19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

দশমীতে মায়ের বিদায়, তবুও কেন হয় মিষ্টিমুখ?

প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিনিধি


দুর্গাপুজো বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ উৎসব। ষষ্ঠী থেকে শুরু হয়ে অষ্টমী-নবমীর উল্লাসে মেতে ওঠে পুরো বাংলা। কিন্তু উৎসবের শেষ দিন বিজয়া দশমী যেদিন দেবী দুর্গাকে বিদায় জানাতে হয়। অশ্রুসজল চোখে মায়ের বিসর্জন হয় গঙ্গার জলে, প্যান্ডেলের আলো ধীরে ধীরে নিভে আসে, আকাশ জুড়ে যেন ছায়া ফেলে বিষণ্ণতা। তবুও আশ্চর্যের বিষয় হলো, ঠিক এই দিনেই প্রতিটি বাঙালি ঘরে ঘরে হয় মিষ্টিমুখ। দেবীর বিদায়ের বেদনার মধ্যে কেন এই আনন্দঘন প্রথা? কেন দুঃখের সঙ্গেই মিষ্টির মেলবন্ধন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই আমাদের ডুব দিতে হবে ধর্মীয় তাৎপর্য, সামাজিক প্রেক্ষাপট, লোকবিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক দিকগুলোয়।


দশমীর তাৎপর্য

বিজয়া দশমী কেবল দেবী দুর্গার বিদায় নয়, এর মধ্যে নিহিত রয়েছে গভীর দার্শনিক অর্থ।

  1. শুভের জয়: মহিষাসুর বধের মাধ্যমে দেবী শক্তি জয়ী হয়েছেন। তাই দশমী আসলে বিজয়ের দিন। বিজয়া দশমী নামকরণই তার প্রমাণ।

  2. বছরের প্রতিশ্রুতি: দুর্গাপূজা শেষ হলেও দেবী আবার ফিরে আসবেন আগামী বছর। তাই বিদায়ের দুঃখের সঙ্গে মিশে থাকে নতুন আশার আলো।

  3. সামাজিক মেলবন্ধন: দশমী মানে প্রণাম, আলিঙ্গন, শুভেচ্ছা আর মিষ্টি মুখের মাধ্যমে সম্পর্কের বন্ধন দৃঢ় করা।


বিদায়ে মিষ্টির প্রতীকী তাৎপর্য

  1. বেদনা মধুর করা: মা বিদায় নিলেও তাঁর আশীর্বাদ আমাদের সঙ্গে রইল। সেই বেদনা মিষ্টিমুখের মাধ্যমে কিছুটা প্রশমিত হয়।

  2. নতুন সূচনার প্রতীক: বিজয়া মানে নতুন জীবনযাত্রার সূচনা। মিষ্টি খাওয়া মানে জীবনে মাধুর্য আসুক।

  3. অভ্যর্থনা ও আপ্যায়ন: দেবী বিদায় নিলেও অতিথি-আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা হয় এই দিনে। তাই মিষ্টিমুখের মাধ্যমে আপ্যায়ন অপরিহার্য।


শাস্ত্রীয় উল্লেখ

  • দেবী মহাত্ম্য অনুসারে, দেবী দুর্গার আরাধনা শেষে তাঁর আশীর্বাদ নিয়ে ভক্তরা আনন্দে মেতে ওঠেন।

  • কালিকাপুরাণে বলা আছে, বিদায়ে আনন্দ উৎসর্গ করতে হবে কারণ দেবীর আশীর্বাদে মানুষ দুঃখকে মধুর করে তুলতে সক্ষম।

  • হিন্দু আচার অনুযায়ী, যে কোনো শুভকর্মের শেষে মিষ্টিমুখ প্রথাগত। পূজার সমাপ্তি ও বিজয়া দশমীও তার ব্যতিক্রম নয়।


সামাজিক প্রেক্ষাপট

  1. বিজয়া সংক্রান্তি: বাংলায় দশমীর পর থেকে শুরু হয় ‘বিজয়া’—যা মাসব্যাপী চলতে পারে। এই সময়ে আত্মীয়-বন্ধুর বাড়ি গিয়ে প্রণাম করা, শুভেচ্ছা বিনিময়, মিষ্টিমুখ করা রীতি।

  2. সম্পর্কের নবীকরণ: অনেক সময়ে বছরের অভিমান, দূরত্ব—সব ভেঙে যায় বিজয়া প্রণামের মাধ্যমে। মিষ্টিমুখ হয় সেই মেলবন্ধনের মাধ্যম।

  3. আতিথেয়তার অংশ: বাঙালির ঘরে অতিথি এলে মিষ্টি পরিবেশন করা অবধারিত। বিজয়া দশমীতে তাই মিষ্টি দিয়ে শুরু হয় নতুন সম্পর্কের অধ্যায়।


নারীর দৃষ্টিকোণ – সিঁদুর খেলা ও মিষ্টি

দশমীর সকালে বিবাহিতা নারীরা দেবীর সিঁদুর খেলা করেন। পরস্পরকে সিঁদুর দিয়ে প্রণাম করেন, তারপর মিষ্টি মুখ করান।

  • এটি প্রতীকীভাবে জানায়, সৌভাগ্য ও দীর্ঘায়ু বজায় থাকুক

  • সিঁদুরের লাল রঙ যেমন শক্তি ও ভালোবাসার প্রতীক, তেমনি মিষ্টি হলো জীবনের আনন্দ ও মাধুর্যের প্রতীক।


খাদ্যসংস্কৃতি ও মিষ্টি

বাঙালি জীবনে মিষ্টি শুধু খাবার নয়; এটি আনন্দ, স্নেহ, সম্পর্কের ভাষা। সন্দেশ, রসগোল্লা, ল্যাংচা, ক্ষীরকদম প্রতিটি মিষ্টিই একেকটি আবেগ। বিজয়া দশমীতে তাই মিষ্টি হলো বিদায়ের বেদনার মধ্যে আনন্দের প্রতীক।

  • দেবীর ভোগে যেমন মিষ্টির স্থান অপরিহার্য, তেমনি ভক্তদের মিলনেও মিষ্টি অপরিহার্য।

  • প্রায় প্রতিটি বাঙালি পরিবারে বিজয়ার দিনে অতিথিদের জন্য বিশেষ মিষ্টি আনা হয়।


মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

  1. শোক থেকে আনন্দে রূপান্তর: বিদায় মানেই শোক। কিন্তু সমাজ সেই শোককে আনন্দে রূপান্তরিত করতে শিখিয়েছে মিষ্টির মাধ্যমে।

  2. পজিটিভ এনার্জি: মিষ্টি খাওয়া মানসিক প্রশান্তি আনে। উৎসব শেষে একধরনের শূন্যতা তৈরি হয়, মিষ্টি সেই শূন্যতাকে পূর্ণ করে।

  3. সামাজিক রিচুয়াল: মানুষকে একসঙ্গে বসতে, খেতে ও আনন্দ ভাগ করে নিতে বাধ্য করে মিষ্টি।


সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে প্রতিফলন

  • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতায় প্রায়ই বিজয়া দশমীর উল্লেখ আছে, যেখানে বিদায়ের বেদনার সঙ্গে আনন্দের মেলবন্ধন দেখা যায়।

  • লোকগীতিতে শোনা যায় মা যাবেন বাপের বাড়ি, মিষ্টি মুখে সবার খুশি।

  • নাটক ও সিনেমাতেও বিজয়ার দৃশ্য প্রায়শই মিষ্টি খাওয়ার সঙ্গে জড়িত থাকে।


আধুনিক প্রেক্ষাপট

আজকের দিনে বিজয়া দশমী শুধু ধর্মীয় আচার নয়, এটি এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

  • ক্লাব, অ্যাসোসিয়েশন, অফিসে হয় বিজয়া সম্মিলনী। সেখানে গান, নাচ, নাটকের পাশাপাশি থাকে মিষ্টিমুখ।

  • অনেকে এখন ডায়েট সচেতন হলেও বিজয়ার দিনে একটু মিষ্টি না খেলে যেন উৎসবই অসম্পূর্ণ।

  • বিদেশে থাকা বাঙালিরাও বিজয়া উপলক্ষে একত্রিত হয়ে মিষ্টি খাওয়া অবধারিত করেন।

কেউ কেউ বলেন, মা বিদায়ের দিনে আনন্দ প্রকাশ ভণ্ডামির মতো। তবে সমাজবিদরা মনে করেন, এটি আসলে মানুষের মানসিক প্রতিরক্ষা। শোককে আনন্দে পরিণত করার ক্ষমতাই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। বিজয়া দশমী তাই দ্বৈত আবেগের দিন একদিকে মায়ের বিদায়ের বিষণ্ণতা, অন্যদিকে শুভের জয় ও নতুন শুরুর আনন্দ। মিষ্টি হলো সেই আবেগের সেতু, যা দুঃখকে রূপান্তরিত করে মাধুর্যে। তাই তো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে এই রীতি দশমীতে মায়ের বিদায়, তবুও কেন হয় মিষ্টিমুখ কারণ এভাবেই আমরা শিখি শোকের মাঝেও আনন্দ খুঁজে নিতে, বিদায়ের ভেতরেও নতুন আগমনের আশায় বাঁচতে।

Archive

Most Popular