19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

ফেলুদার সঙ্গে ধাঁধা হেঁয়ালি

প্রতিবেদন

সমুদ্র বসু


"... এবং ফেলুদা কাহিনীগুলো এত প্রিয় এবং এত আকর্ষণীয় হবার মূল কারণ সত্যজিৎ রায়ের সহজ, সুন্দর, স্বচ্ছ, রসসমৃদ্ধ ভাষা । এমন ভাষা যেকোনো লেখকের কাছে আকর্ষণীয় ।"--   সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ("প্রিয় ফেলুদা" প্রবন্ধে)
সত্যজিৎ রায় বিশুদ্ধ গল্পকার, জাত গল্পবলিয়ে । তিনি তাঁর অধিকাংশ গল্পগুলোই লিখেছেন মূলতঃ কিশোরদের জন্য কিন্তু তা সর্বজনপাঠ্য। আট থেকে আশি- সব বয়সী পাঠকই সমান ভাবে উপভোগ করে। সব বয়সী মানুষের মধ্যে সত্যজিতের ফেলুদা কাহিনী এত জনপ্রিয় হওয়ার মূল কারণ এর সহজ, সরল, স্বচ্ছ, রসসমৃদ্ধ ভাষা । আমাদের মুখের ভাষাই গদ্যরুপ পেয়েছে তাঁর রচনায় । আর তার ফলেই পাঠকের সঙ্গে তাঁর সহজ যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে ।  ভাষা সাহিত্যে ভাব প্রকাশের একমাত্র মাধ্যম । ভাষার মাধ্যমেই বক্তা তাঁর মনোভাব যথার্থ রুপে প্রকাশ করে । আর এই প্রকাশভঙ্গির মধ্যে দিয়েই লেখকের ব্যক্তি স্বাতন্ত্রের, তাঁর রচনা রীতির বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে । কোনো লেখকের রচনা রীতির মৌলিক কৌশলগুলি আবিষ্কার করতে হলে সমালোচককে লক্ষ করতে হয় লেখকের শব্দ ব্যবহার, শব্দগঠন, বাক্যগঠন, বাক্যসজ্জাগত বৈশিষ্ট্যের দিক । সত্যজিতের গদ্যশৈলী আবিষ্কারের ক্ষেত্রেও এই পদ্ধতি অনুসরণই বাঞ্চনীয় । 

ভাষার প্রধান উপাদান word বা শব্দ । ছোটোবেলা থেকেই সত্যজিৎ নানারকম বিচিত্র শব্দ সন্ধান করতে ভালোবাসতেন । এ প্রসঙ্গে নলিনী দাশ বলেছেন- 
"ছোটোবেলায় একটা ইংরেজি শব্দ জেনে আমাদের খুব মজা লেগেছিল- ফ্লুসিনসিনিহিলিপিলিফিকেশন ( Floccinaucinihilipilification) - সেটা নাকি ইংরেজি ভাষার সবচেয়ে লম্বা শব্দ !...  সে নিজের খাতায় শব্দটা লিখে রেখেছিল, আবার আমাকে চিঠিতে সে কথা জানিয়েছিল । চিঠির তারিখ ৬/১২/১৯২৯, তখন মানিকের বয়স মাত্র  সাড়ে আট । এত কম বয়সে এই ধরণের কৌতূহল সাধারণতঃ দেখা যায়না । " 
( নলিনী দাশ, ' সাত রাজার ধন এক মানিক', নিউ স্ক্রিপ্ট, পৃ. ১০৮ ) 
শুধু তাই নয়, সে বড়দের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বড়দের সমান দক্ষতায় বড়দের জন্য তৈরী ক্রসওয়ার্ড পাজল সলভ করতে পারত । এছাড়া, তিনি অবসরেও নানারকম word games খেলতে ভালোবাসতেন । ছোটোবেলার এই শখ বড় হয়েও সত্যজিতের মধ্যে পূর্ণমাত্রায় ছিল । তিনি তাঁর ফেলুদা কাহিনীতে শব্দ নিয়ে খেলা করার এক বিস্তীর্ণ অবসর পেয়েছিলেন । তাঁর বহু কাহিনীতে অনেক সময় শব্দের জট খোলার সঙ্গে সঙ্গে রহস্যের জটও খুলে গেছে । এভাবে সত্যজিতের ফেলুদা কাহিনীর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে নানা হেঁয়ালি ও ধাঁধা।  

ফেলুদা কাহিনীতে ব্যবহৃত হেঁয়ালিগুলোকে কতগুলি শ্রেণীতে ভাগ করার চেষ্টা করলাম।  

১) শব্দ নিয়ে খেলা
'বাদশাহী আংটি ' তে পিয়ারিলালের শেষ কথা ' এ স্পাই ' যে আসলে গুপ্তচর নয়, ' স্পাইডার' শব্দের প্রথমার্ধ- এই উন্মোচনের মধ্যেই ছিল অপরাধীর হদিস এবং ঠিকানা । 
আবার ' জয় বাবা ফেলুনাথ ' এ ঘোষাল পরিবারের দুর্গামূর্তি নির্মাতা শশীবাবু খুন হয়ে মারা যাওয়ার আগের মুহুর্তে ফেলুদাকে বলে যান - ' সিং...সিং...সিং ।' এই ' সিং' শব্দটার মধ্যে দিয়ে তিনি চুরি যাওয়া গণেশ কোথায় রাখা আছে ( সিংহের মুখের মধ্যে ), তা যেমন বলতে চেয়েছিলেন, তেমনি বিকাশ সিংহকে তিনি এই মূর্তিটি দিয়েছিলেন, সে কথা জানানোর মাধ্যমে তাঁর হত্যাকারীকেও চিহ্নিত করতে চেয়েছিলেন । 
তবে শব্দ নিয়ে খেলা করার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নিদর্শন পাওয়া যায় ' ছিন্নমস্তার অভিশাপ' এ । এই কাহিনীতে 'কৈলাস ' হয়ে ওঠে ' হোয়্যার ইজ দি ডেডবডি ', ' বিবি ' হয় ' জোড়া মৌমাছি ' আর ' দাদু ' হয়ে ওঠে ' জোড়া কাটারি '। আবার, মহেশ চৌধুরী তাঁর নাতনিকে বলা কথা, ' কী পাচ্ছি না, কী খুঁজছি ' র  ' কী ' যে আসলে চাবি তা লেখকের ভাষার প্রয়োগগত দক্ষতাকে পরিস্ফুট করে পাঠকের প্রসংশা দাবি করে । 
প্রসঙ্গতঃ আরেকটি ফেলুদা কাহিনীর কথা উল্লেখ করব । সেটি হল ' গ্যাংটকে গণ্ডগোল  ' । সেখানে তিনি টেলিগ্রামে ব্যবহৃত ভাষার মধ্যেই হেঁয়ালি সৃষ্টি করেছেন । শিবকুমার শেলভাঙ্কার একটি টেলিগ্রাম পেয়েছিলেন - " YOUR SON MAY BE IS A SICK MONSTER...PRITEX "। এই টেলিগ্রামে শিবকুমারের হারিয়ে যাওয়া পুত্র বীরেন্দ্র সম্পর্কে তথ্য ছিল । এর আপাত অর্থ, তোমার সন্তান হয়তো একজন অসুস্থ রাক্ষস । কিন্তু, ফেলুদা এই টেলিগ্রামেএ প্রকৃত অর্থ আবিষ্কার করেছিলেন 'Is' কে 'In' করে এবং ' Sick ' কে 'সিকিম' এবং ' Monster ' কে মনাস্টেরি ধরে । অর্থাৎ এর প্রকৃত অর্থ হল, তোমার সন্তান হয়তো কোনো সিকিম মনাস্টেরিতে আছে । আর PRITEX হল এক গোয়েন্দা সংস্থা ।


২) শব্দের অর্থগত বৈচিত্র নিয়ে হেঁয়ালি 

শব্দের অর্থগত বৈচিত্রের বিষয়েও সত্যজিৎ সচেতন ছিলেন । ' গোসাইপুর সরগরম ',  ' ছিন্নমস্তার অভিশাপ', ' সোনার কেল্লা' এবং ' রয়্যাল বেঙ্গল রহস্য' এ এই অর্থগত বৈচিত্র্যের উৎকৃষ্টতার চরম নিদর্শন পাওয়া যায় । ফেলুদার পোশাকি নাম প্রদোষ চন্দ্র মিত্র । ' গোসাইপুর সরগরম '- এ মৃগাঙ্ক ভট্টাচার্য তাঁর নামের হেঁয়ালি করে তাঁকে ' সন্ধ্যাশশী বন্ধু' বলে অভিহিত করেছেন । ' প্রদোষ ' হল ' সন্ধ্যা ',  'চন্দ্র' হল ' শশী ' আর ' মিত্র ' হল ' বন্ধু ' । আবার, ফেলুদার পেশাটি মৃগাঙ্ক বাবু দ্বারা অভিহিত হয়েছে ' সূক্ষ সাল শস্য ' শব্দত্রয়ীর মাধ্যমে । এই ' সূক্ষ সাল শস্য ' আসলে - " সূক্ষ হল অণু, সাল- দন্ত্য স হল সন, আর শস্য হল ধান । " অর্থাৎ অনুসন্ধান । 

' সোনার কেল্লা 'তে  লেখক আবার ফেলুদার পোশাকি নামের ব্যাখ্যা একটু অন্যভাবে করে বলেছেন-
" - প্রদোষ - প্র হচ্ছে প্রফেশনাল, দোষ হচ্ছে ক্রাইম আর সি হচ্ছে টু সি- অর্থাৎ দেখা- অর্থাৎ ইনভেস্টিগেট । অর্থাৎ প্রদোষ সি ইজ ইক্যুয়াল টু প্রফেশনাল ক্রাইম ইনভেস্টিগেটর । "

ফেলুদার মতো লালমোহনবাবুরও নামের হেঁয়ালি তৈরী করিয়েছেন লেখক ফেলুদাকে দিয়ে । ' গোঁসাইপুর সরগরম ' এ ফেলুদা লালমোহন বাবুর নামের হেঁয়ালি করেছেন - " রক্তবরণ মুগ্ধকরণ নদীপাশে যাহা বিঁধিলে মরণ । "

ষড়রিপু নিয়ে নিয়ে হেঁয়ালি পাওয়া যায় মহেশবাবুর ডায়েরি তে।  এর উদাহরণ দিলাম "ছিন্নমস্তার অভিশাপ" থেকে সরাসরি-
এই পাতাটায় লেখা–পাঁচের বশে বাহন ধ্বংস।
সর্বনাশ, বললেন লালমোহনবাবু, এ যে আবার হেঁয়ালি দেখছি মশাই।

তা তো বটেই, বলল ফেলুদা, এবার এটা দেখুন। এটা ১৯৩৮ অর্থাৎ প্রথম বছরের ডায়রি, আর এটাই পেনসিালে প্রথম সাংকেতিক লেখা।
১৯৩৮-এর ডায়রির প্রথম পাতাতেই লিখেছেন ভদ্রলোক শাস্তু দুই-পাঁচের বশ।
শঙ্কুটি কে? লালমোহনবাবু প্রশ্ন করলেন।
ফেলুদা বলল, ভদ্রলোক নিজের বিষয় বলতে গেলে সব সময়ই শিবের কোনও না কোনও নাম ব্যবহার করেছেন।
শিবের নাম তো হল, কিন্তু দুই-পাঁচের বশ তো বোঝা গেল না।
রিপু বোঝেন? জিজ্ঞেস করল ফেলুদা।
মানে ছেঁড়া কাপড় সেলাই-টেলাই করা বলছেন?
আপনি ফারসি-সংস্কৃত গুলিয়ে ফেলছেন, লালমোহনবাবু! আপনি যেটা বলছেন সেটা হল রিফু। আমি বলছি রিপু।
ওহো–ষড়রিপু? মানে শত্রু?
শত্রু। এবার মানুষের এই ছটি শত্রুর নাম করুন তো।
ভেরি ইজি। কাম ক্ৰোধ লোভ মদ মোহ মাৎসর্য।
হল না। অর্ডারে ভুল। কাম ক্ৰোধ লোভ মোহ মদ মাৎসর্য। অর্থাৎ দুই আর পাঁচ হল ক্ৰোধ আর মদ।
ওয়ান্ডারফুল? বললেন লালমোহনবাবু, এ তে মিলে যাচ্ছে মশাই।
এবার তা হলে প্রথমটা আর-একবার দেখুন, এটাও মিলে যাবে।
এবারে আমার কাছেও ব্যাপারটা সহজ হয়ে গেছে। বললাম, বুঝেছি, দুইয়ের বশে বাহন ধ্বংস হচ্ছে, রাগের মাথায় গাড়ি ভাঙা।


মহেশ চৌধুরীর ডায়েরিতে প্রাপ্ত অসংখ্য তথ্যের মধ্যে শব্দ নিয়ে খেলা করার অজস্র নিদর্শন ছড়িয়ে আছে । 
এরুপ কয়েকটি দৃষ্টান্ত হল -
i)  ' আজ থেকে পাঁচ বাদ ' ।
ii) ' ভোলানাথ ভোলে না । আবার পাঁচ । পাঁচেই বিস্মৃতি । '
iii) ' অনর্গল - ঘৃতকুমারী '।
মানুষের ষড়রিপুর মধ্যে পঞ্চম রিপু হল মদ । প্রথম দৃষ্টান্তে লেখক বোঝাতে চেয়েছেন, মহেশবাবু মদ্যপান ত্যাগ করেছেন । আবার ' মহেশ ' এবং ' ভোলানাথ ' শিবের দুই নাম । তাই দ্বিতীয় সূত্র থেকে বোঝা যায় মহেশ চৌধুরী কিছু একটা ভুলতে চাইছেন । কিন্তু, ভুলতে না পেরে মদের আশ্রয় নিচ্ছেন ।
তৃতীয় দৃষ্টান্তের অর্থ হল মহেশবাবুর বন্ধু অখিল চক্রবর্তী তাঁকে রাগ কমানোর জন্য ঘৃতকুমারীর তেল ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন । 
তবে এই কাহিনীতে অর্থগত বৈচিত্র্যের  সর্বোচ্চ নিদর্শনটি হল - " অগ্নির উপাসকের অসীম বদান্যতা । নবরত্ন বাঁদরের হিসেবে দু'হাজার পা । " এই হেয়ালির অর্থ সরাসরি ব্যাখ্যা না করে লেখক যেন পাঠকের উপর এর অর্থ খুঁজে বের করার ভার দিয়েছেন । শুধু কাহিনীর মাঝেমধ্যে জানিয়েছেন ' গিবন ' একরকমের বাদর এবং মহেশ চৌধুরীর ডাকটিকিট জমানোর নেশা থেকে মাঝে মাঝে গিবনসের ক্যাটালগ দেখতেন । কাহিনীর শেষে এসে জানা যায়, এই ক্যাটালগ থেকে এবং তাঁর জনৈক মক্কলে দোরাবজীর দেওয়া এক পুরোনো স্ট্যাম্প অ্যালবাম থেকে তিনি তিনটি মহাদেশের নটি দুষ্প্রাপ্য ( নবরত্ন)  ডাকটিকিট পান । গিবনসের ক্যাটালগের হিসেবে এর দাম ছিল দু'হাজার পাউন্ড ( দু'হাজার পা)। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য, দোরাবজী একজন পার্সি এবং পার্সিদের ' অগ্নির উপাসক ' বলা হয় ।

৩) শব্দের আক্ষরিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে হেঁয়ালি 
সমাদ্দারের চাবি গল্পটির শুরু হয় রাধারমণ সমাদ্দার নামের এক ধনী বৃদ্ধ প্রয়াত হওয়ার সূত্র ধরে। রাধারমণ বাবু পেশায় উকিল হলেও তাঁর ঝোঁক ছিল গান-বাজনার দিকে, তাই পয়সা ও পসার হয়ে গেলে তিনি ওকালতি ছেড়ে শুধু গান ও বাদ্যযন্ত্র সংগ্রহের দিকে মন দেন। সঙ্গীতের নেশা আর কৃপণস্বভাবের কারণে হাতেগোণা দুয়েকজন বাদে রাধারমণবাবুর সাথে কারোরই খুব একটা যোগাযোগ ছিল না, তাই তিনি মারা গেলে মণিমোহন সমাদ্দার নামের এক ভাইপোর হাতে তাঁর বিষয়-সম্পত্তির ভার এসে পড়ে। সদ্যপ্রয়াত কাকা যে যথেষ্ট ধনী ছিলেন, মণিমোহনবাবু তা জানতেন, কিন্তু কাকার ঘর তন্ন তন্ন করে খুঁজেও বাদ্যযন্ত্র ছাড়া আর কিছু খুঁজে না পেয়ে শেষ পর্যন্ত তিনি ফেলুদার শরণাপন্ন হন। অনুরোধটি অভিনব, তাই ফেলুদা হারানো টাকার হেঁয়ালী সমাধানে রাজি হয়, কিন্ত তাঁর ধারণা ছিলনা যে প্রয়াত রাধারমণের বুদ্ধি ও বর্তমান চরিত্রদের কার্যকলাপ রহস্যটিকে কতটা প্যাঁচালো করে তুলবে। রাধারমণের শেষ উক্তি ' আমার নামে চাবি ' যে আসলে octave এর আটটা সুরের key এবং রাধারমণের সমাদ্দার অর্থাৎ রে,ধা,রে,মা,ণি,সা,মা,দা,দা,রে  যে আসলে এই চাবিরই সংকেত, তা মননশীল পাঠকমাত্রকেই আকৃষ্ট করে । সংগীতশাস্ত্রে গভীর জ্ঞান থেকেই সত্যজিৎ এই ধাঁধাটি সৃষ্টি করেছিলেন ।  হেঁয়ালী যারা ভালবাসেন, তাদের জন্যে গল্পটি থেকে একটি লাইন তুলে দেই – “যার নামে সুর থাকে, তার গলায়ও সুর থাকে।” ফেলুদার কথায়- "ভেরি গুড। এবার রাধারমণবাবুর আশ্চর্য বুদ্ধির দিকটা ক্রমে বোঝা যাবে। যার নামে সুর থাকে। সাধনের নামটাই ধরা যাক। সাধন সেন। এবার অ-কার এ-কার বাদ দিয়ে কী দাঁড়ায় দেখা যাক স, ধ, ন, স, ন। অর্থাৎ গানের সুরের ভাষায় সাধা নিসা নি। এই আশ্চর্য ব্যাপারটা বোঝার সঙ্গে সঙ্গেই যেন একটা নতুন দিক খুলে গেল। “আমার নামে…চাবি।” রাধারমণবাবু কি এখানে নিজের নামের কথাটাই বোঝাতে চাচ্ছেন? রাধারমণ সমাদ্দার রে ধা রে মা নি সা মা দা দা রে! কী সহজ, অথচ কী ক্লেভার, কী চতুর! ধরণীধরও কিন্তু গাইতে পারত, আর তার নামেও দেখছি সুর – ধা রে ণি ধা রে সা মা দা দা রে !"

৪)  ইংরেজির মধ্যেই বাংলা
    'ছিন্নমস্তার অভিশাপ ' এ দেখা যায়, বাংলা শব্দকে তিনি কয়েকটি ইংরেজী অক্ষরের দ্বারা ব্যক্ত করেছেন । যেমন -
    মহেশ চৌধুরীর বাড়িতে গিয়ে ফেলুদারা একটা রুলটানা খাতার পাতা দেখতে পায়, তাতে সবুজ কালিতে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা কিছু, অর্থহীন ইংরিজি কথা। মিস্ট্রির কিছুই নেই; বাঝাই যাচ্ছে সেটা বাচ্চার হাতের লেখা, আর সেই কারণেই কথাগুলোর কোনও মানে নেই। যেমন–OKAHA, RKAHA, LOKC । পরে ফেলুদা আবিষ্কার করে যে মহেশবাবু আর তার নাতনি বিবি নিজেদের মধ্যে হেঁয়ালিতে কথা বার্তা বলতে পছন্দ করেন। তাই OKAHA হল "ও কে এইচে/এয়েছে", LOKC হল "এলোকেশী" । আবার ' AKLO ATBB BBSO ADK SO RO ADK SO AT KLO PC LO ROT OT DD OK OJT RO OG ' হল - "এ কে এল?  এটি বিবি । বিবি এসো । এদিকে এসো, আরো এদিকে এসো । এটি কে এল? পিসি এল। আর ওটি? ওটি দিদি । ও কে? ও জেঠি । আর ও? ও ঝি ।"

    ফেলুদাদের অভ্যর্থনা করে মহেশবাবু জিজ্ঞেস করেন, "হোয়ার ইজ দ্য ডেড বডি খুঁজে বার করতে অসুবিধা হয়নি তো?" যার অর্থ হল "কৈ লাশ" বা "কৈলাশ" খুঁজতে অসুবিধা হয়নি তো? এখানে কৈলাশ হল মহেশবাবুর বাড়ির নাম। 

    মহেশবাবুর বাড়িতে ফেলুদারা দেখে যে একটা চিতাবাঘের ছালের উপর বসে একটি বছর পাঁচেকের মেয়ে ডান হাতে একটা চিমটের মতো জিনিস নিয়ে বাঁ হাতে ধরা একটি বিলিতি ডলের ভুরুর জায়গায় এক মনে চিমটি কাটছে। বোধহয় পুতুলের ভুরু প্লক করা হচ্ছে। তোপসে ওর দিকে চেয়ে আছি বলেই বোধহয় মহেশবাবু বলেছিলেন, "ওটি আমার নাতনি; ওর নাম জোড়া মৌমাছি।" এর উত্তরে মেয়েটি বলে,"আর তুমি জোড়া কাটারি"। এর মধ্যেও ছিল হেঁয়ালি।   মহেশবাবুর নাতনি হলেন বিবি, আর মহেশবাবু তার দাদু। বিবি হচ্ছে Bee-Bee অর্থাৎ জোড়া মৌমাছি, আর দাদুকে অনেকক্ষেত্রে দাদা বা দাদাই বলা হয় তাই  "দা" হল কাটারি আর "দাদা" অর্থাৎ জোড়া কাটারি।

    আবার, মহেশ চৌধুরী তাঁর নাতনিকে বলা কথা, ' কী পাচ্ছি না, কী খুঁজছি ' র  ' কী ' যে আসলে চাবি (Key) তা লেখকের ভাষার প্রয়োগগত দক্ষতাকে পরিস্ফুট করে পাঠকের প্রসংশা দাবি করে ।


৫) শব্দের অর্থগত বৈচিত্রে নিয়ে হেঁয়ালি
'রয়্যাল বেঙ্গল রহস্য' এ শব্দের অর্থগত বৈচিত্রের চরম নিদর্শন পাওয়া গেছে একটি ধাঁধার অবয়বে । ধাঁধাটি হল -

"মুড়ো হয় বুড়ো গাছ
হাত গোন ভাত পাঁচ
দিক পাও ঠিক ঠিক জবাবে ।
ফাল্গুন তাল জোড়
দুই মাঝ ভুঁই ফোড়
সন্ধানে ধন্দায় নবাবে ।"

এর অর্থ হল প্রাচীন গাছ ( বুড়ো ), যার কাণ্ডটি মানুষের মুখের মতো ( মুড়ো ), তাঁর পঞ্চান্ন হাত ( ভাত= অন্ন, পাঁচ= পঞ্চ,  ভাত পাঁচ =  পঞ্চান্ন ) উত্তরে ( জবাবে ) অর্জুন ও তালগাছের মধ্যবর্তী জমি খুঁড়লে গুপ্তধনের সন্ধান পাওয়া যাবে । আবার, এই ধাঁধার সঙ্গে জড়িত কয়েকটি শব্দকে লেখক মহাভারতের কতগুলো চরিত্রের নামেও রুপায়িত করেছেন-
"তড়িৎবাবু এই প্যাডে বোধহয় অন্যমনস্কভাবেই কয়েকটা কথা লিখেছেন । এই যে দেখুন না - অর্জুন, কীচক, নারায়ণী, উত্তর, অশ্বত্থামা । এরা সবই তো মহাভারতের নাম । নারায়ণী হল কৃষ্ণের সেনার নাম । কীচক ছিল বিরাট রাজার শালা, আর উত্তর হল বিরাটের ছেলে, অভিমুন্যের শালা । " 
আবার, 'হত্যাপুরী' তে সত্যজিৎ শব্দের অর্থগত বৈচিত্র্যের দিকে লক্ষ রেখে ' ব্ল্যাকমেল '  কে বলেছেন ' কালোডাক ' ।  শব্দের এ ধরণের অর্থগত ও রূপগত বৈচিত্র্য লেখক হিসেবে সত্যজিতের দক্ষতাকেই প্রমাণ করে । এ প্রসঙ্গে সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর, ' এ বি সি ডি ' প্রবন্ধে বলেছেন, " বলতে কি অপরাধের জট খুলতে যে দক্ষতা তার চেয়েও অনেক বেশী উপভোগ্য তার কথার প্যাঁচ খুলে ফেলার দক্ষতা ।"

৬) abbreviation নিয়ে খেলা 
শব্দের আক্ষরিক বৈশিষ্ট্যের আর একটি অন্যতম অঙ্গ হল abbreviation এর প্রয়োগ। এই abbreviation এর মাধ্যমে লেখক ফেলুদাকে দিয়ে অনেক রহস্যের সমাধান করিয়েছেন । ' ভূস্বর্গ ভয়ংকর ' এ দেখা যায় রিটায়ার্ড জজ সিদ্ধেশ্বর মল্লিকের বেয়ারা প্রয়াগের ডানহাতে দুটি ইংরেজি অক্ষরের ' HR ' উলকি করা ছিল । এই সামান্য প্রমাণ টুকুর সাহায্যেই ফেলুদা বুঝেছিলেন, বেয়ারার নাম প্রয়াগ নয়, হনুমান রাউত । তাঁর একমাত্র পুত্রকে খুনের মামলায়, জজ সিদ্ধেশ্বর মল্লিক ফাঁসি দিয়েছিল । আর সে তারই প্রতিশোধ নিতে এসেছিল ।
আবার, মিঃ সরকারের আঙুলের আঙটিতে ' S ' অদ্যাক্ষরটি দেখে ফেলুদা সিদ্ধান্ত করেছিলেন, ইনি আসলে মনোহর সপ্রুর ছেলে, যে তার পিতার ফাঁসির বদলা নিতে মিঃ মল্লিককে খুন করেছিল ।

৭) সাংকেতিক ভাষার প্রয়োগ
সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদা সিরিজের গল্পগুলো খাঁটি ডিটেকটিভ গল্প উপন্যাসের পর্যায়ে পড়ে । তাই, গোয়েন্দা গল্পের নিয়ম মেনেই সত্যজিৎ শব্দ নিয়ে খেলা করার পাশাপাশি বেশ কিছু সাঙ্কেতিক ভাষাও সৃষ্টি করেছেন ।
এর একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন 'সোনার কেল্লা' তে পাওয়া যায় - 
"IP 1625 + U U-M"

'সোনার কেল্লা'তে লালমোহনবাবু সার্কিট হাউসের পিছনে যে কাগজের টুকরোটি উদ্ধার করে ফেলুদাকে দিয়েছিলেন,তাতে এটি লেখা ছিল । এটি আসলে ছদ্মবেশী ডাঃ হাজরার তাঁর সঙ্গী ভবানন্দকে দেওয়া বার্তা । এর অর্থ আমি বিকেলে ৪টা ২৫ মিনিটে পোকরান পৌঁছোচ্ছি, তুমি সেখানে এসে যোগ দাও । আর U-M এর অর্থ হল, তুমি মিত্তিরকে কাটাও । অবয়ববাদী শৈলীবিজ্ঞানে এই জাতীয় ভাষাকে ' হারমেনিউটিক কোড ' বলা হয় । 
'ছিন্নমস্তার অভিশাপ' এও এরকম দুটি কোডের নিদর্শন পাওয়া যায় । একটি হল - ' A:B:C ; 15.5.23 । এই কোডটি পাথরের উপর লেখা ছিল এবং সেই প্রসঙ্গে অখিল চক্রবর্তী ফেলুদাকে জানিয়েছেন - " পঞ্চান্ন বছর আগে ওই দিকেই একটা পাথরে আমি আমার নামের অদ্যাক্ষর আর তারিখ খোদাই করে রেখেছিলাম । " 
তবে, কাহিনীর রহস্য সমাধানে এই কোডটির কোনোরকম ভূমিকা পাঠকের নজরে আসে না । অবশ্য ' ২+৫ = x ' সংকেতটি রহস্য সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয় । এই সংকেতটিতে লেখক '২' বলতে মানুষের ষড়রিপুর দ্বিতীয় রিপু ক্রোধ ও ' ৫ ' বলতে পঞ্চম রিপু মদের কথা বলেছেন । এর দ্বারা লেখক বোঝাতে চেয়েছেন, মহেশ চৌধুরী তাঁর ক্রোধ ও মদ্যাসক্তির কারণে কোনো গর্হিত কর্ম করেছেন । কাহিনী অগ্রসরণের সঙ্গে সঙ্গে পরবর্তীকালে জানা যায়, মহেশ বাবু তাঁর ক্রোধের কারণে ও নেশার বশে দীনদয়ালকে হত্যা করে ।
৮) শব্দের মধ্যে সংখ্যা 
সংখ্যাও সত্যজিতের প্রিয় বিষয়, শব্দের মধ্যে সংখ্যাকে কীভাবে খুঁজে পাওয়া যায়, তার নিদর্শন পাওয়া যায় ' ঘুরঘুটিয়ার ঘটনা' তে । সেখানে দেখা যায় কালীকিঙ্কর মজুমদারের পোষ্য টিয়াপাখিটি সিন্দুকের চাবির সঙ্কেতস্বরুপ যে,  ' ত্রিনয়ন ও ত্রিনয়ন একটু জিরো ' হেঁয়ালিটি বলে, তা আসলে 39039820-র কথায় লেখা রুপ - ত্রিনয়ন (39) ও (0) ত্রিনয়ন ( 39 ) একটু (82)  জিরো (0) । ত্রিনয়নের ত্রি-টা হল তিন। আর নয়ন হল নাইন। দুইয়ে মিলে থ্রি-নাইন। ত্রিনয়ন ও ত্ৰিনয়ন হল ত্রি-নাইন-ও-থ্রি-নাইন। এখানে ও মানে জিরো অর্থাৎ শূন্য।
"কৈলাশে কেলেঙ্কারি" তে একটি গাড়ির নম্বর ফেলুদা মনে মনে বিড়বিড় করেছিল মনে রেখে দেওয়ার জন্য। ডব্লু এম এ ফাইভ থ্রি ফোর নাইন। তোপসে সেটাকে মনে রাখার জন্য বার বার পাঁতিচান, পতিচান, পতিচান আওড়ে নিয়েছিল। এটা আর কিছুই নয়–পাঁচ তিন চার আর নয়ের প্রথম অক্ষরগুলো দিয়ে তৈরি। নম্বর মনে রাখার দু-তিন রকম উপায় ফেলুদা শিখিয়ে দিয়েছিল তোপসেকে, তার মধ্যে এটা একটা অন্যতম উপায়।

৯) ধাঁধা ভেবে বিভ্রান্তি সৃষ্টি  
অনেক সময় সত্যজিৎ তাঁর ফেলুদা কাহিনীতে কোনো চিরকুটের লেখাকে ধাঁধা বা সংকেত হিসেবে বিভ্রান্ত করেছেন পাঠককে। হয়ত সারা কাহিনী জুড়ে পাঠক মাথার চুল ছিঁড়ে যাবে সেটির অন্তর্নিহিত অর্থ বের করতে কিন্তু কাহিনী শেষে জানা যাবে তাতে কোনো সাংকেতিক অর্থই নেই বরং সাধারণ নাম উল্লেখ করা হয়েছে তাতে।  অবশ্য কিসের নাম সেটা একটা বড় বিস্ময়।  এর উদাহরণ দেখা যায় "বোসপুকুরে খুনখারাপি" তে।  ফেলুদা একটি চিরকূট খুঁজে পায় খুন হয়ে যাওয়া ইন্দ্রনারায়ণের ঘর থেকে যাতে লেখা ছিল - 
       "HAPPY BIRTHDAY
        HUKUM CHAND"
কাহিনীশেষে জানা গেল "HAPPY BIRTHDAY” আর “HUKUM CHAND” রেসের মাঠের দুই ঘোড়ার নাম।  
১০) ট্রাঙ্ক কলের মধ্যে হেঁয়ালি
ট্রাঙ্ক কল মানেই ছোট করে বোধগম্য লেখা।  এখনকার পাঠক অবশ্য ট্রাঙ্ক কলের ব্যাপারে বিশেষ নাও জানতে পারে।  তবে যে সময়ে ফেলুদা কাহিনী লেখা সে সময়ে ট্রাঙ্ক কল অবশ্যই একটি জরুরী যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল।  "কৈলাশে কেলেঙ্কারি" কাহিনীতে মল্লিক বম্বে থেকে যে ট্রাঙ্ক কল পেয়েছিল সেটা জানাতে মিস্টার মুৎসুদ্দি ফোন করে জানায় ফেলুদাকে।  তাতে বলা ছিল- 
"মেয়ে শ্বশুরবাড়ি থেকে বাপের বাড়ি এসে গেছে। বাপ তাকে সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছে বিশ পঁচাত্তর। তাতে বম্বের লোক ইংরেজিতে বলে, ক্যারি অন। বেস্ট অফ লাক।"
তোপসে যদিও এর মাথামুন্ডু বুঝতে পারেনি এবং ফেলুদাকেই তা বুঝিয়ে দিতে হয়েছিল।   মেয়ে হল যক্ষীর মাথা, শ্বশুরবাড়ি হল সিলভারস্টাইন—যে মাথাটি কিনেছিল, আর বাপের বাড়ি হল মল্লিক—যার কাছে মাথাটা ছিল।
আসলে, সত্যজিৎ তাঁর ফেলুদা কাহিনীতে সমসাময়িক ও পূর্বসূরিদের গোয়েন্দা কাহিনীর Horror element এর যে অভাব, তা পূর্ণ করতে চেয়েছেন গল্পের স্ট্রাকচারে শব্দ ও সংকেতের নানারকম খেলা দিয়ে । যার ফলে এখানে suspense এর পাশাপাশি পাঠকের উপরি পাওনা হয় মগজের খেলা । আর এখানেই সত্যজিৎ রায় ছেলেবুড়ো সবার মন জয় করতে সফল হয়েছেন।  শুধু ভয় পাওয়ার বা থ্রিলার পড়ার জন্য কেউ ফেলুদা পড়বে না বরং ফেলুদা কাহিনীর মধ্যে দিয়ে সমস্ত বাঙালি পাঠক নিজেদের কোনো সত্বাকে খোঁজার চেষ্টা করে। ফেলুদা-তোপসে-জটায়ু রা তাই এত বছর পরেও সবার একান্ত আপন।  
তথ্যঋণ/ কৃতজ্ঞতা- ফেলুদা সমগ্র (আনন্দ পাবলিশার্স), প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত, ঋদ্ধি গোস্বামী।
 

Archive

Most Popular