প্রতিবেদন
সুদেষ্ণা ঘোষ
নীলষষ্ঠী বা নীল পূজা হল বাঙালি হিন্দুদের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লোকাচার-ভিত্তিক উৎসব, যা মূলত চৈত্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে উদযাপন করা হয়। তবে বিভিন্ন অঞ্চলে এর তাৎপর্য একটু ভিন্ন রকম। নীল শব্দটি এখানে নীলকণ্ঠ শিব বা নীল রঙ অর্থে ব্যবহৃত হয়। এটি মূলত নারীদের ব্রত – সন্তানের মঙ্গল কামনায়, স্বাস্থ্য ও দীর্ঘজীবনের আশায় নারীরা এই পূজা করে থাকেন। অনেক জায়গায় এটিকে শিবের পূজা বলে গণ্য করা হয়, আবার কোথাও কোথাও এটি গো-পূজা, কৃষ্ণ পূজা বা লোকদেবতার পূজা হিসেবেও পালন হয়।
কেন একে নীল পূজা বলা হয়?
নীল ষষ্ঠীকে নীল পূজাও বলা হয় কারণ, এই দিনে ভগবান শিবকে তাঁর নীলকণ্ঠ রূপে পূজা করা হয়। হিন্দু পুরাণ অনুসারে, মহাবিশ্বকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য সমুদ্র মন্থনের সময় ভগবান শিব হলাহল বিষ গ্রহণ করেছিলেন। বিষ তাঁর গলা নীল করে দেয় এবং তিনি নীলকণ্ঠ নামে পরিচিত হন।
কেন এই দিনে শিবের পূজা করা হয়?
নীল ষষ্ঠীতে বিভিন্ন কারণে ভগবান শিবের পূজা করা হয়:
- বিষ গ্রহণের স্মরণে: এই উৎসব সেই দিনটিকে চিহ্নিত করে যখন ভগবান শিব মহাবিশ্বকে রক্ষা করার জন্য বিষ গ্রহণ করেছিলেন।
- সুখী বিবাহিত জীবনের জন্য আশীর্বাদ প্রার্থনা: বিবাহিত মহিলারা প্রায়শই সুখী ও সমৃদ্ধ বিবাহিত জীবনের জন্য ভগবান শিব এবং দেবী পার্বতীর আশীর্বাদ প্রার্থনার ব্রত পালন করেন।
- উর্বরতা এবং সন্তান জন্মদানের জন্য: এই উৎসবটি উর্বরতা এবং সন্তান জন্মদানের সাথেও জড়িত, অনেক মহিলা সন্তান ধারণের ব্রত পালন করেন।
উৎসবের তাৎপর্য:
নীল ষষ্ঠী হিন্দুধর্মে একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব, এবং এটি পালনের ফলে বেশ কিছু সুবিধা পাওয়া যায় বলে বিশ্বাস করা হয়, যার মধ্যে রয়েছে:
- আধ্যাত্মিক বৃদ্ধি: এই উৎসব ভক্তদের জন্য ভগবান শিব এবং দেবী পার্বতীর সাথে সংযোগ স্থাপন এবং আধ্যাত্মিক বৃদ্ধির জন্য তাদের আশীর্বাদ প্রার্থনা করার একটি সুযোগ।
- বৈবাহিক সুখ: এই উৎসব বিবাহিত দম্পতিদের জন্য সুখ এবং সমৃদ্ধি নিয়ে আসে বলে বিশ্বাস করা হয়।
নীলষষ্ঠীর উদ্দেশ্য:
নীলষষ্ঠীর প্রাথমিক উদ্দেশ্য হল বিবাহিত মহিলাদের সুখী ও সমৃদ্ধ বিবাহিত জীবনের জন্য ভগবান শিব এবং দেবী পার্বতীর আশীর্বাদ প্রার্থনা করা। এটি উর্বরতা এবং সন্তান জন্মদানের সাথেও জড়িত, অনেক মহিলা সন্তান ধারণের ব্রত পালন করেন ।
ব্রত পালনের নিয়ম:
যদিও কোনও কঠোর নিয়ম নেই, নীলষষ্ঠীর সময় পালন করা কিছু সাধারণ রীতি এখানে দেওয়া হল :
- উপবাস: ভক্তরা তাদের পছন্দের উপর নির্ভর করে পুরো দিন উপবাস করতে পারেন বা একবার খাবার খেতে পারেন।
- খাদ্যতালিকাগত বিধিনিষেধ: এই সময়কালে আমিষ খাবার, রসুন এবং পেঁয়াজ সাধারণত এড়িয়ে চলা হয়।
- মন্দির দর্শন: অনেক ভক্ত ভগবান শিব ও দেবী পার্বতীর উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত মন্দিরে প্রার্থনা এবং আশীর্বাদ পেতে যান।
- ধর্মগ্রন্থ পাঠ: ভক্তরা ভগবান শিব ও দেবী পার্বতীর সাথে সম্পর্কিত ধর্মগ্রন্থ এবং প্রার্থনা পাঠ করতে পারেন।
- শুদ্ধিকরণ: কিছু ভক্ত ধ্যান, উপাসনা এবং শৃঙ্খলার মাধ্যমে তাদের মন ও শরীরকে শুদ্ধ করার উপায় হিসেবে এই ব্রত পালন করেন।
আচার-অনুষ্ঠানের ভিন্নতা
এটা মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে নীলষষ্ঠী পালন ব্যক্তি এবং সম্প্রদায়ের মধ্যে ভিন্ন হতে পারে। কেউ কেউ বংশ পরম্পরায় চলে আসা নির্দিষ্ট আচার-অনুষ্ঠান বা রীতিনীতি অনুসরণ করতে বেছে নিতে পারেন, আবার কেউ কেউ তাদের ব্যক্তিগত চাহিদা এবং পরিস্থিতি অনুসারে ব্রতটি গ্রহণ করতে পারেন। সামগ্রিকভাবে, নীল ষষ্ঠী হিন্দুধর্মে একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব, এবং এর পালন ভক্তদের জন্য বেশ কিছু উপকার বয়ে আনে বলে বিশ্বাস করা হয়।