19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

চক্ষুদান কেন মহালয়ার আগে হয় না?

প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিনিধি


দুর্গাপূজা বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব। দেবী দুর্গার মূর্তি তৈরির প্রক্রিয়াটি কেবল শিল্প নয়, বরং গভীর আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্যে ভরা। এই মূর্তি নির্মাণের একটি বিশেষ ধাপ হলো চক্ষুদান অর্থাৎ দেবীর চোখ আঁকা। শিল্পী মূর্তিকে রূপ দেন, সাজান, কিন্তু দেবীকে প্রাণ প্রতিষ্ঠার প্রথম ধাপ শুরু হয় চক্ষুদান দিয়ে। আর আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই চক্ষুদান মহালয়ার আগে কখনও হয় না। কেন এমন নিয়ম, তার উত্তর লুকিয়ে আছে পুরাণ, আধ্যাত্মিক বিশ্বাস এবং শতাব্দীপ্রাচীন রীতিনীতির মধ্যে।

মূর্তি গড়ার শেষ পর্বে শিল্পী দেবীর চোখ আঁকেন। এটিকেই বলা হয় চক্ষুদান বা চোখ দেওয়া। শিল্পীর কাছে এটি নিছক রঙ-তুলি চালানো নয়, বরং দেবীকে প্রাণ সঞ্চার করার আচার। বিশ্বাস করা হয়, চোখ আঁকা শেষ না হওয়া পর্যন্ত মূর্তিটি কেবল মাটির শরীর, কিন্তু চক্ষুদানের সঙ্গে সঙ্গেই দেবী সেখানে বিরাজ করেন। এই জন্যই চক্ষুদান অত্যন্ত পবিত্র আচার হিসেবে গণ্য হয়। অনেক কারিগর চোখ আঁকার সময় ভোরের আলোয় নদীর ঘাটে যান, স্নান করে পবিত্র শরীরে চোখ আঁকেন। আবার কেউ কেউ মন্ত্রপাঠ করে হাতে তুলি ধরেন। মহালয়া হলো দেবী পক্ষের সূচনা। এদিন থেকে পিতৃপক্ষের অবসান ঘটে এবং শুরু হয় দেবীপক্ষ। মহালয়ার ভোরে গঙ্গাস্নান, পিতৃতর্পণ ও দেবী বন্দনার মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গাকে মর্ত্যে আহ্বান জানানো হয়। বাঙালির মনে মহালয়া মানেই দেবী আগমনের বার্তা। মহিষাসুরমর্দিনী রেডিও সম্প্রচার থেকে শুরু করে গঙ্গার ঘাটে তর্পণ সবই দেবী আগমনের এক পবিত্র পূর্বলক্ষণ অতএব, মহালয়া হলো দেবী আগমনের দ্বারোদ্ঘাটন। এর আগে দেবীকে মূর্তিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করার আচার শুরু করা শাস্ত্রসম্মত নয়।

পুরাণ অনুযায়ী, দেবী দুর্গা দেবলোক থেকে মর্ত্যে আসেন দেবীপক্ষের সূচনাতেই। মহালয়ার আগে তিনি দেবলোকে বিরাজমান। তাই মহালয়ার আগে মূর্তিতে দেবীর উপস্থিতি আনা যায় না। চক্ষুদান যেহেতু দেবীকে প্রাণ প্রতিষ্ঠার আচার, তাই সেটি মহালয়ার আগে হলে অর্থ দাঁড়ায় দেবীকে আগে ডেকে আনা হচ্ছে—যা শাস্ত্র অনুযায়ী অনুচিত। মহালয়ার পরেই দেবীপক্ষ শুরু হয়, আর তখনই দেবীকে স্বাগত জানানোর সঠিক সময়।

চোখ হলো প্রাণের দর্পণ। চোখ দিয়েই সত্তা প্রকাশিত হয়। মানুষের চোখে যেমন জীবনশক্তি ফুটে ওঠে, তেমনই দেবীর চোখ আঁকার মাধ্যমে তাঁর জীবন্ত রূপ প্রকাশিত হয়।
মহালয়ার আগে চোখ আঁকা মানে হলো প্রাণ প্রতিষ্ঠার আচারকে সময়ের আগেই সম্পন্ন করা। এটি শুধু শাস্ত্রবিরোধী নয়, আধ্যাত্মিকভাবেও অসম্পূর্ণ। কারণ মহালয়ার আগে দেবীপক্ষ শুরু হয় না, তাই দেবী তখনও মর্ত্যে অবতীর্ণ হন না।

গ্রামবাংলার বহু জায়গায় এখনও বলা হয়, মহালয়ার আগে চক্ষুদান করলে দেবী রুষ্ট হন। লোকজন বিশ্বাস করেন, এটি করলে পূজায় অমঙ্গল ঘটতে পারে। তাই কারিগররা মহালয়ার আগে সর্বোচ্চ মূর্তির শরীর ও সাজসজ্জার কাজ শেষ করলেও চোখ আঁকার কাজ রাখেন মহালয়ার পরেই। অনেক জায়গায় মহালয়ার সকালে কারিগররা বিশেষ আচার পালন করে দেবীর চোখ আঁকেন। এই সময় অনেক দর্শকও উপস্থিত থাকেন এবং তাঁরা মনে করেন, দেবী মূর্তিতে জীবন্ত রূপ পেলেন সেই মুহূর্তে।

শিল্পীরা বলেন, চক্ষুদানের সময় তাঁদের হাতে যেন এক রহস্যময় শক্তি ভর করে। অনেকেই চোখ আঁকেন না সাধারণভাবে, বরং আয়নার প্রতিফলনে বা উল্টো দিকে বসে আঁকেন। বিশ্বাস করা হয়, দেবীর চোখে সরাসরি তাকিয়ে আঁকা অনুচিত কারণ তা অত্যন্ত শক্তিশালী। এই সব রীতি চক্ষুদানকে শুধু একটি শিল্প নয়, বরং এক অদ্ভুত আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা করে তুলেছে। আজকের দিনে বাণিজ্যিক পূজার মণ্ডপে সময়ের চাপ বাড়লেও মহালয়ার আগে চক্ষুদান না করার নিয়ম এখনও অটুট। বড় বড় ক্লাবও শিল্পীর এই ঐতিহ্য মান্য করে। হতে পারে মণ্ডপসজ্জা আগে শেষ হয়ে যাচ্ছে, কিংবা আলোকসজ্জা আগে শুরু হচ্ছে, কিন্তু চোখ আঁকার ক্ষেত্রে কেউ নিয়ম ভাঙতে সাহস পান না। কারণ এটি শুধু সংস্কৃতি নয়, মানুষের বিশ্বাস ও ভক্তির সঙ্গে জড়িত।

চক্ষুদান মহালয়ার আগে হয় না, একধরনের প্রতীকও বটে। এটি বোঝায়, সবকিছুরই সঠিক সময় আছে। অগ্রহ করে কিছু করলে তা অসম্পূর্ণ হয়। দেবীকে আহ্বান জানানোর জন্য সময়ের শৃঙ্খলা মানা জরুরি। অতএব, চক্ষুদান মহালয়ার আগে না করা মানে হলো সময় ও নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন। চক্ষুদান কেবল একটি শিল্পরীতি নয়, বরং বাঙালি সংস্কৃতির অন্তর্নিহিত বিশ্বাস, আধ্যাত্মিকতা ও শাস্ত্রসম্মত নিয়মের প্রতিফলন। মহালয়ার আগে দেবীকে চোখ দেওয়া হয় না, কারণ তখনও তিনি দেবলোকে। মহালয়ার দিনেই শুরু হয় দেবীপক্ষ, তাই চক্ষুদানও সেই দিন বা তার পরেই করা হয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় আলো আসারও সঠিক সময় আছে, দেবীর আগমনও নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে হয়। আর সেই নিয়ম মানার মধ্যেই লুকিয়ে আছে ভক্তির সৌন্দর্য।

Archive

Most Popular