প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
মহাবীর জয়ন্তী জৈন ধর্মাবলম্বীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। এটি জৈন ধর্মের ২৪তম তীর্থঙ্কর ভগবান মহাবীর-এর জন্মদিন উদযাপন করে পালন করা হয়। এই উৎসব সাধারণত চৈত্র মাসের শুক্ল পক্ষের ত্রয়োদশী তিথিতে পালিত হয়, যা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী মার্চ অথবা এপ্রিল মাসে পড়ে।
ভগবান মহাবীর সম্পর্কে কিছু তথ্য:
জন্ম: খ্রিস্টপূর্ব ৫৯৯ সালে, বিহারের বৈশালী রাজ্যের কুণ্ডগ্রামে।
আসল নাম: বর্ধমান
তিনি জৈন ধর্মকে পুনর্জীবিত করেন এবং অহিংসা, সত্য, অপরিগ্রহ, ব্রহ্মচর্য ও অচৌর্য এই পাঁচটি মূল নীতি প্রচার করেন।
মহাবীর জয়ন্তী পালনের উপায়:
উপবাস, প্রার্থনা ও ধর্মীয় সভা।
জৈন মন্দিরে পূজা ও শোভাযাত্রা।
মহাবীরের শিক্ষা ও জীবনদর্শন নিয়ে আলোচনা ও নাটক।
ইতিহাস:
ভগবান মহাবীর ছিলেন জৈন ধর্মের ২৪তম ও সর্বশেষ তীর্থঙ্কর। তিনি খ্রিস্টপূর্ব ৫৯৯ সালে ভারতের বর্তমান বিহার রাজ্যের কুণ্ডগ্রাম-এ জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন রাজা সিদ্ধার্থ এবং মাতা ছিলেন ত্রিশলা দেবী। তিনি রাজকীয় জীবন ত্যাগ করে ৩০ বছর বয়সে সংসার ত্যাগ করেন এবং কঠোর সাধনার মাধ্যমে আত্মজ্ঞান লাভ করেন। প্রায় ১২ বছর তপস্যা করার পর তিনি কেবল জ্ঞান বা সর্বজ্ঞতা অর্জন করেন। তিনি মানুষের মধ্যে অহিংসা, সত্য, ব্রহ্মচর্য, অচৌর্য (চুরি না করা), এবং অপরিগ্রহ (সম্পত্তির প্রতি আসক্তি ত্যাগ) – এই পাঁচটি মৌলিক নীতির প্রচার করেন, যা পঞ্চ মহাব্রত নামে পরিচিত।
মাহাত্ম্য:
১. অহিংসার বার্তা: মহাবীরের অন্যতম বড় শিক্ষা ছিল প্রাণীর প্রতি করুণা ও অহিংসা। তাঁর এই আদর্শ আজও পরিবেশ ও প্রাণীসুরক্ষার জন্য প্রাসঙ্গিক।
২. নৈতিক জীবনযাত্রা: মহাবীর জৈন ধর্মের মাধ্যমে এক উচ্চতর নৈতিক ও আধ্যাত্মিক জীবনধারার পথ দেখান।
৩. সমতা ও সহিষ্ণুতা: তিনি শ্রেণীভেদ, জাতিভেদ, ধর্মভেদের ঊর্ধ্বে উঠে সকলের প্রতি সমান দৃষ্টিভঙ্গি প্রচার করেছিলেন।
৪. আত্মশুদ্ধির পথ: তাঁর জীবন দর্শন আত্মসংযম, ত্যাগ ও ধ্যানের মাধ্যমে মুক্তির পথ দেখায়।
মহাবীর জয়ন্তী কেবলমাত্র একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি মানবতাবাদ, নৈতিকতা ও অহিংসার প্রতীক। তাঁর শিক্ষা আজও সমাজে শান্তি, সহানুভূতি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রাসঙ্গিক। কলকাতায় মহাবীর জয়ন্তী জৈন সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান উৎসব হিসেবে পালিত হয়।
শহরের বিভিন্ন জৈন মন্দিরে এই উপলক্ষে বিশেষ পূজা, শোভাযাত্রা ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। প্রধান মন্দিরগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
1. পার্থসারথি জৈন মন্দির (পার্থসারথি টেম্পল):
গৌরীবাড়ি, মানিকতলা এলাকায় অবস্থিত এই মন্দিরটি ১৮৬৭ সালে রায় বদ্রীদাস বাহাদুর মুকিম দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়। মহাবীর জয়ন্তী উপলক্ষে এখানে বিশেষ পূজা ও শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়, যা বহু ভক্ত ও দর্শনার্থীকে আকর্ষণ করে।
2. শ্রী মহাবীর দিগম্বর জৈন মন্দির:
ভবানীপুরের চৌরঙ্গী টেরেসে অবস্থিত এই মন্দিরে মহাবীর জয়ন্তী উপলক্ষে বিশেষ পূজা ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়।
3. ভবানীপুর গুজরাটি জৈন শ্বেতাম্বর মূর্তিপূজক সংঘ:
এই সংঘের মন্দিরেও মহাবীর জয়ন্তী যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়, যেখানে ভক্তরা প্রার্থনা ও ধর্মীয় কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেন।
এই মন্দিরগুলোর পাশাপাশি কলকাতার অন্যান্য জৈন মন্দিরেও মহাবীর জয়ন্তী উদযাপিত হয়। উৎসবের সময় মন্দিরগুলোতে বিশেষ সজ্জা, প্রার্থনা সভা, ধর্মীয় বক্তৃতা ও শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়, যেখানে ভক্তরা মহাবীরের শিক্ষা ও আদর্শ স্মরণ করেন। আপনি যদি মহাবীর জয়ন্তীতে এই মন্দিরগুলো পরিদর্শন করতে চান, তবে নির্দিষ্ট মন্দিরের সময়সূচী ও অনুষ্ঠান সম্পর্কে আগেই জেনে নেওয়া ভালো।
এবছর এই তিথি কবে?
এই বছর, ২০২৫ সালে, মহাবীর জয়ন্তী ১০ই এপ্রিল, বৃহস্পতিবার পালিত হবে। এই দিনটি জৈন ধর্মাবলম্বীদের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি ভগবান মহাবীরের জন্মবার্ষিকী উদযাপন করে।
ত্রয়োদশী তিথি সম্পর্কিত সময়সূচী:
শুরু: ৯ই এপ্রিল, ২০২৫, রাত ১০:৫৫ মিনিটে
শেষ: ১১ই এপ্রিল, ২০২৫, রাত ১:০০ মিনিটে