19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

আসছে বছর আবার হবে! দেবীর বিদায়ের ক্ষণে কেন বলা হয় বারবার?

প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিনিধি


বাংলার দুর্গোৎসব কেবলমাত্র একটি ধর্মীয় আচার নয়, এটি এক অদ্ভুত সাংস্কৃতিক ও আবেগঘন মিলনমেলা। ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত চলতে থাকা এই উৎসবের প্রতিটি মুহূর্ত আনন্দ, ভক্তি আর মিলনের রঙে ভরা। কিন্তু দশমীর সিঁদুর খেলা, দেবীর বিসর্জনের শঙ্খধ্বনি আর ঢাকের তাল যখন ম্লান হতে থাকে, তখনই বাঙালির হৃদয়কে ছুঁয়ে যায় এক গভীর বেদনা বিদায়ের বেদনা। এই মুহূর্তে মুখে আসে একটাই অমোঘ বাক্য:
আসছে বছর আবার হবে! কিন্তু কেন বলা হয় এই কথাটি? কেন বিদায়ের বেদনায় ভরা মানুষ এই একটি বাক্যেই খুঁজে পায় আশার আলো? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ছুঁতে হবে বাঙালির সংস্কৃতি, ইতিহাস, বিশ্বাস এবং সমষ্টিগত মানসিকতার মূলে।

দশমীর দিন দেবী দুর্গার প্রতিমা যখন গঙ্গার জলে বিলীন হয়, তখন বাঙালি ভক্তেরা বিশ্বাস করেন মা আসলে কৈলাসে ফিরে যাচ্ছেন, স্বামী মহাদেবের কাছে। এটি বিদায় হলেও স্থায়ী নয়। কারণ, আবার এক বছর পর তিনি আসবেন, আবার ঘর আলো করবেন, আবার শোনা যাবে ঢাকের বাদ্যি। তাই বিদায়ের সুরের মধ্যে বাঙালি প্রতিজ্ঞা করে এ আনন্দ চিরকাল বেঁচে থাকবে, আসছে বছর আবার ফিরে আসবে।

বাংলা সংস্কৃতিতে মৃত্যুও যেমন শেষ নয়, তেমনি বিদায়ও কখনো স্থায়ী নয়। জন্ম-মৃত্যু, আনন্দ-বেদনা, আগমন-বিসর্জন সবকিছুই এক চক্রে আবর্তিত। দেবীর বিদায় তাই এক শূন্যতার শুরু নয়, বরং পুনরাগমনের আশা। এই বিশ্বাস থেকেই গড়ে উঠেছে আসছে বছর আবার হবে ধ্বনি। এটি কেবল আধ্যাত্মিক সান্ত্বনা নয়, বরং জীবনের চক্রাকারে ফিরে আসা আনন্দের প্রতি আস্থা। দুর্গাপুজো বাঙালির জীবনে কেবল পূজা নয়, বরং এক বিরাট সামাজিক উৎসব। পাড়ায় পাড়ায় প্যান্ডেল, বন্ধুরা মিলে রাতভর আড্ডা, নতুন জামা, রেস্তোরাঁয় খাওয়া সব মিলিয়ে এটি এক সম্মিলিত আনন্দোৎসব। দশমীতে যখন সব শেষ হয়ে যায়, তখন এই মিলনের সমাপ্তি মানুষকে দুঃখ দেয়। তখনই উচ্চারিত হয় সেই প্রতিশ্রুতি আসছে বছর আবার হবে। এটি আসলে সেই সামাজিক বন্ধনকে টিকিয়ে রাখার প্রত্যয়, যা বাঙালিকে একত্রে বেঁধে রাখে।

হিন্দু শাস্ত্রে দুর্গা হলেন শক্তি, মা, রক্ষাকর্ত্রী। প্রতি বছর তাঁর আগমন মানে অশুভ শক্তির বিনাশ, শুভ শক্তির জয়। তাই মা যখন বিদায় নেন, তখন মানুষ বিশ্বাস করে এই জয় চিরকালীন, আবারও তিনি আসবেন অশুভের বিনাশ ঘটাতে। তখনই মুখে আসে আসছে বছর আবার হবে। এটি আসলে মানুষের চিরন্তন বিশ্বাস সৎ সর্বদা ফিরে আসে, মঙ্গল সর্বদা অশুভকে পরাজিত করে। দশমীর সিঁদুর খেলা বা প্রতিমা বিসর্জনের মুহূর্তে যেভাবে নারী-পুরুষ, ছোট-বড়, ধনী-গরিব নির্বিশেষে একসাথে কাঁদে, সেভাবেই আবার সবাই আশায় বুক বাঁধে। এই আবেগই জন্ম দেয় সেই বিখ্যাত উক্তির আসছে বছর আবার হবে। এটি কেবল দেবী-ভক্তির কথা নয়, বরং সমষ্টিগত আনন্দকে আগামীতে ফিরিয়ে আনার এক সাংস্কৃতিক আকাঙ্ক্ষা।

বাংলার সাহিত্য, গান, সিনেমা সব জায়গাতেই এই উক্তির ছাপ রয়েছে। বহু কবি ও লেখক বিদায়ের বেদনায় লিখেছেন, কিন্তু সেই লেখার মধ্যেও ফুটে উঠেছে “আসছে বছর আবার হবে”র আশাবাদ। যেমন, পল্লব সেনের কবিতায়, বা পুজোর গানগুলোতে এই আবেগের ছোঁয়া পাওয়া যায়।
এমনকি সিনেমায়ও বিসর্জনের দৃশ্যে এই বাক্যকে ব্যবহার করা হয়েছে যা প্রমাণ করে, এটি কেবল ধর্মীয় উক্তি নয়, বরং সাংস্কৃতিক এক চেতনা।

আজকের ব্যস্ত নাগরিক জীবনে দুর্গাপুজো এক বিরল অবকাশ। পরিবার-বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো, নতুন জামা কেনা, রাতভর প্যান্ডেল হপিং সবকিছুতেই আধুনিক মানুষ খুঁজে পায় নতুন করে বাঁচার আনন্দ। তাই পুজো শেষ হলে, এক বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষার সূচনা হয়। আসছে বছর আবার হবে যেন এই অপেক্ষার সান্ত্বনা, যা মানুষকে উৎসবের টানে টিকিয়ে রাখে। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, বিদায়ের মুহূর্তে মানুষ যদি আশার আলো না খুঁজে পায়, তবে হতাশায় ডুবে যায়। দুর্গোৎসবের মতো বড় উৎসব শেষ হলে সেই শূন্যতাকে পূরণ করে এই উক্তি। আসছে বছর আবার হবে আসলে এক ধরনের পজিটিভ রিইনফোর্সমেন্ট, যা বাঙালির মনে তৈরি করে আশা, আনন্দ আর বেঁচে থাকার উচ্ছ্বাস।

পৃথিবীর নানা উৎসবে বিদায়ের সময় মানুষ এ ধরনের আশাবাদী উক্তি ব্যবহার করে। যেমন জাপানে মাতসুরি উৎসব শেষে মানুষ বলে আগামী বছর আবার দেখা হবে। ইউরোপে কার্নিভাল শেষে মানুষ আবারও প্রতিশ্রুতি দেয়, আগামী বছর আরও বড় করে উদযাপন করবে। তেমনি বাংলার দুর্গোৎসবের শেষে “আসছে বছর আবার হবে” বাঙালির সংস্কৃতিকে এক সার্বজনীন ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করে। আসছে বছর আবার হবে এটি কেবলমাত্র একটি জনপ্রিয় উক্তি নয়, এটি বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক প্রতীক। এতে রয়েছে বিদায়ের বেদনাকে আনন্দে রূপান্তর করার অসাধারণ ক্ষমতা। এতে রয়েছে আগামী দিনের আশা, জীবনের প্রতি বিশ্বাস, ভক্তির উচ্ছ্বাস এবং সমষ্টিগত আনন্দকে বাঁচিয়ে রাখার প্রতিজ্ঞা।

দশমীর দিন যখন মা দুর্গা বিদায় নেন, তখন চোখে জল আসলেও এই উক্তি মানুষের ঠোঁটে ফুটে ওঠে, কারণ বিদায় মানেই শেষ নয়, বরং পুনর্মিলনের অপেক্ষা। এভাবেই যুগে যুগে বাঙালি বলে এসেছে, এখনও বলছে, আর ভবিষ্যতেও বলবে

আসছে বছর আবার হবে!

Archive

Most Popular