প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
মহাশিবরাত্রিতে উপবাস পালন অত্যন্ত পুণ্যজনক বলে মনে করা হয়। ভক্তরা সারাদিন নির্জলা উপবাস রাখেন বা ফল, দুধ ও শুকনো ফল গ্রহণ করেন। কঠোর ব্রত পালনের মাধ্যমে তারা শিবের প্রতি তাদের ভক্তি প্রকাশ করেন।
ফাল্গুন মাসের কৃষ্ণ পক্ষের চতুর্দশী তিথিতে পালিত হয়। শিব পুরাণ অনুসারে, এই রাত্রেই শিব সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়ের মহা তাণ্ডব নৃত্য করেছিলেন। আবার এই রাত্রেই শিব ও মাতা পার্বতীর বিয়ে হয়েছিল। বেশ কয়েকটি পুরাণে মহা শিবরাত্রির উল্লেখ রয়েছে । বিশেষ করে স্কন্দপুরাণ, লিঙ্গপুরাণ এবং পদ্মপুরাণে । এই মধ্যযুগীয় শৈব গ্রন্থগুলিতে উপবাস ও লিঙ্গরূপের শিবের পূজার কথা উল্লেখ রয়েছে। এই বিশেষ তিথিতে ভারতবর্ষের বারোটি জ্যোতির্লিঙ্গ তথা সোমনাথ, মল্লিকার্জুন, মহাকালেশ্বর, ওঁকারেশ্বর, কেদারনাথ, ভীমশঙ্কর, বিশ্বেশ্বর, ত্র্যয়ম্বকেশ্বর, বৈদ্যনাথ, নাগেশ্বর, রামেশ্বর ও ঘুশ্মেশ্বর এ বহু মানুষের সমাগম হয় ও সবার হাতে এই জ্যোতির্লিঙ্গের পূজা ও পবিত্র স্পর্শলাভ ঘটে।
মহাশিবরাত্রির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রীতি হল শিবলিঙ্গে অভিষেক করা, যা বিভিন্ন পবিত্র উপাদান দিয়ে সম্পন্ন হয়:
দুধ – পবিত্রতা ও শুদ্ধতা
জল – পরিশুদ্ধি
মধু – মাধুর্য ও ভক্তি
দই – সমৃদ্ধি
ঘি – ইচ্ছাপূরণ
বেল পাতা – পাপ নাশ ও শিবের আশীর্বাদ লাভ
ভক্তরা সারারাত জেগে প্রার্থনা, ভজন ও ধ্যান করে মহাশিবরাত্রি উদযাপন করেন। এটি অজ্ঞতা ও অন্ধকার থেকে মুক্তির প্রতীক। “ওঁ নমঃ শিবায়” মন্ত্রটি সারারাত ধরে জপ করা হয়। এটি শিবের প্রতি আত্মসমর্পণের প্রতীক এবং এটি মন, শরীর ও আত্মাকে শুদ্ধ করে বলে বিশ্বাস করা হয়। ভক্তরা রুদ্রাভিষেকের সময় রুদ্রম, শিব চালিসা ও অন্যান্য শাস্ত্র পাঠ করেন। পুজোতে বেল পাতা ও ধুতুরা ফুল অর্পণ করা অত্যন্ত শুভ বলে মনে করা হয়। শাস্ত্রমতে, বেল পাতা নিবেদন করলে পাপ নাশ হয় এবং শিবের কৃপা লাভ করা যায়।ঘর ও মন্দিরে প্রদীপ জ্বালানো হয়, যা জ্ঞান ও পবিত্রতার প্রতীক। এই শুভ দিনে দান-ধর্ম করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দরিদ্রদের অন্নদান, বস্ত্রদান ও মন্দিরে প্রসাদ বিতরণ করা মহাশিবরাত্রির অন্যতম পুণ্যকর কাজ বলে বিবেচিত হয়। নন্দী ও ভৃঙ্গি হলেন ভগবান শিবের প্রধান অনুচর ও ভক্ত, যারা শিবের সেবা ও উপাসনার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত।
নন্দী:
নন্দী হলেন ভগবান শিবের বাহন (বহনকারী) এবং তাঁর অন্যতম প্রধান গন। সাধারণত নন্দীকে একটি বিশাল, সাদা ষাঁড়রূপে কল্পনা করা হয়, যার প্রতীকী অর্থ হল ধৈর্য, শক্তি এবং ভক্তি। নন্দী শুধুমাত্র শিবের বাহন নন, তিনি শিবের প্রধান প্রহরী হিসেবেও পরিচিত। শিব মন্দিরগুলিতে নন্দীর মূর্তি বা প্রতিমা প্রায়শই শিবলিঙ্গের সামনে স্থাপন করা হয়। শাস্ত্র অনুসারে, নন্দী ছিলেন এক মহর্ষি শিলাদ এর পুত্র, যিনি কঠোর তপস্যার মাধ্যমে শিবের আশীর্বাদ লাভ করে নন্দীতে পরিণত হন। নন্দীকে শিব ও পার্বতীর প্রতি সম্পূর্ণ ভক্তির প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হয়, এবং তিনি শিবের শিক্ষাগুলি প্রচার করেন।
ভৃঙ্গি:
ভৃঙ্গি ছিলেন ভগবান শিবের এক অন্যন ভক্ত ও সেনাপতি। তাঁর কাহিনী অত্যন্ত আকর্ষণীয়! তিনি এতটাই শিবভক্ত ছিলেন যে কেবলমাত্র শিবের উপাসনা করতে চাইতেন, পার্বতীর নয়। কিন্তু শিব ও পার্বতী একাত্ম (অর্ধনারীশ্বর) হওয়ায় এটি সম্ভব ছিল না। ভৃঙ্গি এত দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ ছিলেন যে, তিনি শিব ও পার্বতীকে আলাদা করতে চাইলেন। এই কারণে, দেবী পার্বতী রুষ্ট হয়ে তাঁকে অভিশাপ দেন, যার ফলে ভৃঙ্গির শরীর থেকে রক্ত ও মাংস উধাও হয়ে যায়, এবং তিনি কেবল হাড়ের কাঠামোতে পরিণত হন।
শিবের কৃপায় তিনি একটি তৃতীয় পা লাভ করেন, যাতে তিনি শিবের উপাসনা চালিয়ে যেতে পারেন। ভৃঙ্গি শিবভক্তির চরম প্রতীক, যা দেখায় যে প্রকৃত ভক্তি কতটা শক্তিশালী হতে পারে, যদিও এটি কখনও কখনও অহংবোধ বা সীমিত দৃষ্টিভঙ্গির কারণে বিপদের কারণও হতে পারে। নন্দী ও ভৃঙ্গি দুজনেই ভগবান শিবের অন্যতম প্রধান অনুচর ও ভক্ত। নন্দী বিশ্বাস, ভক্তি, এবং দায়িত্ববোধের প্রতীক, আর ভৃঙ্গি অটল ভক্তি ও একাগ্রতার প্রতীক, যদিও তার মধ্যে কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। শিবভক্তদের কাছে তারা যুগ যুগ ধরে শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে আছেন।
বাসুকি নাগ:
শিবের গলায় যে সাপটি দেখা যায়, তাকে বাসুকি নাগ বলা হয়। এটি হিন্দু পুরাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র।
১. সমুদ্র মন্থনের কাহিনি
পুরাণ অনুসারে, দেবতা ও অসুরদের দ্বারা সমুদ্র মন্থনের সময় ভয়ংকর হলাহল বিষ উৎপন্ন হয়েছিল, যা সমগ্র বিশ্বকে ধ্বংস করতে পারত। তখন শিব বিশ্বের কল্যাণের জন্য সেই বিষ পান করেন, কিন্তু তিনি সেটিকে গলাধঃকরণ না করে নিজের কণ্ঠে ধারণ করেন। এর ফলে তাঁর গলা নীলবর্ণ ধারণ করে, এবং তিনি নীলকণ্ঠ নামে পরিচিত হন। এই সময় বাসুকি নাগ শিবের গলায় জড়িয়ে শিবকে ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করেন।
২. ভয় ও মৃত্যুর ওপরে নিয়ন্ত্রণের প্রতীক
সাপ সাধারণত ভয় ও মৃত্যুর প্রতীক। কিন্তু শিবের গলায় সাপ থাকার অর্থ হলো, তিনি ভয় ও মৃত্যুকে জয় করেছেন এবং এগুলো তাঁর জন্য কোনো বাধা নয়। তিনি মহাকাল (সময়ের অধিপতি), তাই মৃত্যুর ওপরে তাঁর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
৩. শক্তি ও যোগের প্রতীক
সাপ কুণ্ডলিত হয়ে থাকে, যা কুণ্ডলিনী শক্তির প্রতীক। শিব হলেন যোগীদের আদিগুরু (আদিযোগী), এবং তাঁর গলায় সাপ থাকার অর্থ হল তিনি এই শক্তিকে সম্পূর্ণরূপে জাগ্রত করেছেন।
৪. বিশ্বের ভারসাম্য রক্ষা
সাপ হল প্রকৃতির উগ্র ও বিধ্বংসী শক্তির প্রতীক। কিন্তু শিব, যিনি সৃষ্টি ও বিনাশের দেবতা, এই শক্তিকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন, যা বিশ্বজগতের ভারসাম্য রক্ষা করতে সহায়ক।
৫. অহংকার দমন ও বৈরাগ্যের প্রতীক
সাপ সাধারণত অহংকার ও কামনার প্রতীক। কিন্তু শিব সম্পূর্ণ বৈরাগ্যধারী, তাই তিনি সাপকে গলায় ধারণ করে দেখান যে তিনি সম্পূর্ণ কামনা ও মোহের ঊর্ধ্বে।
শিবের গলায় সাপ থাকা কেবলমাত্র অলংকার নয়, বরং এটি গভীর আধ্যাত্মিক ও প্রতীকী অর্থ বহন করে। এটি বিশ্বকে শেখায় ভয়কে জয় করা, আত্মনিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা, এবং আধ্যাত্মিক জ্ঞান দ্বারা শক্তির সদ্ব্যবহার করা। শিবের এই অনন্য রূপ ভক্তদের অনুপ্রাণিত করে, যাতে তারা জীবনের কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি সাহস ও ধৈর্যের সঙ্গে হতে পারে। হর হর মহাদেব!