প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
মঙ্গলচণ্ডী ব্রত হল হিন্দু ধর্মের এক বিশেষ ব্রত যা মঙ্গল ও চণ্ডী দেবীর পূজা করার জন্য পালন করা হয়। বিশেষ করে বাংলার হিন্দু সমাজে এই ব্রত বেশ জনপ্রিয়। এটি সাধারণত মহিলারা সংসারের মঙ্গল, সুস্থতা ও সমৃদ্ধির জন্য পালন করেন।
ব্রতের মূল বিষয়বস্তু:
উদ্দেশ্য: মঙ্গলচণ্ডীর কৃপা লাভের জন্য এই ব্রত পালন করা হয়। বিশ্বাস করা হয়, এই ব্রতের ফলে সংসারে শান্তি, সমৃদ্ধি ও সন্তানের মঙ্গল হয়।
পালনের দিন: সাধারণত মঙ্গলবার এই ব্রত পালন করা হয়। তবে বিশেষ কোনো শুভ তিথিতে বা সংকল্প অনুযায়ী অন্য দিনেও এটি পালন করা যেতে পারে।
মঙ্গলচণ্ডী ব্রতকথা:
এই ব্রতের সঙ্গে বিভিন্ন পুরাণকথা জড়িত। বিশেষত, গ্রামবাংলার লোককথা অনুসারে, কোনো এক সময়ে এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ বা কৃষক পরিবার এই ব্রত পালন করে দেবীর আশীর্বাদ লাভ করেছিল, যার ফলে তাদের দুঃখ-দুর্দশা কেটে গিয়েছিল।
উপকারিতা ও বিশ্বাস:
সংসারের মঙ্গল ও কল্যাণ হয়।
রোগ-বালাই থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।
সন্তান ও পরিবারের সুরক্ষা ও সমৃদ্ধি আসে।
নারীদের জন্য এটি বিশেষভাবে শুভ ও শক্তিদায়ক বলে মনে করা হয়।
মঙ্গলচণ্ডী ব্রত সাধারণত মঙ্গলবার বা শুভ তিথিতে পালন করা হয়। এই ব্রতের পূজার নিয়ম খুব সহজ ও শাস্ত্রসম্মত, যা ঘরে বসেই পালন করা যায়।
পূজার প্রস্তুতি:
1. স্নান ও শুদ্ধি:
ব্রত পালনকারীকে সূর্যোদয়ের আগে উঠে শুদ্ধ জল দিয়ে স্নান করতে হবে।
পরিষ্কার এবং সাদা বা লাল বস্ত্র পরিধান করা শুভ বলে মনে করা হয়।
2. পূজার স্থান:
বাড়ির পূর্ব বা উত্তর দিকে পরিষ্কার স্থানে পূজা করতে হয়।
দেবী মঙ্গলচণ্ডীর ছবি বা মূর্তি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
একটি কাঠের আসনে (পিড়ি) লাল বা হলুদ কাপড় বিছিয়ে তার উপর দেবীর প্রতিমা রাখতে হয়।
পূজার মূল নিয়ম:
1. ঘিয়ের প্রদীপ ও ধূপ জ্বালানো:
পূজার সময় ঘি বা তেল দিয়ে পাঁচটি প্রদীপ (পঞ্চপ্রদীপ) জ্বালানো শুভ।
ধূপ বা আগরবাতি জ্বালিয়ে পরিবেশ পবিত্র করতে হয়।
2. পঞ্চোপচার বা ষোড়শোপচার পূজা:
আচমন ও সংকল্প: পূজা শুরু করার আগে দেবীকে আহ্বান করে সংকল্প করতে হয়।
পুষ্পাঞ্জলি: লাল ফুল, বিশেষ করে জবা ফুল অর্পণ করা হয়।
চন্দন, কুমকুম, সিঁদুর ও ধূপ-দীপ নিবেদন: দেবীকে চন্দন, সিঁদুর, কুমকুম এবং ধূপ-দীপ নিবেদন করা হয়।
নৈবেদ্য: দেবীকে দুধ, দই, মধু, নারকেল, লাল রঙের মিষ্টি (যেমন লাল সন্দেশ) নিবেদন করা হয়।
ভোগ: প্রসাদ হিসেবে খিচুড়ি, ফল-মিষ্টি ও পায়েস নিবেদন করা হয়।
3. ব্রতকথা পাঠ ও শ্রবণ:
মঙ্গলচণ্ডীর ব্রতকথা পাঠ করা হয় বা কেউ পড়ে শুনিয়ে থাকে।
ব্রতকথা শ্রবণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।
4. অঞ্জলি ও প্রার্থনা:
ব্রতকথার পর ব্রত পালনকারী ও উপস্থিত সকলে দেবীকে ফুল দিয়ে অঞ্জলি প্রদান করেন।
দেবীর আশীর্বাদ কামনা করে প্রার্থনা করা হয়।
5. উপবাস ও প্রসাদ বিতরণ:
অনেকেই সারাদিন নিরামিষ উপবাস রাখেন, তবে ফল ও দুধ গ্রহণ করা যেতে পারে।
পূজা শেষে পরিবারের সবাইকে প্রসাদ বিতরণ করা হয়।
বিশেষ বিধান:
মঙ্গলবার ব্রত রাখলে বেশি ফল পাওয়া যায়।
নারীরা বিশেষ করে লাল শাড়ি ও সিঁদুর পরে পূজা করলে শুভফল লাভ হয়।
পূজার সময় ভক্তিপূর্ণ মনোভাব ও শুদ্ধ উচ্চারণে মন্ত্র জপ করা উচিত।
মঙ্গলচণ্ডী ব্রত মূলত হিন্দু ধর্মাবলম্বী নারীরা পালন করেন। বিশেষ করে, এটি সধবা (বিবাহিত) নারী, গৃহবধূ এবং কুমারী মেয়েদের মধ্যে বেশি প্রচলিত। তবে কিছু ক্ষেত্রে পুরুষরাও সংকল্প নিয়ে এই ব্রত পালন করতে পারেন।
কারা এই ব্রত করেন এবং কেন?
1. বিবাহিত নারীরা:
স্বামী ও পরিবারের মঙ্গল কামনায়।
সন্তান-সন্ততির সুখ, সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু কামনায়।
সংসারে শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য।
2. কুমারী মেয়েরা:
ভবিষ্যতে শুভ বিবাহ ও সুখী দাম্পত্য জীবনের আশায়।
নিজের জীবনে সৌভাগ্য ও সাফল্য লাভের জন্য।
3. গর্ভবতী ও সদ্য মা হওয়া নারীরা:
গর্ভের সন্তানের সুস্থতা ও নিরাপত্তার জন্য।
প্রসবকালীন বিপদ মুক্তির জন্য।
4. পরিবারের মঙ্গল কামনাকারী পুরুষেরা:
অনেকে সংকল্প নিয়ে ব্রত করেন, বিশেষত যদি পরিবারের কেউ অসুস্থ থাকে বা কোনো বাধা-বিপত্তি আসতে থাকে।
মঙ্গলচণ্ডী ব্রতের পূজার ভোগ:
মঙ্গলচণ্ডী ব্রতে নিরামিষ ও পবিত্র খাবার দেবীকে নিবেদন করা হয়। ভোগে সাধারণত দুধ, ফল, মিষ্টি এবং সাদা বা লাল রঙের প্রসাদ দেওয়া হয়।
ভোগের উপকরণ ও তালিকা:
1. পায়েস – চাল, দুধ, চিনি/গুড় ও কিশমিশ দিয়ে তৈরি।
2. খিচুড়ি – মুগডাল ও আতপ চাল দিয়ে তৈরি নিরামিষ খিচুড়ি।
3. লুচি ও সাগু (সাবু) – মঙ্গলপ্রসাদ হিসেবে লুচি ও সাবুদানা খাওয়ার প্রচলন আছে।
4. মিষ্টান্ন – নারকেল নাড়ু, সন্দেশ, রসমালাই, মিষ্টি দই ইত্যাদি।
5. ফল – কলা, আপেল, আঙুর, আম, পেয়ারা, ডাবের শাঁস।
6. নাড়ু ও মোয়া – নারকেল নাড়ু, তিল নাড়ু, মুড়ির মোয়া।
7. শীতল পানীয় – দুধ, সরবত, গঙ্গাজল ও মধু মেশানো জল।
8. বিশেষ ভোগ – কিছু জায়গায় কাঁচকলা, কুমড়ো ও অন্যান্য নিরামিষ তরকারি নিবেদন করা হয়।
ভোগ নিবেদনের নিয়ম:
সমস্ত খাবার নিরামিষ ও বিশুদ্ধ হতে হবে।
দেবীকে নিবেদন করার আগে কেউ তা স্পর্শ করবে না।
ভোগ নিবেদন শেষে প্রসাদ হিসেবে পরিবারের সবাইকে বিতরণ করা হয়।