় সংগীতের আসর বসত, নাট্যচর্চাও ছিল এই বাড়ির সাংস্কৃতিক জীবনের অংশ। সত্যজিৎ রায়ের ‘জলসাঘর’-এর স্মৃতিও এই রাজবাড়িকে ঘিরে আজও আলোচিত। ফলে নিমতিতার ঠাকুরদালানে দুর্গাপুজোর ঢাক বাজলে তার সঙ্গে যেন মিশে যায় বাংলা সংস্কৃতির আরও অনেক পুরনো প্রতিধ্বনি।

তবে নিমতিতা রাজবাড়ির দুর্গাপুজোর সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হয়তো পুজোর আয়োজনের দায়িত্বে। চৌধুরী পরিবারের সদস্যরা সরাসরি পুজোর জোগাড়-যন্ত্রে হাত দেন না। বংশপরম্পরায় সেই দায়িত্ব পালন করে আসছেন নাপিত সম্প্রদায়ের মানুষজন। পুজোর প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ থেকে শুরু করে নানা প্রস্তুতি—এই প্রথাই আজও বজায় রয়েছে। কয়েক শতাব্দী ধরে চলে আসা এমন একটি সামাজিক দায়িত্ববণ্টনই দেখিয়ে দেয়, বনেদি বাড়ির পুজো আসলে কেবল একটি পরিবারের ইতিহাস নয়; তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি গোটা এলাকার মানুষের জীবন ও পেশাগত ঐতিহ্য।

নিমতিতার পুজোর ধর্মীয় রীতিতেও রয়েছে নিজস্বতা। এই পুজো বৈষ্ণব মতে অনুষ্ঠিত হয়। তাই এখানে বলির প্রথা নেই। এমনকি দেবীকে অন্নভোগও দেওয়া হয় না। মায়ের নৈবেদ্যে থাকে লুচি, নানা রকম ভাজা এবং মিষ্টি। বিশেষত্ব হল, সেই ভোগে নুন ব্যবহার করা হয় না। এই সরল অথচ কঠোর নিয়মই নিমতিতার পুজোকে অন্য অনেক রাজবাড়ির পুজো থেকে আলাদা করে দেয়।

পঞ্চমীর দিন দেবীকে ‘থানে’ তোলার পর শুরু হয় মূল আয়োজন। ষষ্ঠীতে বোধন, তারপর সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীর পুজো—প্রতিটি দিনই চলে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে। দশমীর দিন হয় বিসর্জন। কলকাতায় ছড়িয়ে থাকা পরিবারের সদস্যরা বছরের অন্য সময়ে দূরে থাকলেও পুজোর কয়েকটি দিন নিজেদের পুরনো ভিটেতে ফিরে আসার চেষ্টা করেন। ফলে এই পুজো তাঁদের কাছে ধর্মীয় কর্তব্যের পাশাপাশি পারিবারিক পুনর্মিলনেরও সময়।

সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলেছে। একসময় যে রাজবাড়ির উঠোনে হাজার হাজার মানুষ পাত পেড়ে খেতেন, আজ সেই আয়োজন আগের মতো নেই। বাড়ির জাঁকজমকও ক্ষয়িষ্ণু। তবু পুজোর দিনগুলিতে মানুষ এখনও ভিড় করেন। কারও টান পুরনো বাড়ির স্থাপত্যে, কারও সত্যজিৎ রায়ের স্মৃতিতে, কারও আবার দেবীর প্রতি দীর্ঘদিনের বিশ্বাসে। ২০২২ সালে নিমতিতা রাজবাড়িকে হেরিটেজ সম্পত্তি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে; তবে সংরক্ষণের কাজ নিয়ে স্থানীয় স্তরে উদ্বেগও রয়েছে।

মুর্শিদাবাদের রাজবাড়ির দুর্গাপুজোর গল্প অবশ্য নিমতিতা বা কাশিমবাজারেই শেষ নয়। নশীপুর রাজবাড়ির পুজোতেও এখনও পুরনো ধাঁচের প্রতিমা ও সাবেকি আচার অনুসরণের কথা জানা যায়। কুঞ্জঘাটা রাজবাড়ির পুজোতেও অতীতের অনেক আড়ম্বর হারিয়ে গেলেও পুরনো রীতিনীতি, পুরোহিত ও প্রতিমাশিল্পীর বংশপরম্পরা এখনও টিকে রয়েছে। পুজোর সময়ে পরিবারের সদস্যরা দেশের নানা প্রান্ত থেকে ফিরে আসেন পিতৃপুরুষের ভিটেতে। আগে যেখানে থিয়েটার, যাত্রা, পুতুলনাচ এবং বহুদিন ধরে পাত পেড়ে খাওয়ানোর আয়োজন ছিল, এখন তার অনেকটাই অতীত। কিন্তু পুজোকে কেন্দ্র করে মানুষের সমাগম এখনও অব্যাহত।

আর মুর্শিদাবাদের দুর্গাপুজোর কথা বলতে গিয়ে রাজরাজেশ্বরী নামটিও বারবার ফিরে আসে। জেলার বিভিন্ন প্রান্তে রাজরাজেশ্বরী নামে দেবীর আরাধনার নিজস্ব ইতিহাস রয়েছে। মুর্শিদাবাদের উত্তরাংশে বংশবাটি গ্রামের রাজরাজেশ্বরী পুজো তার একটি অনন্য উদাহরণ। যদিও এটি প্রচলিত শরৎকালের দুর্গাপুজো নয়, সরস্বতী পুজোর পরদিন শীতলা ষষ্ঠী থেকে শুরু হয়ে মাঘী পূর্ণিমা পর্যন্ত এই দুর্গোৎসব চলে। দেবী সেখানে দশভুজা নন, চতুর্ভুজা; তাঁর হাতে চক্র, শঙ্খ, তির ও ধনুক। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, রাজুয়া দিঘির সঙ্গে দেবীর আবির্ভাবের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। স্থানীয় বিশ্বাসে এই পুজোর বয়স কয়েক শতক।এই রাজরাজেশ্বরী-পরম্পরা মনে করিয়ে দেয়, মুর্শিদাবাদের দেবী আরাধনা কোনও একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে বাঁধা নয়। নবাবি সংস্কৃতি, জমিদারি ঐতিহ্য, বৈষ্ণব ভাবধারা, শাক্ত আরাধনা, লোকবিশ্বাস—সবকিছু এখানে কোথাও না কোথাও এসে মিশেছে। তাই একই জেলায় একদিকে যেমন কাশিমবাজারের রাজকীয় দুর্গোৎসব, অন্যদিকে নিমতিতার নুনহীন লুচির ভোগ; কোথাও আবার পুরনো পুঁথি মেনে পুজো, কোথাও পেশাজীবী সম্প্রদায়ের হাতে পুজোর সমস্ত আয়োজন—প্রতিটি রীতিই হয়ে উঠেছে একটি করে ইতিহাসের দলিল।

মুর্শিদাবাদের রাজবাড়ির দুর্গাপুজোর সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য তাই তার আড়ম্বরের মধ্যে একা নয়। বরং সময়ের সঙ্গে সেই আড়ম্বর কমে গেলেও যে আচারগুলি এখনও টিকে আছে, সেখানেই তার আসল শক্তি। পুরনো প্রাসাদের দেওয়ালে হয়তো আগের মতো রং নেই, উঠোনে হয়তো আগের মতো হাজার মানুষের ভোজ বসে না, ঢাকির সংখ্যাও হয়তো কমেছে। কিন্তু নির্দিষ্ট দিনে বোধন হয়, দেবীর সামনে প্রদীপ জ্বলে, পুরনো নিয়মে ভোগ রান্না হয়, পরিবারের মানুষ দূরদূরান্ত থেকে ফিরে আসেন। স্থানীয় মানুষও সেই পুজোর সঙ্গে নিজেদের সম্পর্কটুকু ধরে রাখেন।

এই কারণেই মুর্শিদাবাদের রাজবাড়ির পুজোকে শুধু ‘বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজো’ বলে দেখলে তার সম্পূর্ণ গল্প বলা হয় না। এগুলি আসলে বাংলার সামাজিক ইতিহাসের জীবন্ত অধ্যায়। নবাবি আমলের স্মৃতি, জমিদারি সংস্কৃতির উত্থান-পতন, পরিবারের বিচ্ছুরণ, পেশাভিত্তিক সামাজিক সম্পর্ক, ধর্মীয় রীতির বৈচিত্র্য এবং মানুষের দীর্ঘদিনের বিশ্বাস—সবকিছুর সাক্ষী এই পুজোগুলি।

শরতের আকাশে যখন সাদা মেঘ ভাসে, মুর্শিদাবাদের পুরনো রাজবাড়ির উঠোনেও তখন ফিরে আসে সেই চেনা ব্যস্ততা। কোথাও ধূপের ধোঁয়া, কোথাও ঢাকের তাল, কোথাও নুনহীন লুচির ভোগ, কোথাও পুরনো পুঁথি খুলে বসেন পুরোহিত। রাজা নেই, জমিদারি নেই, আগের সেই ঐশ্বর্যও নেই। তবু দেবী আছেন। আর তাঁকে ঘিরে যে মানুষগুলি প্রতি বছর ফিরে আসেন, তাঁদের স্মৃতি ও বিশ্বাসেই বেঁচে থাকে রাজবাড়ির পুজো।

সময়ের স্রোত অনেক কিছু মুছে দেয়। কিন্তু কিছু উৎসব সময়কে মুছে যেতে দেয় না। মুর্শিদাবাদের রাজবাড়ির দুর্গাপুজো তেমনই—নবাবি বাংলার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক জীবন্ত স্মারক, যেখানে ইতিহাস শুধু পড়া যায় না, শরতের চারটি দিনে তাকে অনুভবও করা যায়।

Archive

Most Popular