প্রতিবেদন
পূর্বা সেনগুপ্ত
এককোণে ছোট্ট একটি ঘর, সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে, পাশে বয়ে যাওয়া সুরধুনী গঙ্গার জল ছায়ার ঘোমটায় আরও গভীর, অতলস্পর্শী। এক শোকাতুর হৃদয় আজ দক্ষিণেশ্বরে রানি রাসমণির কালী মন্দিরে উপস্থিত হয়েছেন। অন্তর বিক্ষুব্ধ, জীবন আর মৃত্যুর মধ্যস্থলে দাঁড়িয়ে আছেন। প্রতি মুহূর্তে জীবন হননের ইচ্ছা তীব্র জাগছে, কিন্তু তাঁকে পাহারা দিচ্ছেন তাঁরই এক বন্ধু। তিনিই তাঁকে টেনে এনেছেন কালীবাড়ির আঙিনায়। মন্দির, উদ্যান, বহমান গঙ্গা- সবকিছুর দর্শন শেষে এসে দাঁড়িয়েছেন একটি ঘরের সম্মুখে। পরবর্তী কালে মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত বিশেষ এই ক্ষণটি বর্ণনায় বলেছেন, সন্ধে হয় হয়-সুতরাং সন্ধ্যাকালীন ধুনোয় ঘরটি টি পরিপূর্ণ, বাইরের বারান্দায় বৃন্দে ঝি দাঁড়িয়ে। তৎকালের বিদগ্ধ সেই সেই বৃন্দে ঝিকে জিজ্ঞাসা করছেন, আচ্ছা, উনি কি খুব পড়েন-টড়েন? বৃন্দে ঝির সাবলীল উক্তি, আর বাবা বই-টই, সব ওর মুখে! অত্যন্ত আশ্চর্য হয়ে সেই শ্রীমুখ উচ্চারিত এ যুগের শ্রুতি শ্রবণের আকাঙ্ক্ষায় শোকতপ্ত মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত প্রবেশ করলেন ছোট্ট ঘরটিতে। এ শুধু একটি ঘরে প্রবেশ নয়, একটি জীবনদর্শনের, এক নবীন আলোকের, এক মৃত্যুঞ্জয়ী ভাবনার স্রোতে নিজেকে নিমজ্জিত করলেনসেই মুহূর্তে। মৃত্যুকে জয় করে অমৃত আহরণ করলেন তিনি। শুরু হল নতুন এক ধর্মগ্রন্থ রচনার শুভক্ষণ। যে অমৃতে তিনি নবজীবন লাভ করেছিলেন, সেই অমৃত তিনি বিতরণ করলেন আবিশ্ব মানবজাতির কাছে। সৃষ্টি হল শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃতঃ শ্রীম কথিত।
কাজী নজরুল ইসলাম কথামৃত প্রসঙ্গে বলেছিলেন, কলির নববেদ একাধারে ভাগবত ও গীতা। মাস্টার মশাই এই কলির নববেদ রচনা করেছিলেন বাইবেলের রচনা ভঙ্গীর আঙ্গিকে। প্রতিদিন দিনলিপি বা ডায়েরি লেখার একটা অভ্যাস তাঁর ছিল। সেই অভ্যাসেই তিনি দক্ষিণেশ্বর যা শুনতেন তাই লিখে রেখেছিলেন এবং অজান্তেই সৃষ্টি হয়েছিল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ এ সাহিত্য। অধ্যাপক বিনয় সরকার লিখেছিলেন, রামকৃষ্ণ কথার বেপারি। এই কথাগুলিই মানুষকে চাঙ্গা করিয়া তুলিতেছে। দুনিয়ার নরনারীকে বাঁচাইয়া রাখিতে, বাড়াইয়া তুলিতে, বাড়তির পথ দেখাইয়া দিতে এই কথাগুলির ক্ষমতা অসীম। রামকৃষ্ণের কথাগুলিই বিপুল অমৃত। দরিদ্রের কুটিরে এবার অবতারের আগমন। তাই শ্রীরামকৃষ্ণ সাধারণ মানুষের ভাষা কথায় বলছেন, ব্যবহার করেছেন পারিপার্শ্বিক পরিবেশ থেকে তুলে আনা খুব তুচ্ছ বিষয়কে উপমা রূপে। এ উপমা অনবদ্য, অতুলনীয় তার আবেদন। এ এক মৌলিক সাহিত্য, জীবনধর্মী উপদেশ, ভাললাগার অনুভূতিতে ডুবে যাওয়া। শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত প্রসঙ্গে সৈয়দ মুজতবা আলি বলেছেন, প্রাচীনকালে মহাকবি কালীদাসকে বলা হতো উপমার সম্রাট, কিন্তু এ যুগে উপমার সম্রাট হলেন শ্রীরামকৃষ্ণ। তিনি লিখছেন, এঁর মতো সরল ভাষায় কেউ কখনও কথা বলেননি। এঁর ভাষার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সাদৃশ্য খ্রিস্টের ভাষা ও বাক্যভঙ্গির। আমাদের দেশের এক আলঙ্কারিক বলেছেন, উপমা কালীদাসস্য।... আমার মনে হয় উপমাবৈচিত্রে পরমহসংদেব কালিদাসকেও হার মানিয়েছেন।... ইংরেজিতে একটা প্রবাদ আছে তাঁর জাঁতায় যাই ফেল না কেন, ময়দা হয়ে বেরিয়ে আসে। সময় মতো ঠিক সেটি উপমার আকার নিয়ে বেরিয়ে আসবে। নিজের সাধনলব্ধিকে জনমানসের কাছে পৌঁছে দিতে শ্রীরামকৃষ্ণ এমন সব বাক্য ব্যবহার করেছেন যা শুনলে অবাক হতে হয়। ব্যবহার করেছেন লোককথা, লোকগান, জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একেবারে ঘরোয়া বিষয়। ঈশ্বরকে ডাকবে কীভাবে?
কেবল মন্দির, মসজিদ বা পূজার আসনে? না, সর্বক্ষণ, সর্বদা। তারপরেই উপমার প্রয়োগ, যেন আটপৌরে শাড়ি। যে-শাড়ি মহিলারা ঘরের কাজে সর্বক্ষণ ব্যবহার করেন-সেই শাড়ির মতো সর্বক্ষণের সঙ্গী হবেন ঈশ্বর। তিনি পূজার পর সমাদরে তুলে রাখার বিষয় নন। তিনি আমাদের চিরসাথী, চিরসখা। গভীরপ্রসঙ্গ তুলে আনতে এমন শব্দ, বাক্য ব্যবহার করেছেন যা আজ আমাদের লোকজীবনের সঙ্গে জড়িয়ে মিশিয়ে একাকার হয়ে গিয়েছে। হয়তো আমরা সেই শব্দের উৎস জানি না, কিন্তু ব্যবহার করি। যেমন ফোঁস করতে হয়, হাতি নারায়ণ মাহুত নারায়ণ রামের ইচ্ছা- আরও কত কী! লোক ব্যবহার শেখাতে একটি কাহিনি শোনাচ্ছেন শ্রীরামকৃষ্ণ, একটি বিষধর সাপ মাঠের ধারে থাকত, যে যেত তাকেই কামড়াত, লোকে ভয়ে। সেইস্থান পরিহার করে চলত। এক সাধু সেই সাপকে মন্ত্র দিয়ে অহিংসা পালনে উপদেশ দিলেন। সাপটিও গুরুর নির্দেশ পালন করতে লাগল, আর কামড় দেয় না, ফণা তোলে না, ছুটে তাড়াও করে না। ছেলেরা সুযোগ পেয়ে তাঁকে ঢিল মেরে ক্ষতবিক্ষত করে তুলল। একবছর পর সেই সাধু পুনরায় সেই স্থানে এলেন, তাঁর আহ্বানে সাপটি বেরিয়ে এল। সাপের করুণ দশা দেখে সাধু উপদেশ দিলেন, ধূর বোকা, কামড়াতে বারণ করেছি কিন্তু ফোঁস করতে তো বারণ করিনি! আত্মরক্ষার জন্য ফোঁস করতে হয়। এক আশ্রমে গুরুদেব সকলকে প্রবচন দিলেন, প্রতি জীবের মধ্যে আছেন নারায়ণ। তাই প্রতি জীবে দয়াভার রাখতে হয়। প্রবচনের পর আশ্রমস্থ শিষ্য নগরের দিকে ভিক্ষার জন্য উপস্থিত হয়েছে। হঠাৎ চারিদিক থেকে চিৎকার, সরে যাও পাগলা হাতি আসছে। উন্মত্ত হাতির উপর মাহুত উচ্চৈঃস্বরে সাবধান করে চলেছেন সকলকে, সকলেই সরে যাচ্ছে। আশ্রমবাসীর কানেও গিয়েছে সেই কথা, তিনিও সরে যেতে গিয়েছিলেন। কিন্তু হঠাৎ তাঁর গুরুদেবের কথা মনে হল। আজই যে শুনেছেন, সকলের মধ্যে রয়েছেন ঈশ্বর- তাই যদি পাগলা হাতির মধ্যেও তিনিই আছেন। তাই শিষ্য সেই উন্মত্ত হাতির সম্মুখে করজোড়ে বসে পড়ল। হাতি তাকে গুঁড়ে পেঁচিয়ে ছুড়ে ফেলে দিয়ে চলে গেল। সকলে ছুটে এসে শুশ্রূষা করলে জ্ঞান হল শিষ্যের। গুরু জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি হাতিকে উন্মত্ত দেখেও সরে গেলে না কেন? আপনি যে বলেছিলেন সকলের মধ্যে নারায়ণ আছেন! হাতির মধ্যেও তো নারায়ণ ছিলেন! গুরু উত্তর দিলেন, তুমি হাতি নারায়ণের কথা শুনলে আর তার উপরে যে মাহুত নারায়ণ তোমায় নিষেধ করছিল তার কথা শুনলে না কেন? একদম প্রাকটিক্যাল উদাহরণ। অকাট্য যুক্তি। উপমার কথনেও অনবদ্য ভঙ্গিমা। প্রমথনাথ বিশীও সৈয়দ মুজতবা আলির মতো শ্রীরামকৃষ্ণের উপমায় আপ্লুত হয়েছেন। তিনি বলছেন, কথামৃতের উপমা, সে এক আশ্চর্য জিনিস। আমি উপমার গদীর মালিকের (অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) কাছে বছরের পর বছর কাটিয়েছি। উপমার ঐশ্বর্য কাকে বলে জানি। উপমা আমার কাছে সহজে আসে। কিন্তু কথামৃতের উপমা আমকে চমকে দেয়-এ কীকাণ্ড তিনি করে গেছেন। আগে জেনেছি উপমা কালিদাসস্য, পরে বলছি, উপমা রবীন্দ্রনাথস্য, এখন বলছি, উপমা রামকৃষ্ণস্য।
বাদুড়বাগানে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছেন শ্রীরামকৃষ্ণ। বিদ্যার সাগরকে বললেন, খাল বিল ছেড়ে এবার সাগরে এলাম! এসেছেন যখন তখন কিছু লোনা জল খেয়ে যান।
-সে কিগো, তুমি যে দয়ার সাগর।
-ভগবান কাউকে শক্তি কম কাউকে শক্তি বেশি দিয়েছেন?
-নিশ্চয়ই, নইলে তোমাকে দেখতে আসি কেন, তোমার কি দুটো সিং বেরিয়েছে? এ সাহিত্য রসে পুষ্ট কথোপকথন শেষ হল না। শ্রীরামকৃষ্ণ বিদ্যাসাগরকে জিজ্ঞাসা করলেন, আচ্ছা বলো তো কোন জিনিস উচ্ছিষ্ট হয়নি? এমন কি বিষয় আছে যা মুখ দিয়ে বর্ণনা করা হয়নি? বিদ্যাসাগর বহু চিন্তা করেও উত্তর দিতে অক্ষম হলেন।
এবার শ্রীরামকৃষ্ণের পালা। অনায়াসে বললেন, ব্রহ্ম উচ্ছিষ্ট হয়নি। ব্রহ্ম যে কি তা মুখে বলা যায়নি। বিদ্যাসাগর উত্তর দিলেন, আজ এক নতুন কথা শুনলুম। আগে-পিছে সবই নতুনভাবে প্রাচীনকে উপস্থাপিত করা। শাস্ত্র বলে যিনি ব্রহ্ম উপলব্ধি করেন তিনি মুখে তার অনুভূতির কথা ব্যক্ত করতে না-পেরে একটা বিচিত্র শব্দ করে মাত্র, হা-বু হা-বু। এ উপলব্ধি ব্যাখা করা যায় না, মুখ দিয়ে উচ্চারিত করা সম্ভব নয়। তাই এই উপলব্ধি কি রকম? শ্রীরামকৃষ্ণ যে উপমা ব্যবহার করছেন তা শাস্ত্রে উচ্চারিত মুকআস্বাদনবৎ শব্দটির মতো। মুককে আস্বাদনের কথা জিজ্ঞাসা করলে সে উত্তর দিতে অক্ষম। তাই শ্রীরামকৃষ্ণ বললেন, ঘি যেমন ঘি তেমন। ঘি কেমন তা কি করে বোঝানো যাবে? ঘির এর স্বাদ ঘি-এরই মতন!
স্বয়ং স্বামীজি ঠাকুরের ভাষা সম্বন্ধে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলছেন, ঠাকুরের বাঙলাভাষা ভারী চমৎকার। একেবারে পিওর, খুব আর্ট আছে। যে ভাষায় তিনি কথা বলতেন সেই গ্রাম্য ভাষাতেই তিনি প্রকাশ করছেন সেই আর্ট। গভীর তত্ত্বকে বোধগম্যের জন্য হাতের মুঠোয় ধরা নানা উপমা। ভক্তদের কাছে বলছেন, লুনের ছবি (লবণের পুতুল) সমুদ্র মাপতে গিয়েছিল। কত গভীর, কত জল তাই খপর দেবে। খপর দেওয়া আর হল না। যাই নামা অমনি গলে যাওয়া। কে আর খপর দিবেক! কিন্তু ঈশ্বর উপলব্ধির কথা তো শাস্ত্রে বলা হয়েছে। তবে সেই বর্ণনার রূপ কি? শ্রীরামকৃষ্ণ বলছেন, বেদে, পুরাণে যা বলেছে- সে কিরকম বলা জান? একজন সাগর দেখে এলে কেউ যদি জিজ্ঞাসা করে, কেমন দেখলে, সে লোক মুখ হাঁ করে বলে, ও! কি দেখলুম! কি হিল্লোল! ব্রহ্মের কথাও সেই রকম।
১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দের ৯ মার্চ, শ্রীরামকৃষ্ণ ভক্তদেরবলছেন, আমি একবার মিউজিয়ামে গিয়েছিলুম, তা দেখালে ইট, পাথর হয়ে গেছে, জানোয়ার পাথর হয়ে গিয়েছে। দেখলে সঙ্গের গুণ কি। তেমনি সর্বদা সাধুসঙ্গ করলে তাই হয়ে যায়। উপমার প্রয়োগ দেখে মণি মল্লিক সহাস্যে বললেন, আপনি ওখানে একবার গেলে আমাদের ১০/১৫ বৎসর উপদেশ চলত। শ্রীরামকৃষ্ণ সহাস্যে উত্তর দিলেন-, কি উপমার জন্য? সকলের হাস্য।
উপমা আর উপমা। ভক্তেরা স্বীকার করেছেন, শ্রীরামকৃষ্ণ হেসেছেন। যেখান দিয়ে, যে পথ দিয়ে গিয়েছেন তাই আধ্যাত্মিক উপমা রূপে ব্যবহৃত হয়েছে। নিজের গ্রামের হালদার পুকুর, গ্রামের মেয়ের ঢেঁকিতে ধান ভানা, বেড়াল ছানার মায়ের উপর নির্ভরতা, আলের উপর পিতার হাত ধরে লাফ, মেছুনির হাতের গহনা দেখিয়ে মাছ বিক্রি, ধানের ক্ষেতে ঘোষের জল, সদ্য স্বামী হারা নারীর নাকের নৎ-টি সযত্নে খুলে নিয়ে স্বামীর উপর আছড়ে পড়ে কান্না! আঁশচুবড়ির গল্প-সবই ব্যঙ্গ করে উপমা হয়ে পরিবেশিত হয়েছে। রসিকরাজ আরও সুমধুরভাবে ব্যক্ত করেছেন মানুষের মনের মধ্যে নানা বাঁকে লুকিয়ে থাকা নানা অহঙ্কার, লোভ, মোহ, মাৎসর্যকে। শাস্ত্রজ্ঞানে গর্বিত এক পণ্ডিতের কাহিনি বলছেন শ্রীরামকৃষ্ণ, নৌকা করে কয়জন গঙ্গা পার হচ্ছিল, তার মধ্যে একজন পণ্ডিত তার অধীত বিদ্যার বর্ণনা দিচ্ছিল আপাত মূর্খ মাঝির কাছে। মাঝি তুমি বেদান্ত জান, সাংখ্য, পাতঞ্জল, ষড়দর্শন জান? মাঝি মাথা নাড়ে, না কিছুই জানি। না। এমন সময় ঝড় উঠল, নৌকা টলমল। ডুবে যায় আর কি! এবার মাঝির প্রশ্ন পণ্ডিতকে, আপনি কি সাঁতার জানেন? -না তা তো জানি না! মাঝি বলে আমি শাস্ত্র না-জানি কিন্তু সাঁতার জানি। বহু জানার ভিড়ে আমাদের ভবসাগর থেকে মুক্তির উপায় অজানা থেকে যায়। শেষে। ডুবে মৃত্যু ব্যতীত আর কিছুই করার থাকে না। একের পিছনে শূন্য থাকলে তার মূল্য বৃদ্ধি পায়, কিন্তু শুধু শূন্য যতই সংখ্যায় বাড়িয়ে যাও তার কিছু মূল্য বৃদ্ধি পায় না। শূন্যে শেষ শূন্যের মধ্যেই। শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর উপমার তীব্র কষাঘাতে জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য স্মরণ করিয়ে দেন। আর সে কষাঘাত করার পদ্ধতিই হল গল্প, কাহিনি, কথকতা-আর সেখানেই প্রযুক্ত হয়েছে অসাধারণসাহিত্য সুষমার। একদিন নরেন্দ্রনাথকে বলেন, মনে কর এক খুলি রস আছে, তুই মাছি হয়েছিস, তা কোনখানে বসে রস খাবি? নরেন্দ্র উত্তর দিলেন, আমি খুলির কিনারায় বসে মুখ বাড়িয়ে খাব।... বেশি দূরে গেলে ডুবে যাব আর প্রাণ হারাব। ঠাকুর সহাস্যে উত্তর দিলেন, সে যে সচ্চিদানন্দ সাগর। এই সাগরে সে ভয় নাই যে, অমৃতের সাগর, ওই সাগরে ডুব দিলে মৃত্যু হয় না। মানুষ অমর হয়।এখানে স্মরণে রাখা জরুরি, শ্রীরামকৃষ্ণের সাহিত্যসৃষ্টি খাতার পাতায় অবিশ্রান্ত কলম চালানোর মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়নি। এক্ষেত্রে বৃন্দে ঝির কথা সর্বাগ্রে স্মরণীয়, সবই ছিল তাঁর মুখে। তিনি মুখে মুখে সাহিত্য এঁকেছেন। একটু তোতলা ছিলেন, তাই বর্ণনার মধ্যে মিষ্টত্ব সৃষ্টি হত আর তা অপরূপ হয়ে উঠত তাঁর শব্দ চয়নে ও বিষয় পর্যবেক্ষণে।
শ্রীরামকৃষ্ণ বলছেন,
একটি মেয়ের স্বামী এসেছে, অন্য অন্য সমবয়স্ক ছোখরাদের সঙ্গে বাইরের ঘরে বসেছে। এদিকে ওই মেয়েটিও তার সমবয়স্কা মেয়েরা জানলা দিয়ে দেখছে। তারা বরটিকে চেনে না- ওই মেয়েটিকে জিজ্ঞাসা করছে, ওইটি কি তোর বর? তখন সে একটু হেসে বলছে, না। আর একজনকে দেখিয়ে বলছে, ওইটি কি তোর বর? সে আবার বলছে, না... শেষে তার স্বামীকে লক্ষ্য করে জিজ্ঞাসা করলে, ওইটি তোর বর? তখনও হে হাঁও বললে না, নাও বললে না-কেবল একটু ফিক্করে হেসে চুপ করে রইল। তখন সমবয়স্করা বুঝলে যে, ওইটি তার স্বামী। -এ এক গ্রাম্য ছবি। কিন্তু কি কারণে ব্যবহার করলেন, নেতি নেতি করে ব্রহ্মে কি করে পৌঁছান যায় তারই ক্রম। প্রথমেসব না, শেষে আনন্দ উপলব্ধিতে ব্রহ্মরূপ প্রতিভাত।
ঐতিহাসিক ঈশারাউড কথামৃত সম্বন্ধে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন, কথামৃতের মধ্যে আছে নাউনেশ। এই গ্রন্থে তাৎক্ষণিক যুগ প্রয়োজন প্রতিফলিত হয়েছে। বাস্তব জীবন, বাস্তব প্রসঙ্গ সবই কথামৃতকে চিরনবীন করে তুলেছে। তাই একশো বছর আগে মানুষ যে আগ্রহ নিয়ে কথামৃত পাঠ করেছে, এখনও সেই আগ্রহ ভাল লাগা নিয়ে কথামৃতের বিষয়ে পাঠ করেন মানুষ।
শ্রীরামকৃষ্ণ বলছেন, অনন্ত মত, অনন্ত পথ তিনি বলছেন যত মত ততপথ- কারো একগুঁয়ে মানসিকতা সম্বন্ধে শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছেন, মতুয়ার বুদ্ধি- এই সবই আমাদের বর্তমান জীবনের অতি ব্যবহৃত শব্দ। কিন্তু এই শব্দ চয়ন করেছিলেন দক্ষিণেশ্বরের সেই ব্রাহ্মণ। যিনি আবিশ্ব মানবসমাজকে উদ্দেশ্য করে শুনিয়েছিলেন, মাইরি বলছি, ভগবান আছেন।দিয়েছিলেন মানুষ হওয়ার আহ্বান মান সম্বন্ধে যাঁর হুঁশ আছে সেই-ই মানুষ। আশীর্বাদ করেছিলেন, তোমাদের চৈতন্য হোক।