19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

অন্ন ই পরম ব্রক্ষ্ম, অন্ন ই ঈশ্বর, অন্নকূটের আয়োজনে..

প্রতিবেদন

সুস্মিতা মিত্র


অন্নের পাহাড়, অন্ন কূট, বিগ্রহের সামনে নিবেদিত ভোগ বিলিয়ে দেওয়া হচ্ছে হাজার হাজার ভক্তদের মধ্যে। হিন্দু ধর্মে, অতিথি মানেই নারায়ণ। কত ভাগ্য করলে বাড়িতে অতিথি আসে। আমাদের শিক্ষা সংস্কৃতি এই যে বাড়িতে কেউ এলে আমরা তাকে খালি হাতে ফেরাই না। ভিক্ষা প্রার্থী সেও দরিদ্র রূপে স্বয়ং নারায়ণ। সাধ্যমত তার সেবা, এটাই আসলে ঈশ্বরের সেবা। নর নারায়ণ সেবা। ভক্তের ভগবান নাকি ভগবানের ভক্ত এই ভাবনাকে নিয়েই অন্নকূট। শ্রীকৃষ্ণ ব্রজবাসীকে রক্ষা করতে হাতে তুলে নিয়েছিলেন গিরি গোবর্ধন আর ব্রজবাসীরা তাদের প্রিয় নন্দলালা অভুক্ত থাকবেন এই চিন্তায় এত খাবার জড়ো করেছিলেন যে তার আকার হয়েছিল পাহাড়সম। এমনই এক অপূর্ব গাঁথাকে মনে রাখতে প্রতি বছর আয়োজন করা হয় অন্নকূট মহোৎসবের। দুবেলা দুমুঠো জোটে না এমন কত মানুষ পেটপুরে খেতে পান, এখানেই স্বার্থকতা। ভক্তের খুশিতেই ভগবান তুষ্ট। অন্নকূট মহোৎসবের মূলমন্ত্র তো এটাই।

 সর্ব ধর্মান পরিত্যাজ মা মে কং স্মরণং ভজ

-একথার আলোকে শরতের ঠিক মাঝামাঝি কার্তিক মাসে ব্রজবাসীরা এক বিশেষ অনুষ্ঠানের অয়োজন করেন, যা গিরি গোবর্ধন পূজা ও অন্নকূট মহোৎসব নামে খ্যাত। হিসেবমতো কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের প্রতিপদ তিথিতে অর্থাৎ  দীপাবলির পরের দিন এই উৎসব পালিত হয়।

অন্নকূট কী?

অন্ন কূট অর্থাৎ অন্নের পাহাড়। একাধিক অন্ন অথবা শস্যের মিশ্রণই হল অন্নকূট। চালের বিভিন্ন রকম পদ, ডাল, সবজি, মিষ্টান্ন একসঙ্গে সাজিয়ে এমনভাবে পরিবেশন করা হয়, দেখে মনে হবে যেন বিশাল এক পাহাড়।  নিয়ম অনুযায়ী, অন্নকূটের প্রসাদ পৃথক পৃথক বিতরণ করা হয় না। বরং সমস্ত প্রসাদ একসঙ্গে মিশিয়ে সকলকে বিতরণ করতে হয়। 

কেন পালন করা হয় অন্নকূট উৎসব?

পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী, ব্রজবাসীরা দেবরাজ ইন্দ্রের পুজো করতেন। সে প্রসঙ্গে নন্দ মহারাজ বলেন, বৈশ্য গোপ জাতি। কৃষি এবং গো-পালন আমাদের জীবিকা। গো-পালনের জন্য আমাদের ঘাসের প্রয়োজন। চাষের জন্য বৃষ্টি চাই। আর ইন্দ্র হলেন বৃষ্টির দেবতা। তাই আমরা দেবরাজ ইন্দ্রের পূজা করি।

তখন শ্রীকৃষ্ণ বলেন, সমুদ্রের মাঝেও বৃষ্টি হয়। সেখানে কেউ ইন্দ্র পূজা করেন না। আমাদের জীবিকা গো-পালন। গাভী বর্ধনের জন্য আমরা গিরি গোবর্ধনের কাছে ঋণী। ইন্দ্রের কাছে নয়। চলো আমরা গিরি গোবর্ধনের পূজা করি।

এতে ক্ষুব্ধ হন দেবরাজ ইন্দ্র। শুরু হয় প্রবল বর্ষণ। তখন শ্রীকৃষ্ণ গিরি গোর্বধনকে নিজের কড়ে আঙুলে তুলে ধরেন, তার নীচে আশ্রয় পান ব্রজবাসী। এবং ইন্দ্রের ভয়ঙ্কর বজ্রের আঘাত নিজ অঙ্গে ধারণ করেন গোর্বধন। মোট সাতদিন এইভাবে গিরি গোবর্ধনকে নিজের বামহাতের কড়ে আঙুলে তুলে রেখেছিলেন শ্রীকৃষ্ণ। তাই তিনি গিরিধারী। এই সাতদিন ধরে নন্দরাজ গিরি গোবর্ধনের পূজা করতে থাকেন এবং প্রতিদিন অষ্টভোগের (প্রতি প্রহরে একটি করে ভোগ। সেই অনুযায়ী অষ্টপ্রহর অর্থাৎ একদিনে অষ্টভোগ) হিসাবে ৭×৮= মোট ৫৬ রকম ভোগ নিবেদন করেন তাঁকে। যাতে অন্নসহ ছিল নানাবিধ পদ। যদিও পাহাড় দেবতায় রূপান্তরিত কখনওই হননি। বিভিন্ন শাস্ত্রে বর্ণিত, স্বয়ং গিরিধারী কৃষ্ণই গোবর্ধনের রূপ ধারণ করে এই ভোগ গ্রহণ করেছিলেন। 

এই বিশ্বাস থেকেই প্রতিবছর কার্তিক মাসের শুক্লা প্রতিপদ তিথিতে শ্রীকৃষ্ণ পূজিত হন গোবর্ধনরূপে। তাঁকে ৫৬ রকম ভোগ নিবেদন করে অন্নকূট মহোৎসব পালন করা হয়। নীলাচলের জগন্নাথদেবকে বলা হয়, অচল ব্রহ্ম। তিনি অবশ্য রোজই এই ৫৬ প্রকার ভোগ পেয়ে থাকেন।

ঈশ্বর পরমব্রক্ষ্ম। ঈশ্বরের প্রকাশ সর্ব জীবে, সর্বত্র। এই ভাবনাকে মাথায় রেখে দেশের অন্যান্য মন্দিরেও অন্নকূট মহোৎসবের আয়োজন করা হয়।

ব্যারাকপুর অন্নপূর্ণা মন্দির:

রানি রাসমণির কন্যা জগদম্বা ১৮৭৫ এ ব্যারাকপুর তালপুকুরের অন্নপূর্ণা মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। ওই মন্দিরে অন্নকূট উৎসব হয় অন্নপূর্ণা পুজোর দিনে। ওই দিন সকালে মূল পুজো, কুমারীপুজো ও হোমের পরে হয় অন্নকূট। একুশ কিলোগ্রাম চালের ভাত-সহ ৫১ রকম পদ দেওয়া হয় ভোগ হিসেবে।

শ্যামপুকুর বলরাম ঘোষ স্ট্রিটের ভট্টাচার্য বাড়ি:

শ্যামপুকুরের বলরাম ঘোষ স্ট্রিটের বাড়িতে অন্নপূর্ণা মূর্তি ও শ্রীধর (শালগ্রাম শিলা) স্থাপন করেন ভূপতি ভট্টাচার্য। এবাড়িতে অন্নকূট উৎসবে ১১৫ রকম রান্না করা পদ ও ১২০ রকম মিষ্টান্ন ভোগ দেওয়া হয়। এবাড়ির অন্নকূটের বিশেষত্ব হলো, এখানে কোনোরকম জাতিভেদ মানা হয় না। যে কোনও বর্ণের মানুষ এসে ভোগ রান্না করতে পারেন।

বাগবাজার নববৃন্দাবন মন্দির 

বাগবাজার নববৃন্দাবন মন্দিরেও পালিত হয় অন্নকূট মহোৎসব। কড়ুই পরিবার প্রতিষ্ঠিত এই মন্দিরের অন্নকূটের এবছর ৮৪ তম বর্ষ। মোটামুটি ৩০০ রকমের ভোগ নিবেদন করা হয় এখানে। শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং এখানে অবস্থান করেন ভাতের চূড়ার উপরে। 

রানিগঞ্জ বাজার বারোয়ারি পুজো উৎসব ও সেবা সমিতি 

মোটামুটিভাবে ৪১ বছর ধরে এখানে অন্নকূট উৎসব পালন হয়ে আসছে। বাহান্ন রকম ভোগ দেওয়া হয় এই পুজোয়। ২৫-৩০ প্রকারের ভাজা, পোলাও, ভাত, চাটনি, পায়েস এবং অনেক প্রকারের মিষ্টি থাকে ভোগে।

মদনমোহনতলার মদনমোহন ঠাকুরবাড়ি:

১৭৬১তে গোকুলচন্দ্র মিত্র তাঁর এক বিঘারও বেশি জায়গা নিয়ে তৈরি বাড়ির দোতলায় কুলদেবতা মদনমোহন-এর জন্য দরবার কক্ষ তৈরি করেন। একতলায় তৈরি করেন ঠাকুরদালান ও নাটমন্দির। কার্তিক মাসের শুক্লা-প্রতিপদ তিথিতে নাটমন্দিরে অনুষ্ঠিত হয় অন্নকূট উৎসব। প্রায় ৪০০ কিলোগ্রাম চালের ভাত-সহ ১৫৭ রকম পদ তৈরি হয়। পুজো শেষে ভক্তদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া হয় ওই অন্নভোগ।

সোনারপুর কালী শিবগুরু মঠ:

সোনারপুর খড়িগাছি অঞ্চলের কালী শিবগুরু মঠে অনুষ্ঠিত হয় অন্নকূট উৎসব। উৎসবের দিন পিতলের পরাতে প্রায় আড়াই মণ চালের ভাত দেওয়া হয় ভোগ হিসেবে। চুড়ো করে সাজানো ভাতের গায়ে সব্জি দিয়ে কালীর মুখ আঁকা হয়। সঙ্গে থাকে ১৫৫ রকমের নিরামিষ পদ।

Archive

Most Popular