19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

মাতৃত্বের নতুন সহযাত্রী: চিকিৎসাশাস্ত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অভূতপূর্ব ভূমিকা

স্বাস্থ্য

নিজস্ব প্রতিনিধি


মাতৃত্ব একটি জীবনের সৃষ্টি  শারীরিক, মানসিক ও সামাজিকভাবে গভীর একটি অধ্যায়। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে মাতৃত্ব আজ আগের চেয়ে অনেক নিরাপদ ও সহায়ক হয়েছে। আর এই উন্নতির সাম্প্রতিক এক বিপ্লব ঘটিয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)। আজ AI ব্যবহৃত হচ্ছে গর্ভাবস্থার পর্যবেক্ষণে, জটিল রোগের পূর্বাভাসে, সন্তান প্রসবের ঝুঁকি নিরূপণে, এমনকি মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তায়ও। এটি চিকিৎসকদের হাতে তুলে দিচ্ছে আরও নিখুঁত, দ্রুত ও ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা।

এই প্রতিবেদনে আমরা জানব, কীভাবে AI আধুনিক মাতৃত্বে চিকিৎসার সহায়তা করছে, কী কী সুবিধা ও চ্যালেঞ্জ এর সঙ্গে জড়িত, এবং ভবিষ্যতে এর সম্ভাবনা কতদূর প্রসারিত হতে পারে।

১. মাতৃত্ব ও চিকিৎসায় প্রযুক্তির আগমন

মাতৃত্বের যাত্রা একসময় ছিল সম্পূর্ণভাবে প্রকৃতিনির্ভর ও অনিশ্চয়তায় ভরা। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে এই অভিজ্ঞতা এখন অনেক বেশি নিরাপদ, নিয়ন্ত্রিত ও নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে আল্ট্রাসাউন্ড, হরমোন বিশ্লেষণ, জেনেটিক স্ক্রিনিং এবং সহায়ক প্রজনন প্রযুক্তি (যেমন IVF) মাতৃত্বের ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। সম্প্রতি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), রোবোটিক সার্জারি, টেলিমেডিসিন এবং ডিজিটাল হেলথ অ্যাপ মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্যপরীক্ষা, ঝুঁকি নির্ণয় ও মানসিক সহায়তায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এখন একজন গর্ভবতী নারী তার মোবাইলেই প্রতিদিনের শারীরিক লক্ষণ পর্যবেক্ষণ করতে পারেন, আর চিকিৎসক দূর থেকেও তা বিশ্লেষণ করতে পারেন। ফলে মাতৃত্ব ও চিকিৎসার এই সম্মিলন প্রযুক্তির ছোঁয়ায় হয়ে উঠছে আরও মানবিক, সুনির্ভর এবং ভবিষ্যতমুখী।

২. গর্ভাবস্থার পূর্বাভাস নির্ধারণে AI

আধুনিক চিকিৎসায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence) গর্ভাবস্থার সময় মা ও শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকি আগে থেকেই শনাক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। AI প্রযুক্তি বিশাল পরিমাণ মেডিকেল ডেটা (যেমন: ব্লাড প্রেসার, হরমোন লেভেল, আল্ট্রাসাউন্ড রিপোর্ট, ওজন বৃদ্ধি, পূর্বের গর্ভধারণ ইতিহাস) বিশ্লেষণ করে গর্ভবতী নারীর সম্ভাব্য জটিলতা যেমন প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়া (উচ্চ রক্তচাপ), গেস্টেশনাল ডায়াবেটিস, প্রিম্যাচিউর ডেলিভারি ইত্যাদির পূর্বাভাস দিতে পারে। এই তথ্যের ভিত্তিতে চিকিৎসকরা আগে থেকেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারেন, যা মা ও শিশুর জন্য বিপদ অনেকটাই কমিয়ে দেয়। এছাড়া, কিছু AI-চালিত অ্যাপ ও স্মার্ট ডিভাইস গর্ভবতী নারীদের দৈনন্দিন লক্ষণ ট্র্যাক করে ও স্বয়ংক্রিয়ভাবে সতর্ক সংকেত দেয়। ফলে চিকিৎসা হয় আরও ব্যক্তিকেন্দ্রিক, দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য। এই প্রযুক্তির প্রয়োগ ভবিষ্যতের মাতৃত্বকে করে তুলছে আরও নিরাপদ ও বিজ্ঞানসম্মত।

৩. সন্তান প্রসবে সহায়ক রোবোটিক প্রযুক্তি

আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে রোবোটিক প্রযুক্তি সন্তান প্রসবের জটিল প্রক্রিয়াকে আরও নিরাপদ ও সুনির্ভর করে তুলছে। বিশেষ করে, জটিল সিজারিয়ান অপারেশন বা জন্মকালীন জটিলতায় AI-চালিত রোবোটিক সার্জারি সিস্টেম চিকিৎসকদের আরও নিখুঁতভাবে কাজ করতে সহায়তা করে। রোবটিক হাতের মাধ্যমে সূক্ষ্ম কাটাছেঁড়ার পাশাপাশি রক্তপাত, ঝুঁকি ও অপারেশনের সময় অনেকটাই কমিয়ে আনা যায়। এছাড়া কিছু উন্নত দেশে রোবোটিক ডেলিভারি অ্যাসিস্ট সিস্টেম ব্যবহার করে গর্ভবতী নারীর শরীরের গতিবিধি, জরায়ুর সংকোচন, এমনকি শিশুর অবস্থান রিয়েল টাইমে পর্যবেক্ষণ করে ডেলিভারির পরিকল্পনা নির্ধারণ করা হয়। ফলে জরুরি সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়, এবং মা ও শিশুর উভয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। যদিও এই প্রযুক্তি এখনো উন্নত দেশেই সীমিত, তবে ভবিষ্যতে এর বিস্তৃত ব্যবহার মাতৃত্বকালীন জটিলতা কমাতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

৪. মানসিক স্বাস্থ্যে AI-এর ভূমিকা

বর্তমান যুগে মানসিক স্বাস্থ্য একটি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ, বিশেষ করে মাতৃত্বকালীন ও প্রসব-পরবর্তী সময়ে নারীরা হতাশা, উদ্বেগ ও আবেগজনিত নানা সমস্যায় ভোগেন। এই পরিস্থিতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। AI-ভিত্তিক অ্যাপ, চ্যাটবট ও মুড ট্র্যাকার এখন নিয়মিতভাবে ব্যবহারকারীর মানসিক অবস্থা বিশ্লেষণ করে হতাশা বা উদ্বেগের লক্ষণ চিহ্নিত করতে পারে এবং সময়মতো পরামর্শ দেয়। যেমন, কিছু অ্যাপ ব্যবহারকারীর কথাবার্তা, ঘুমের ধরণ, সামাজিক যোগাযোগ বা স্মার্টওয়াচ ডেটা বিশ্লেষণ করে বুঝতে পারে তারা মানসিকভাবে বিপন্ন কি না। তারপর সেই তথ্যের ভিত্তিতে চিকিৎসকের সঙ্গে সংযোগ করে বা ধাপে ধাপে কাউন্সেলিং পরামর্শ দেয়।

৫. স্বয়ংক্রিয় তথ্য বিশ্লেষণ ও চিকিৎসকের সিদ্ধান্তে সহায়তা

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রতিদিন তৈরি হয় অগণিত স্বাস্থ্যতথ্য রক্তপরীক্ষার রিপোর্ট, আল্ট্রাসাউন্ড ডেটা, ওষুধের ইতিহাস, রোগীর শারীরিক লক্ষণ ইত্যাদি। এই বিপুল তথ্য বিশ্লেষণ করে দ্রুত ও নিখুঁত সিদ্ধান্ত নেওয়া চিকিৎসকদের জন্য প্রায়ই চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। এখানেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। AI অ্যালগরিদম এই তথ্যগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য ঝুঁকি নির্ধারণ, রোগ নির্ণয়, এবং চিকিৎসার সেরা বিকল্প তুলে ধরতে পারে। যেমন: একটি গর্ভবতী নারীর অতীতের রেকর্ড, বর্তমান হরমোনের মাত্রা ও আল্ট্রাসাউন্ড ডেটা বিশ্লেষণ করে AI বুঝতে পারে তিনি প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়া বা প্রসবজনিত জটিলতায় পড়তে পারেন কি না। এর ফলে চিকিৎসক আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে পারেন, এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হন। এই প্রযুক্তি চিকিৎসকদের সহকারী হিসেবে কাজ করে সময় বাঁচায়, মানবিক ভুল কমায়, এবং চিকিৎসা আরও ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও ফলপ্রসূ করে তোলে।

৬. সুবিধা ও সম্ভাবনা

মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্যসেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহারের ফলে তৈরি হয়েছে অসংখ্য সুবিধা ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনা। AI নির্ভর প্রযুক্তি এখন গর্ভাবস্থার জটিলতা আগেই শনাক্ত করতে পারে, যেমন প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়া বা গর্ভকালীন ডায়াবেটিস। এর ফলে চিকিৎসা শুরু হয় আগেই, কমে মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর হার। এছাড়া AI-চালিত অ্যাপ বা রোবোটিক প্রযুক্তি চিকিৎসাকে করে তুলছে আরও নিখুঁত, দ্রুত ও কম ঝুঁকিপূর্ণ। দূরবর্তী বা প্রত্যন্ত এলাকায় বসবাসকারী গর্ভবতী নারীরাও এখন টেলিমেডিসিন ও AI নির্ভর স্বাস্থ্য অ্যাপের মাধ্যমে নিয়মিত পরামর্শ ও নজরদারি পাচ্ছেন। এটি স্বাস্থ্যসেবায় সমতা আনছে। ভবিষ্যতে AI-এর মাধ্যমে ব্যক্তিকেন্দ্রিক মাতৃত্ব পরিকল্পনা, স্বয়ংক্রিয় প্রসব পূর্বাভাস, এমনকি ডিপ্রেশন প্রতিরোধেও অগ্রিম ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব হবে যা মাতৃত্বকে আরও নিরাপদ ও সহজ করে তুলবে।

৭. চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতা

যদিও মাতৃত্বকালীন চিকিৎসায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) অভাবনীয় উন্নতি এনেছে, তবে এর কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। প্রথমত, AI নির্ভর স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে একটি বড় উদ্বেগ হলো ডেটা গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা। গর্ভবতী নারীর ব্যক্তিগত ও শারীরিক তথ্য যদি নিরাপদ না থাকে, তবে তা অপব্যবহারের আশঙ্কা থাকে।
দ্বিতীয়ত, AI প্রযুক্তির প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা অনেক সময় চিকিৎসকদের মানবিক বিচারের জায়গা সংকুচিত করে দেয়। রোগীর আবেগ, সামাজিক বাস্তবতা বা সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি এসব সবসময় প্রযুক্তি অনুধাবন করতে পারে না। তৃতীয়ত, উন্নয়নশীল ও গ্রামীণ এলাকায় এখনো উন্নত প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণের অভাব AI নির্ভর চিকিৎসাকে সীমিত করে রেখেছে। সেই সঙ্গে উচ্চমূল্যের যন্ত্রপাতি ও ইন্টারনেট সংযোগের সীমাবদ্ধতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সবশেষে, AI এখনো পূর্ণাঙ্গ সিদ্ধান্তগ্রহণকারী নয় এটি একটি সহায়ক প্রযুক্তি, কিন্তু মানবিক সংবেদনশীলতা ও অভিজ্ঞতা দিয়ে চালিত চিকিৎসকের বিকল্প হতে পারে না।

মাতৃত্ব এক অমূল্য অভিজ্ঞতা  যা যতটা আনন্দের, ততটাই দায়িত্বের। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান যখন AI-এর সহায়তায় মাতৃত্বকে নিরাপদ ও সহজ করতে এগিয়ে আসছে, তখন তা নিঃসন্দেহে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন। তবে এই প্রযুক্তির ব্যবহারে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি যেন প্রযুক্তি সহায়ক হয়, নিয়ন্ত্রণকারী নয়। ভবিষ্যতের চিকিৎসা হবে প্রযুক্তিনির্ভর, কিন্তু তা হবে মানবিক ছোঁয়ায় সমৃদ্ধ। কারণ একটি শিশুর জন্ম কেবল বৈজ্ঞানিক নয়, তা একটি পরিবারের আবেগ, সমাজের ভবিষ্যৎ। আর এই যাত্রায় AI হবে নারীর পাশে এক নির্ভরযোগ্য সহচর।

Archive

Most Popular