প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
একটি কন্যাসন্তান শুধু কোনও পরিবারে জন্ম নেওয়া এক শিশুই নয়, সে ভবিষ্যতের এক সম্ভাবনাময় মুখ। একসময় সমাজে মেয়ে হলে বোঝা এই সংস্কার চলত। আজ, পরিস্থিতি অনেকটা বদলেছে। কন্যাসন্তান এখন শিক্ষিত, আত্মনির্ভর, প্রযুক্তিবান ও সচেতন। তবুও, তার আগামীর সুরক্ষার কথা ভাবা অভিভাবকের কর্তব্য ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সঞ্চয়।
একজন কন্যার জীবনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় আসে শিক্ষা, উচ্চশিক্ষা, চাকরি বা উদ্যোগ, বিবাহ বা স্বাধীনভাবে বসবাস, মাতৃত্ব, এমনকি নিজের পরিবারকে সহায়তা করা। এই প্রতিটি ধাপে অর্থ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সাধারণত দেখা যায়, মেয়েরা বহুক্ষেত্রেই নিজেদের প্রয়োজনে পিছিয়ে যায়, কারণ পরিবার যথেষ্ট আর্থিক সঞ্চয় করেনি বা সমাজে কিছু আর্থিক বাধা রয়েছে। তাই, শিশুকন্যার জন্ম থেকেই পরিকল্পিত সঞ্চয় করলে ভবিষ্যতে তার সামনে কোনও কিছুই বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। কবে থেকে শুরু করবেন সঞ্চয়? যত তাড়াতাড়ি, তত ভাল। শিশুর জন্মের পর থেকেই সঞ্চয় শুরু করলে দীর্ঘ সময়ের জন্য সুদ ও মুনাফা জমতে পারে। এটি চক্রবৃদ্ধি হারে বৃদ্ধি পায় এবং ভবিষ্যতে বড় অঙ্কের সহায়তা হিসেবে ফিরে আসে।
কোন খাতে সঞ্চয় করবেন?
১. সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনা (SSY): ভারত সরকারের একটি বিশেষ স্কিম, শুধুমাত্র কন্যাসন্তানের জন্য। এতে ৮% বা তারও বেশি হারে সুদ মেলে, আয়কর ছাড় পাওয়া যায়, এবং ২১ বছর পর্যন্ত সঞ্চয় করলে মোটা অঙ্ক জমে।
২. চাইল্ড এডুকেশন প্ল্যান: অনেক জীবনবীমা কোম্পানিই আজকাল চাইল্ড ফিউচার প্ল্যান নিয়ে এসেছে। এগুলি কন্যার উচ্চশিক্ষা বা বিদেশে পড়াশোনার জন্য ভালো সহায়তা দেয়।
৩. পাবলিক প্রভিডেন্ট ফান্ড (PPF): লম্বা মেয়াদের এই স্কিমেও কন্যার নামে বা পিতামাতার নামে খাতা খুলে সঞ্চয় করলে করছাড় সহ নিশ্চিত ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা যায়।
৪. সিস্টেমেটিক ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান (SIP): মাসে মাত্র ৫০০–১০০০ টাকা করেও SIP করলে ১৫–২০ বছরে বড় অঙ্কের সঞ্চয় গড়ে ওঠে। এটি তুলনামূলক ঝুঁকি যুক্ত হলেও লাভজনক।
৫. স্বর্ণে সঞ্চয় (Gold Bonds বা Physical Gold):বিয়ে বা অন্য প্রয়োজনে স্বর্ণের দরকার হলে আগে থেকেই স্বর্ণে বিনিয়োগ করা বুদ্ধিমানের কাজ।
অভিভাবকরা অনেক সময় নিজেদের নামে সঞ্চয় করে রাখেন। কিন্তু সন্তানের নিজের নামে নির্দিষ্ট খাতায় বা বিমায় টাকা রাখা হলে সেটা কন্যার নিজস্ব সম্পদ হয়। পরবর্তীতে সে সেই অর্থ নিজের প্রয়োজনে, স্বাধীনভাবে ব্যবহার করতে পারে। এটি তাকে আত্মনির্ভর ও আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। শুধু সঞ্চয় করলেই হবে না, কন্যাকে ছোটবেলা থেকেই শেখাতে হবে:
অর্থের গুরুত্ব
বাজেট কীভাবে তৈরি করতে হয়
ব্যয় ও সঞ্চয়ের ভারসাম্য
এই শিক্ষাগুলো কন্যাকে ভবিষ্যতে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে এবং কোনও অবস্থাতেই সে আর্থিকভাবে দুর্বল থাকে না। হঠাৎ কোনো বিপর্যয়, যেমন পরিবারের প্রধানের মৃত্যু বা দুর্ঘটনা এই পরিস্থিতিতে একটি ভালো টার্ম লাইফ ইনশিওরেন্স বা হেল্থ ইনশিওরেন্স কন্যার ভবিষ্যৎ রক্ষা করতে পারে। তাই সঞ্চয়ের পাশাপাশি সুরক্ষাও জরুরি। আজও অনেক পরিবার কন্যাসন্তানের ভবিষ্যতের সঞ্চয় মানেই বিয়ের খরচ ভাবেন। কিন্তু বদলাতে হবে দৃষ্টিভঙ্গি। মেয়ের জন্য সঞ্চয় মানে শুধু বিয়ের গয়না বা দেনমোহর নয় বরং তার নিজের পছন্দ, স্বাধীনতা, স্বপ্ন ও সুরক্ষার জন্য তৈরি মজবুত ভিত্তি।
সঞ্চয় পরিকল্পনার এক ঝলক তালিকা:
উদ্দেশ্য সঞ্চয় মাধ্যম সময়কাল প্রত্যাশিত মুনাফা
প্রাথমিক শিক্ষা সুকন্যা সমৃদ্ধি 5–10 বছর 8% সুদ
উচ্চশিক্ষা SIP / Child Plan 10–15 বছর 10–12% রিটার্ন
বিবাহ / উদ্যোগ PPF + গোল্ড 15–20 বছর 7–9%
স্বাস্থ্য ও বিপর্যয় হেল্থ ইনশিওরেন্স সারা জীবন জরুরি সুরক্ষা
একজন কন্যাসন্তানকে সুরক্ষিত ও আত্মনির্ভর ভবিষ্যৎ দেওয়া শুধুই অর্থনৈতিক দায়িত্ব নয় এটি এক গভীর ভালবাসার প্রকাশ। যত্ন করে গড়া প্রতিটি সঞ্চয় তাঁকে এনে দিতে পারে স্বপ্ন দেখার সাহস, নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার শক্তি। তাই আজই শুরু করুন সঞ্চয় ছোট ছোট কিস্তিতে হলেও। কারণ, আগামীর আলো কন্যার চোখে, আর সেই আলো জ্বালাতে প্রয়োজন একটি দৃঢ়, আর্থিক ভিত।