সাহিত্য
কমলেন্দু সরকার
জায়গাটি ভারী সুন্দর। এখনও গ্রামের পরিবেশ বিদ্যমান।
বিজলিবাতি দু চারটে বাড়িতে থাকলেও সবাই নিয়ে উঠতো। পারেননি। গ্রামের পাশ দিয়ে তিরতির করে বয়ে চলেছে ছোট্ট একটি নদী। হালকা জঙ্গলও আছে গ্রামের কিনারে। সবমিলিয়ে প্রকৃতি এখানে অপূর্ব মায়াবী। গ্রামের নামটিও বেশ। ছায়াময়।
গ্রামের মাঝে রয়েছে একটি চন্ডীমণ্ডপ। সেখানে সন্ধে হলেই গ্রামের বড়রা প্রায় সবাই হাজির হন। এখানেই মহড়া চলে যাত্রাপালার। গ্রামের সবচেয়ে ধনী বিলাস বটব্যাল সাংস্কৃতিক ব্যাপারে প্রচুর সাহায্যটাহায্যও করেন। ইদানীং একটা ব্যাপারে গ্রামের ছোট-বড় সকলেই খুব চিন্তায়। কেউই আর রাত আটটার পর বাইরে থাকতে চাইছেন না। চন্ডীমণ্ডপও ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে সত্বর। কারণ, আটটা বাজলেই ভূতের উপদ্রব দেখা দিচ্ছে। ভূতটি কারওর গলা না-টিপলেও, হঠাৎ হঠাৎ মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়ছে। মাঝেমধ্যে এটা-ওটা চাইছেও। দুএকজনের মানিব্যাগও ছিনিয়ে নিয়েছে রাত আটটার ভূত। শেষ ট্রেনে অনেকেই শহর। থেকে ফেরেন। স্টেশন গ্রাম থেকে মাইলখানেক দূরে। এখন রিকশাও কেউ চালাতে চাইছে না ভূতের ভয়ে। ঘাড় মটকানোর ভয় দেখিয়ে রিকশা চেপে গ্রাম ঘোরাতে বলেছে কয়েকজনকে। সেই ভয়ে রাত আটটার আগেই রিকশা তুলে দিচ্ছে। টোটোও কেউ চালাচ্ছে না। গ্রামের ডাকাবুকো রতন মিস্ত্রি সাহস করে টোটো চালাতে গেছিল, তাকে নাকের জলে চোখের জলে করে ছেড়েছিল ওই ভূত: রবন নাককান মুলেছে ভূতকে আর ভড়কাতে যাবে না।
প্রতিদিনের মতো লাস্ট ট্রেনের প্যাসেঞ্জার ধরার জন্য রতন টোটোটা লাগিয়েছিল স্টেশনের বাইরে। সে শুনলো লাস্ট ট্রেন আসতে ঘণ্টাখানেক দেরি হবে। রতন অন্ধকারে গাড়িটা রেখে একটু সুখনিদ্রা দেবে বলে চোখ বুজল। কিছুক্ষণ পর ধড়ফড়িয়ে উঠল। কেউ তার নাকে নসা আর কানে পাখির পালক দিয়ে সুড়সুড়ি দিল। চারিদিক অন্ধকার। শুধু স্টেশনের টিমটিমে আলোটা জ্বলছে। আশপাশে একটা লোকও নেই। ভয় পেল রতন। রাত আটটার ভূতের কথা জানে। রাতের তারার আলোয় রতন দেখলো, কিছুটা দূরে আখখেতের ধারে বেঢপ চেহারার একজন কেউ দাঁড়িয়ে। চোখ দুটো লাল হয়ে জ্বলছে। অনেকটা কালী ঠাকুরের পাশে দাঁড়ানো ডাকিনী-যোগিনীদের মতন। রতনকে সেদিন হরিপদদা বর্ণনা দিয়েছিলেন বটে রাত আটটার ভূতের চেহারার। রতনের মতো। সাহসী আর দুবার না ভেবে টোটো নিয়ে সোজা ধাঁ, একেবারে বাড়ি। বাড়ি ফিরে মাকে বলল, রাতে আর কিছু খাব না। রতন তার ঠাকুমার কাছে শুনেছিল, ভয় পেলে রাতে খেতে নেই। শরীর খারাপ করে।
এই রাত আটটার ভূতকে প্রথম দেখেন গ্রামের। নামী সেকরা হরিপদ কর্মকার। মাসখানেক আগে হরিপদ সেকরা শহরে গেছিলেন কিছু গয়নার ডেলিভারি নিতে। ফিরতে লাস্ট ট্রেন হয়ে গেছিল। সেদিন জনা চার-পাঁচ নেমেছিলেন ছায়াময় স্টেশনে। তার মধ্যে দু জন স্টেশনের ওপারে বাসিন্দা। আরেকজনের বাড়ি স্টেশনের কাছেই। বাকি রইল হরিপদ সেকরা আর ভূষণ ভাণ্ডারি।
ওরা দুজন আবার সাপে-নেউলে। অথচ পাশাপাশি বাড়ি। দুজনের কেন যে মুখ দেখাদেখি বন্ধ তা খোলসা করে গ্রামের কেউই জানেন না। কেউ কেউ বলেন অবশ্য, একবার নাকি গ্রামের। যাত্রাপালা বধ হল বংশীর প্রধানের পার্টটা ভূষণকে লেঙ্গি মেরে হরিপদ বাগিয়ে নিয়েছিলেন। ভূষণের পেটখারাপের সংবাদটা পালাকার। পরিচালক গুড়গুড়ে গুছাইতের কানে তুলেছিলেন হরিপদই। তিনি বলেছিলেন, ভূষণ বোধহয় পার্টটা করতে পারবে না, তার হাতের জলই শুকোচ্ছে না। বাড়িতে গামছা পরেই বসে আছে। আগামী দুচার দিনের মধ্যে এ-তল্লাটে তাকে দেখা যাবে না।
গুড়গুড়ে গুছাইত দুবার না-ভেবে ভূষণের পার্টটা হরিপদকেই দিয়েছিলেন। শেষমেশ ভূষণ পেয়েছিলেন বধ হল বংশী যাত্রাপালায় কাটা সৈনিকের পার্ট। তাই ট্রেন থেকে নেমে ভূষণ ভান্তারি হনহন করে হাঁটা দিয়েছিলেন। হরিপদর আবার হাঁপানির টান আছে। হোমিয়োপ্যাথ ডাক্তার বগলাচরণ কুন্ডুর বারণ তাড়াহুড়ো না করতে।
ধীরেসুস্থে যেতে যেতে হঠাৎই রাত আটটার ভূতের মুখোমুখি হরিপদ সেকরা। ওইরকম কদাকার কুৎসিত চেহারা দেখেননি কোনওদিন হরিপদ।ভূতটা খপ করে হরিপদ সেকরার পাঞ্জাবিটা তুলে। ট্যাঁকের গেজে থেকে গয়নাগুলো হাতিয়ে নিল। ভূতের নখের আঁচড়ে কেটে গেছে, তাই জ্বালা উপশমের মলম লাগিয়ে দিয়েছিল ওই ভূত। গয়নাগুলো ছিল হরিপদর বউ শশীমুখীর। পুরনো গয়না ভেঙে নতুন গয়না গড়াতে দিয়েছিল। শোনা যায়, পরদিন এই সংবাদ শুনে ভূষণ ভাণ্ডারি তুলসীতলায় হরিরলুট দিয়েছিল।
রতনের সঙ্গে কথা হয়েছিল শাড়ি-ব্লাউজের কারবারি সত্য সাহার, তাঁকে স্টেশন থেকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার। স্টেশনে নেমে বাইরে বেবিয়ে দেখেন রতন নেই, তার টোটোও নেই। অগত্যা হরিশা হাট থেকে কেনা শাড়ি-ব্লাউজের গাঁটরি মাথায় চাপিয়ে রওনা দিলেন সত্য বাড়ির দিকে। সভা সাহা নিজের মনে গজগজ করতে করতে বাড়ির দিকে হাঁটা দিলেন। যেই না আখের খেত পেরিয়েছেন, অমনি রাত আটটার ভূতের মুখোমুখি। সেই বেঢপ চেহারা নিয়ে পথ আটকে দাঁড়িয়ে ভূত। সত্য সাহা মাথার গাঁটরি ফেলে পড়িমরি করে ছুট দিলেন বাড়ির দিকে। আগে নিজের প্রাণ বাঁচুক তারপর বাবসা।
রাত আটটার ভূতের জন্য সবচেয়ে অবস্থা খারাপ ছিঁচকে ছিরুর। কোনওরকমে দুবেলা খাওয়া জুটছে তার। ছেলে-মেয়ে দুটোকে স্কুল ছাড়িয়ে পঞ্চায়েতের অবৈতনিক পুণ্ডরীকাক্ষ বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়েছে। এর জন্য ছিঁচকে ছিরুকে প্রচুর কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। ছিরু ছিঁচকে চোর বলে সারা গ্রামে খ্যাতি আছে। তবে বড় কিছু নয়, এ-বাড়ি সে-বাড়ি থেকে লুঙ্গি, শাড়ি, গেঞ্জি, জামা, বাসনপত্র চুরি করে তার সংসার চলে। ছিরু অবশ্য বলে, সে ঠিক চুরি করে না, না বলে চেয়ে নিয়ে আসে। ছিঁচকে ছিরুর এমন অবস্থা দেখে গ্রামের সকলেই ঠিক করেছে তার সংসারের সাহায্যার্থে একটা যাত্রাপালা করবে। টিকিটের বিক্রয়লব্ধ অর্থের পুরোটাই ওই পালার দিন ছিচকে ছিরুর হাতে তুলে দেবেন পঞ্চায়েত প্রধান কালীধন কয়াল। চন্ডীমণ্ডপে সভার সিদ্ধান্ত হল প্রতিবারের মতো পালা লিখবেন এবং পরিচালনা করবেন গুড়গুড়ে গুছাইত। গুড়গুড়ের ছিল পাটালির নেশা। সারা বছরের পাটালি এনে মাটির পাত্রে বুলিয়ে রাখেন ওপরে। একতাল পাটালি নিয়ে বসে পড়ল পালা লিখতে। প্রথমেই ঠিক করলেন এবার হাসির পালা হবে। তাই পালার নাম হল ভূতের ভয়ে ছিঁচকে পালালো।
গুড়গুড়ে ঠিক করলেন রাত জেগে পালা লিখবেন। লেখা শেষ হলে চণ্ডীমণ্ডপে পালা পাঠ করা হবে। সেদিনই কে কোন চরিত্রটা করবে তা ঠিক হবে। গুড়গুড়ে ঠিকই করেছেন ছিঁচকের ভূমিকা ছিরুই করবে। সে নাকি একসময় রামযাত্রা করত। লক্ষ্মণের চরিত্র করতে গিয়েই গ্রামের একটি মেয়ের সঙ্গে আলাপ-পরিচয়। সেই মেয়েটিই এখন ছিঁচকে ছিরুর গৃহিণী মালতীসুন্দরী।
পালাকার গুড়গুড়ে গুছাইত ভেবে রেখেছেন। এবারের পলায় থাকবে দুই বন্ধুর দুটি চরিত্র। সেই দু জন যাকে বলে হরিহর আত্মা। হরিপদ আর ভূষণকে রাখা হবে এই দুই বন্ধুর ভূমিকায়। পাশাপাশি বাড়ি অথচ দু জনের মধ্যে মুখ দেখাদেখি বন্ধ, গ্রামে তো এটা চলতে দেওয়া যায় না। তাই পালার মধ্যে দিয়েই মিটমাট করাতে হবে। এইসব ভাবেন আর পালা লেখেন গুড়গুড়ে গুছাইত। থেকে থেকেই একঢেলা পাটালি মুখ রেখে চুষে চুষে খায় গুড়গুড়ে।
লেখার ঘোরে খেয়াল নেই গুড়গুড়ের, রাত কাটা বাজে। টাইমনিসটা পাশে রেখে মাটিতে শুয়ে বুকে বালিশ রেখে লিখেই চলেছেন তিনি। হঠাৎ কড়াৎ করে বাজ পড়ল। তার আলো আর শব্দে চমকে গিয়ে একচেলা পাটালি মুখে ফেললেন গুড়গুড়ে। বাজ পড়ার আওয়াজে হ্যারিকেনের কাচটায় চিড় ধরে গেল সামান্য। হ্যারিকেনের আলো কমিয়ে টাইমপিসের দিকে চোখ দিতেই দেখলেন রাত তিনটে। না, আজ আর নয়, পালা লেখা বন্ধ করলেন। তারপর বাথরুমে গিয়ে হালকা হয়ে সটান মশারির ভেতর সেঁধলেন গুড়গুড়ে গুছাইত। দিন সাতেক লাগল ভূতের ভয়ে ছিঁচকে পালালো পালাটি লিখতে। ছটার মধ্যে সকলকে আসতে বলা হয়েছে চণ্ডীমণ্ডপে। সাড়ে সাতটার মধ্যে সকলে বাড়ি ফিরতে চাইবে। রাত আটটা বাজলেই ভূতের উপদ্রব শুরু হবে। ইদানীং ভূতের অত্যাচার আরও বেড়েছে। যাদের কিছুই করার নেই তাঁরাই শুধু লাস্ট ট্রেনের যাত্রী।
তাড়াতাড়ি দোকান বন্ধ করে চন্ডীমণ্ডলে চলে এসেছেন গুড়গুড়ে গুছাইত। ছায়াময় গ্রামে তাঁর মুদির দোকান মাতৃ ভাণ্ডার। এক এক করে সবাই আসতে লাগলেন। হরিপদ, ভূষণ দুজনেই এসেছেন। ছিঁচকে ছিরুও উপস্থিত। তাকে দেখে সবাই অবাক। কৌতূহল ভাঙলেন গুড়গুড়ে গুছাইত। বললেন, এই পালায় ছিঁচকের একটা ভূমিকা আছে। তাছাড়া ওর জন্যই তো পালা। তাই ঠিক করেছি ছিঁচকে ছিরুর একটা ভূমিকা থাকুক। আর ও তো একসময় রামযাত্রায় লক্ষ্মণের পার্ট করত।
পালাকার-পরিচালক গুড়গুড়ে গুছাইতের ছিঁচকের নির্বাচন নিয়ে কেউ আপত্তি তোলেননি। গ্রামের কেউ কেউ বললেন, ও তো আর বড় চোর নয়, ছিঁচকে। গুড়গুড়ে এবার হরিপদ আর ভূষণকে ডাকলেন। বললেন, আপনারা দুজন এবার নিজেদের ঝগড়া মিটিয়ে নিন। দুজনকে অভিনয় করতে হবে হরিহর আত্মা দুই বন্ধুর। কোনও ওজর আপত্তি শোনা হবে না। গ্রামের সবাই গুড়গুড়ের কথায় সায় দিয়ে বললেন, সাধু, সাধু। উত্তম প্রস্তাব। গুড়গুড়ে গুছাইত আগেই এনে রেখেছিলেন মদন ময়রার রসগোল্লা। হরিপদ আর ভূষণকে মিষ্টি মুখ করিয়ে মিটমাট করানো হল ওদের ঝগড়াঝাটি। এবার সকলে মিলে সিদ্ধান্ত দেওয়া হল। ভূত তাড়ানোর। ইদানীং অনেকেই ভূতের খপ্পরে পড়ে বহুকিছু পুইয়েছেন। ঠিক হল জঙ্গল ওঝাকে ডেকে ভূত তাড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে। পুরোদমে মহড়া শুরু হলে একটুআধটু রাতবিরেত হবে বইকি।
দুএকদিন হল বিলাস বটব্যালের শ্যালক সঞ্জয় সান্যাল এসেছেন ছায়াময় গ্রামে। সঙ্গে আছেন। বন্ধু চন্দন চৌধুরী। সঞ্জয়ের জেনে গেছেন রাত আটটার ভূতের কথা। খাওয়াদাওয়ার পর রাত্রি দশটায় গ্রাম ভ্রমণে বেরিয়েছেন সঞ্জয়-চন্দন। যদি সন্ধান মেলে ভূতের। তবে ওঁদের ভূতের মুখোমুখি হতে হয়নি সেদিন।
সঞ্জয় শহরে সত্যাগেধী হিসেবে বেশ নাম করেছেন। তাঁর সাঙাত চন্দনও। এঁরা অবশ্য আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেন না। গুলতিই হল। ওঁদের প্রধান অস্ত্র। সামনের অলিম্পিকে দেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন সঞ্জয় সান্যাল। অব্যর্থ টিপ। অল ইন্ডিয়া গুলতি ফেডারেশন মনে করছে সোনা আনবেনই তিনি।
ছোট ছোট লোহার বল আর গুলতি পকেটেই রয়ে গেল সঞ্জয়ের। ঠিক করলেন, আগামী কাল সকালবেলা জলখাবার খেয়ে দু জনে গ্রামের আনাচকানাচে একবার টু-মারবেন। এখন আপাতত ঘুমানো যাক। মাঝরাতে জল খেতে উঠে জানলা দিয়ে সঞ্জয় চাঁদের আলোয় দেখলেন, একটা ছায়ামূর্তি চলে গেল। তার গায়ে বড় বড় কালো লোমও আছে বলে মনে হল। ভূতের গায়ে লোম থাকে বলে কোনওদিন শোনেনি। এ-গ্রামে কোনওকালে গেরিলা ছিল বলেও জানা নেই। গেরিলা মরে ভূত হওয়ার সম্ভাবনাও নেই। কোনওদিন জন্তুজানোয়ার মরে ভূত হয়েছে বলেও তাঁর কাছে কোনও খবর নেই। খটকা লাগল সঞ্জয়ের মনে। তাহলে ভূতটা কি...!
সকালবেলা চা-জলখাবার খেয়ে সঞ্জয় আর চন্দন বেরিয়ে পড়লেন গ্রাম বেড়াতে। রেললাইনের ওপারেও গেলেন। লাইনের এপারটা ছায়াময় গ্রামের পাঠকপাড়া। একসময় জমিদার পাঠকদের খুব দাপট ছিল। তাই পাঠক ছাড়া আর কাউকে ঢুকতে দেননি জমিদার। সঞ্জয় আর চন্দন দু জনেই অবাক হল জমিদারবাড়ি দেখে। এখন একেবারে ভগ্নস্তূপ। দু একটা পরিবার থাকে এখনও। নীচেরতলাটা জবরদখল করেছে কয়েকটি পরিবার।
ছাদের দিকে নজর যেতেই অবাক হল সঞ্জয়। রোদে যে-পোশাকটি শুকোচ্ছে সেটা খুব চেনা চেনা মনে হল। মনে পড়েছে, গতকাল রাতেই ওইরকম কালো লোমওয়ালা একটা ছায়ামূর্তিকে যেতে দেখেছিল। চন্দনকে বললেন, চল বাড়ি যাই। জামাইবাবু বিলাস বটবালের সঙ্গে পরামর্শ করেবাত্রিবেলা ভূত ধরার কৌশল ঠিক করলেন সজয় আর চন্দন। তার আগে সারা গ্রামে রটিয়ে দেওয়া হল গুড়গুড়ে গুছাইত প্রচুর টাকা নিয়ে যাত্রাপালার মাল কিনে ফিরবেন লাস্ট ট্রেনে।
প্রতিদিনের মতো দেরি করেই শেষ ট্রেন ছায়াময় সেস্টশনে ঢুকল ঘণ্টাখানেক দেরিতে। এখন আর রিকশা, টোটো কিছুই থাকে না। তাই মাথায় বোঁচকা চাপিয়ে হন্টন নিলেন গুড়গুড়ে গুছাইত।
স্টেশন থেকে আধা কিলোমিটার দূরে আখখেত। এটা পেরিয়ে গেলে ভূতের আর ভয় নেই। যত ভুতুড়ে কার ওই আখখেতের ধারে।
দূর থেকে শুড়শুড়ে দেখলেন ভূতের চোখ জ্বলছে লাল হয়ে। অন্ধকারে লাল আরও বেশি সাংঘাতিক লাগে। গুড়গুড়ে গুছাইভ ছোটবেলার ভূত তাড়ানোর মন্ত্র পড়তে পড়তে এগুতে লাগলেন।
-ভূত আমার পূত/পেতনি আমার কি/রামলক্ষ্মণ বুকে আছে করবি আমার কি। মন্ত্রবলে কোনও কাজ হচ্ছে না। লাল ক্রমশ গাঢ় হচ্ছে। গুড়কড়ে হঠাৎ দেখলেন ভূতের একটা চোখ আর জ্বলছে না। এবার দুটো চোখই। গুড়গুড়ের বিস্ময়ের ঘোর আর কাটে না। কাছে যেতেই দেখলেন ভূতের সঙ্গে বস্তাধস্তি হচ্ছে দুজনের। টেনশনে কাটাতে কিছুটা পাটালির ঢেলা মুখে পুরে চুষতে লাগলেন। কাছে এসে শুড়শুড়ে গুম্বাইত চিনতে পারলেন বিলাসবাবুর শ্যালক সঞ্জয়কে। ভূতকে পাকড়াও কয়ে নিয়ে যাওয়া হল বিলাসবাবুর বাড়ি। তাঁর বাড়িতে বিজলি বাতি আছে। আলো জ্বালিয়ে ভূতের পোশাক আর মেক-আপ তোলার পর বেরিয়ে পড়ল ভূতের আসল চেহারা। পাড়ার সবাই উপস্থিত বিলাসবাবুর বাড়ি। সকলেই বিস্মিত। আরে এ তো পাঠক পাড়ার পটলা পাঠক। একসময় অবস্থা ভালই ছিল। পটলা পাঠক পরিবারেরই বংশধর। কলকাতার কলেজে পড়ত। হঠাৎই সিরিয়াল করার নেশা চেপে বসল মাথায়। ব্যস, ওই রোগেই ঘোড়া মরল। বাপ দাদুর সঞ্চিত টাকা-পয়সা সুডিয়োপাড়ায় উড়িয়ে দিয়েছে। সবশেষে কোন এক মেক-আপম্যানের আসিস্ট্যান্ট। টাকা-পয়লা তেমন রোজগারা নেই। পটলা নিজে মুখ সব স্বীকার করল, সেই ভূতের ভয় দেখিয়ে রোজগার করত। রহস্য ফাঁস করলেন সঞ্জয়, আমার প্রথমেই সন্দেহ হয়েছিল। ছিনতাইকারী ভূতের কথা জীবনে শুনিনি। তারপর সেদিন লাইনের ওপারে গিয়ে দেখি পটলার ছাদে ভূত সাজার পোশাক রোদ্দুরে শুকোচ্ছে। একদিন রাতে জল খেতে উঠে ভূত সেজে পটনাকে বাড়ির দিকে যেতে দেখেছিলাম। ওর হাতে একটা কাকতাড়ুয়া ছিল। ব্যস, দুইয়ে দুইয়ে চার। এর হাঁড়ির চোখে দুটো লাল টুনি লাইট লাগানো থাকত। প্রথমেই ওই টুনি লাগানো লাল চোখ দুটো গুলতি মেরে ফাটিয়ে দিলাম। চন্দন গিয়ে ধরল চেপে। পটলার খেল খতম না, আর ভূত নামেনি ছায়াময় গ্রামে। গুড়শুয়ে গুছাইতের পালা ভূতের ভয়ে মিচকে পালালো সুপারহিট। ছায়াময় গ্রামের পালার আশপাশের নানা গ্রাম থেকে ডাক আসত। ছিঁচকে ছিক আর পুরনো পেশায় ফিরে যায়নি। আর পটলা পাঠক কাজ পেল দলের মেক-আপম্যানের। ছিঁচকে ছিঁরু আর পটলা দুজনেরই রোজগার এখন মন্দ নয়।