প্রতিবেদন
সুস্মিতা মিত্র
...যে জাতির কোনো ইতিহাস নেই, সেই জাতির কোনো ভবিষ্যৎ ও নেই!"
বাংলা সাহিত্য জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ১২৫ তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে, তার লেখা ঐতিহাসিক উপন্যাস সমগ্রের চরিত্রদের প্রিয় রান্না নিয়ে আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য।
শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, জন্ম ১৮৯৯ এর ৩০ শে মার্চ, মৃত্যু ১৯৭০ এর ২২ শে সেপ্টেম্বর। উত্তরপ্রদেশের জৌনপুর শহরে মাতুলালয়ে তার জন্ম। বাবা তারাভূষন বন্দ্যোপাধ্যায়, মা বিজলীপ্রভা দেবী। আদিনিবাস কলকাতার বরাহনগর এলাকায়। শরদিন্দু বাবুর স্কুলশিক্ষা মুঙ্গেরে। ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করার পর ভর্তি হন কলকাতার বিদ্যাসাগর কলেজে। তাঁর রচিত প্রথম সাহিত্য প্রকাশিত হয় ২০ বছর বয়েসে, ২২ টি কবিতার সংকলন নিয়ে 'যৌবন স্মৃতি'। ১৯২৬ সালে পাটনা থেকে আইন পাশ করার পর ওকালতি জীবন শুরু হলেও মন পড়ে থাকে সাহিত্য চর্চায়। ১৯২৯ এ ওকালতি ছেড়ে পাকাপাকিভাবে সাহিত্য কেই জীবিকা রূপে গ্রহণ করেন। ১৯৩২ এ আত্মপ্রকাশ করে বিখ্যাত গোয়েন্দা চরিত্র ব্যোমকেশ বক্সী। ৪ বছরে ব্যোমকেশ কে নিয়ে ১০ টি গল্প লেখার পর, ১৯৩৮ সালে মুম্বাইয়ের বম্বে টকিজে চিত্রনাট্যকার রূপে কাজ শুরু করেন।
ব্যোমকেশ ছাড়াও ' ভূতান্বেষী বরদা' চরিত্র টিও তার অসাধারণ এক সৃষ্টি। এছাড়াও তার সৃষ্ট কিছু অমর রচনার মধ্যে রয়েছে কালজয়ী কিছু ঐতিহাসিক উপন্যাস। সেই ঐতিহাসিক কাহিনীর প্রেক্ষপট এবং বর্নিত চরিত্রদের প্রিয় রান্না নিয়ে আমাদের এই বিশেষ নিবেদন।
গৌরমল্লার
গ্রামের নাম বেতসগ্রাম। এক প্রান্তে ভগ্নপ্রায় একটিমাত্র মন্দিরের পুরোহিত চাতক ঠাকুর। আরাধ্য দেবতা শাক্যমুনি এবং শ্রী বিষ্ণু। দেবস্হানে ফুল নিবেদন করবেন বলে দক্ষিণের বিলে জল পদ্ম আনতে গিয়ে সাথে করে আনলেন পাতার চাঙরে মোড়া একমুঠো মৌরলা। নিজে নিরামিষাশী ব্রাক্ষ্মন, বাচ্চা মেয়ে রঙ্গনার হাতে মাছগুলো ধরিয়ে বললেন, 'মাকে বলিস টক রাঁধতে '..
মৌরলার টক
কী কী লাগবে
মৌরলা মাছ, কাঁচা তেঁতুল, গুড়, সরষে, শুকনো লঙ্কা, নুন, হলুদ গুঁড়ো, সরষের তেল
কীভাবে বানাবেন
মাছগুলো নুন হলুদ গুঁড়ো মেখে ভেজে তুলে নিন। সরষে, শুকনো লঙ্কা ফোড়ন দিন। কাঁচা তেঁতুল, গুড়, নুন, হলুদ গুঁড়ো অল্প জল দিয়ে ফুটতে দিন। ভাজা মাছ দিয়ে ২-৩ মিনিট রান্না করে নামিয়ে নিন।
তুমি সন্ধ্যার মেঘ
বিক্রমপুর থেকে ত্রিপুরীতে নৌকাপথে সস্ত্রীক যাত্রা করছেন যুবরাজ জাতবর্মা, উদ্দেশ্য শ্যালিকা যৌবনশ্রীর সয়ম্বর। পাশের ময়ূরপঙ্খী নৌকায় রয়েছেন পাটুলিপুত্রের যুবরাজ বিগ্রহপাল আর তার বন্ধু অনঙ্গ। পরিচয় পর্বের পর, জাতবর্মা কে নৌকায় আমন্ত্রণ জানিয়ে নিজের মায়ের হাতের কচুরি আর ক্ষীরের লাড্ডু জলযোগ করতে দেন বিগ্রহপাল।
মুগডালের কচুরি
কী কী লাগবে
মুগডাল, ময়দা, দেশী ঘি, নুন, চিনি, আদা কাঁচালঙ্কা বাটা, হিং, কাজুবাদাম কিশমিশ, সাদা তেল অথবা ডালডা
কীভাবে বানাবেন
ময়দা, নুন, চিনি, ঘি দিয়ে ময়ান দিয়ে পরিমাণ মতো ঠান্ডা জল দিয়ে মেখে ঢেকে রাখুন। কড়াইতে ঘি গরম করে মুগডাল ভেজে, একে একে আদা কাঁচালঙ্কা বাটা, নুন, হলুদ গুঁড়ো, হিং, চিনি দিয়ে নেড়েচেড়ে কাজুবাদাম কিশমিশ কুচি মেশান। নামিয়ে ঠাণ্ডা করুন। ময়দার লেচি কেটে তাতে পুর ভরে কচুরি গুলো বানিয়ে নিন। ডুবো তেলে খুব অল্প আঁচে ভেজে তুলে নিন।
ক্ষীরের লাড্ডু
কী কী লাগবে
খোয়া ক্ষীর, নারকেল কোরা, চিনি, কুচোনো বাদাম, ঘি, এলাচ গুঁড়ো
কীভাবে বানাবেন
নারকেল কোরা আর চিনি পাক দিন। খোয়া ক্ষীর মিশিয়ে ভালো করে নেড়েচেড়ে নামিয়ে নিন। অল্প ঠান্ডা হলে বাদাম কুচি আর এলাচ গুঁড়ো মেশান। হাতে ঘি মেখে লাড্ডু গুলো গড়ে নিন।
সদাশিব
শিবাজীকে নিয়ে পাঁচটি গল্প নিয়ে লেখা সদাশিব অভিযানের দ্বিতীয় গল্প 'সদাশিবের অগ্নিকাণ্ড' গল্পে আদিলশাহ তোর্না দূর্গ দখল করতে ৭০০০ সৈন্য পাঠান। দূর্গ রক্ষা করতে এক অভূতপূর্ব মতলব বের করেন শিবাজী। ছাগল পালকের ছদ্মবেশে সদাশিব হাজির হয় বীজাপুরি সৈন্যদের ঘাঁটিতে। খিদে পেয়েছে বলে কাঁদতে থাকায়, সেনাপতি লিয়াকত খানের নির্দেশে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় বাবুর্চিখানায়। সেখানে গিয়ে রাশিকৃত কোফতা কালিয়ার বদলে নিরামিষাশী মারাঠা যুবক সদাশিব খেতে চায়, 'বাজরার রুটি আর তেঁতুলের চাটনি'।
বাজরার রুটি
কী কী লাগবে
বাজরার আটা, নুন, গরম জল, ঘি
কীভাবে বানাবেন
আটা, নুন আর ঘি দিয়ে ময়ান দিয়ে নিন। অল্প অল্প গরম জল ঢালুন আর মাখতে থাকুন। ঢেকে রাখুন ঠান্ডা হওয়া পর্যন্ত। লেচি কেটে হাতের সাহায্যে চেপে চেপে রুটি গুলো বানিয়ে নিন। সেঁকে নিয়ে ওপরে ঘি মাখিয়ে তেঁতুলের চাটনির সঙ্গে পরিবেশন করুন।
শিবাজী যে কাজে পাঠিয়েছিলেন তা সম্পূর্ণ করে তোর্না দূর্গে ফিরে আসার পর মা জিজাবাঈ সদাশিবের কাছে জানতে চান, সে কি খেতে চায়। উত্তরে সদাশিব বলে 'দুধি হালবা' অর্থাৎ লাউয়ের পায়েস।
লাউয়ের পায়েস
কী কী লাগবে
গ্রেট করা লাউ, চিনি, দুধ, খোয়া ক্ষীর, কাজুবাদাম কিশমিশ, ঘি
কীভাবে বানাবেন
ঘিতে কাজুবাদাম কিশমিশ ভেজে তুলে নিন। গ্রেট করা লাউ দিয়ে ভাজুন। দুধ আর চিনি দিয়ে ফুটতে দিন। বেশ ঘন হলে খোয়া ক্ষীর আর ভেজে রাখা কাজুবাদাম কিশমিশ মিশিয়ে নামিয়ে নিন।