প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
হনুমান জয়ন্তী হল ভগবান হনুমানের জন্মোৎসব, যা হিন্দু ধর্মে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জনপ্রিয় উৎসব। ভক্তরা এই দিনে ভগবান হনুমানের জন্মের স্মরণে উপবাস, পূজা, হোম-যজ্ঞ ও নানা ধর্মীয় কার্যক্রম পালন করেন।
ইতিহাস ও মাহাত্ম্য:
হনুমানজি কে বজরংবলী, অঞ্জনেয়, পবনপুত্র নামেও ডাকা হয়। তিনি ভগবান শিবের এক রূপ এবং রামভক্ত হিসেবে শ্রীরামচন্দ্রের অন্যতম প্রধান ভক্ত ও সহচর। তাঁর অসীম শক্তি, ভক্তি, সাহস ও জ্ঞানের জন্য তিনি পূজিত।
পালনের রীতি:
হনুমান চালিসা পাঠ
রাম নাম সংকীর্তন
উপবাস ও প্রসাদ বিতরণ
মন্দিরে বিশেষ পূজা ও মাঙ্গলিক পাঠ
শোভাযাত্রা ও ধর্মীয় আলোচনা
২০২৫ সালে হনুমান জয়ন্তী কবে?
২০২৫ সালে হনুমান জয়ন্তী পড়বে – ১২ই এপ্রিল, শনিবার।
এই দিনটি চৈত্র পূর্ণিমা তিথিতে পড়ে, যা হনুমানের জন্মতিথি হিসেবে পালিত হয়।
হনুমান জয়ন্তীর ইতিহাস ও মাহাত্ম্য
হনুমান জয়ন্তী হিন্দু ধর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব, যা ভগবান হনুমান-এর জন্মতিথি হিসেবে পালিত হয়। পৌরাণিক মতে, তিনি অঞ্জনা ও কেশরীর পুত্র এবং বায়ু দেবতার আশীর্বাদে জন্মগ্রহণ করেন, তাই তাঁকে পবনপুত্র হনুমান বলা হয়। ভগবান হনুমান ছিলেন ভগবান রামচন্দ্রের অটল ভক্ত ও রামায়ণের এক বীর চরিত্র। রামায়ণের কাহিনিতে তাঁর বীরত্ব, বুদ্ধিমত্তা, ভক্তি ও আত্মত্যাগ বিশেষভাবে চিত্রিত হয়েছে — যেমন সীতা মাতার সন্ধানে লঙ্কা গমন, অশোকবনে সীতার সাথে দেখা, রামের বার্তা পৌঁছে দেওয়া, এবং লক্ষ্মণের প্রাণ বাঁচাতে সঞ্জীবনী বুটি আনয়ন।
১. ভক্তির প্রতীক:
হনুমানজির নিঃস্বার্থ ভক্তি ও আনুগত্য ভগবান রামের প্রতি আজও আদর্শ হিসেবে বিবেচিত হয়। তিনি শিখিয়েছেন কীভাবে নিঃস্বার্থভাবে ঈশ্বর ও ধর্মের সেবায় নিজেকে নিবেদন করতে হয়।
2. শক্তি ও সাহসের আদর্শ:
হনুমানকে বজরংবলী বলা হয় — যার দেহ বজ্রের মতো কঠিন। তাঁর বীরত্ব, অপরিসীম শক্তি ও বিপদের মুখে সাহস বজায় রাখার ক্ষমতা তাঁকে যুব সমাজের অনুপ্রেরণা করে তোলে।
3. রোগ ও ভয় থেকে মুক্তি:
ভগবান হনুমানের নাম জপ ও পূজার মাধ্যমে রোগ, ভয়, অশুভ শক্তি ও দুঃখ থেকে মুক্তি পাওয়া যায় বলে বিশ্বাস করা হয়।
4. হনুমান চালিসার মাহাত্ম্য:
হনুমান চালিসা পাঠ করার মাধ্যমে ভক্তরা মানসিক শান্তি, আত্মবিশ্বাস ও নিরাপত্তা লাভ করেন।
হনুমান জয়ন্তী কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি একটি আদর্শের স্মরণদিবস — যে আদর্শে ভক্তি, বীরত্ব, বিনয়, এবং আত্মত্যাগের শিক্ষা আছে। এই দিনটি ভক্তদের মনে সাহস, আত্মবিশ্বাস ও ভক্তির নবজাগরণ ঘটায়।
হনুমান জয়ন্তীর পুজোর নিয়ম
হনুমান জয়ন্তীর দিনে পবিত্রভাবে ও নিষ্ঠার সাথে পুজো করলে জীবনে সাহস, ভক্তি ও সাফল্য আসে বলে বিশ্বাস করা হয়। নিচে পুজোর নিয়ম ধাপে ধাপে দেওয়া হল:
১. প্রস্তুতি:
পুজোর আগের দিন বা সকালে স্নান করে পরিষ্কার জামাকাপড় পরুন।
পুজোর স্থান পরিষ্কার করুন।
হনুমানজির মূর্তি বা ছবি প্রতিষ্ঠা করুন।
২. উপকরণ:
লাল ফুল, লাল চন্দন
সিঁদুর, গঙ্গাজল
তুলসী পাতা (শুদ্ধতা)
নারকেল, কলা, মিষ্টান্ন (লাড্ডু বা বুন্দিয়া)
পাঁচ ফল, পাঁচ মিষ্টি
ধূপ, দীপ, ঘি
হনুমান চালিসা, রাম নাম সংকীর্তন বই
৩. পুজোর ধাপ:
ধ্যান ও সংকল্প:
ভগবান হনুমানের ধ্যান করে, আমি এই পুজো নিষ্ঠা ও শ্রদ্ধার সাথে করছি— এই মনের সংকল্প নিন।
অর্ঘ্য ও স্নান:
গঙ্গাজল দিয়ে হনুমানজিকে প্রতীকী স্নান করান।
অলংকার ও সাজসজ্জা:
সিঁদুর, চন্দন, ফুল ও বস্ত্র নিবেদন করুন।
ভোগ নিবেদন:
নারকেল, ফল, মিষ্টি ও লাড্ডু ভোগ হিসেবে অর্পণ করুন। হনুমানজির প্রিয় খাবার বুন্দিয়া লাড্ডু।
প্রার্থনা:
প্রদীপ ও ধূপ জ্বালিয়ে হনুমান চালিসা বা সুন্দরকাণ্ড পাঠ করুন। শেষে আরতি করুন।
প্রসাদ বিতরণ:
পুজো শেষে ভক্তদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ করুন।
উপবাস (ঐচ্ছিক):
অনেকে এই দিনে নির্জলা উপবাস বা ফলাহার উপবাস পালন করেন।
দান ও সেবা:
গরিবদের দান, হনুমান মন্দিরে দান, গরু ও পশু-পাখিকে খাওয়ানো অত্যন্ত শুভ বলে মনে করা হয়।
হনুমান জয়ন্তীতে ভগবান হনুমানকে তাঁর প্রিয় ভোগ নিবেদন করলে তিনি প্রসন্ন হন এবং ভক্তদের আশীর্বাদ প্রদান করেন। নিচে কয়েকটি প্রধান ভোগের তালিকা দেওয়া হলো:
মোতিচুরের লাড্ডু
বেসন ও ঘি দিয়ে তৈরি এই লাড্ডু বজরংবলীর অত্যন্ত প্রিয়।
বোঁদে
পুজোর পর বোঁদের ভোেগ অর্পণ করলে ভগবান হনুমান সন্তুষ্ট হন।
বেসনের লাড্ডু
বেসন ও চিনি দিয়ে তৈরি এই মিষ্টি ভগবান হনুমানের সবথেকে প্রিয় ভোগ।
এবছর হনুমান জয়ন্তী কবে?
এই বছর, হনুমান জয়ন্তী ১২ই এপ্রিল, শনিবার পালিত হবে। এই দিনটি ভগবান হনুমানের জন্মবার্ষিকী হিসেবে উদযাপিত হয়, এবং ভক্তরা উপবাস, মন্দির দর্শন, এবং বিশেষ পূজা করে তাঁর আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন। পশ্চিমবঙ্গ সহ ভারতের বেশিরভাগ অঞ্চলে হনুমান জয়ন্তী চৈত্র মাসের পূর্ণিমা তিথিতে উদযাপিত হয়। এই বছর পূর্ণিমা তিথি শুরু হবে ১২ই এপ্রিল ভোের ৩:২১ মিনিটে এবং শেষ হবে ১৩ই এপ্রিল সকাল ৫:৫১ মিনিটে।
তবে, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে এই উৎসব বিভিন্ন তারিখে পালিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানায় এটি ৪১ দিনব্যাপী উদযাপিত হয়, যা চৈত্র পূর্ণিমা থেকে বৈশাখ মাসের কৃষ্ণ পক্ষের দশমী পর্যন্ত চলে।