প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
আমাদের চায়ের কাপে এক চামচ মধু যেমন স্বাদ বাড়ায়, তেমনই শরীরের জন্য উপকারীও। শহরের স্বাস্থ্যসচেতন মানুষ যখন অর্গানিক মধু বা সুন্দরবনের বনে-তোলা খাঁটি মধু বলে গলা ফাটান, তখন খুব কম জনই ভাবেন, এই মধু তাঁদের কাছে পৌঁছাতে কারা জীবন বাজি রেখে কাজ করছেন। তাঁরা হলেন মৌলি সম্প্রদায় বাংলার গ্রামবাংলায় ছড়িয়ে থাকা এক প্রান্তিক জনজীবনের প্রতিনিধি, যাঁদের জীবনের কেন্দ্রে আছে মৌচাক, অরণ্য আর সংগ্রাম।
সুন্দরবন, ঝাড়গ্রাম, পশ্চিম মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, বীরভূম বা পুরুলিয়ার অরণ্যে বাস করা বহু মানুষ বছরের নির্দিষ্ট সময়ে দল বেঁধে প্রবেশ করেন গভীর বনে উদ্দেশ্য, মৌচাক খুঁজে খাঁটি মধু সংগ্রহ করা। এই পেশাকে সহজভাবে দেখে অনেকে বলেন ফরেস্ট প্রোডাক্ট সংগ্রহ, কিন্তু বাস্তবের অভিজ্ঞতা জানলে বোঝা যায় এ এক গভীর জীবন-মরণ খেলা।
বাঘ, সাপ, বুনো শুয়োর বা দাঁতাল হাতির হঠাৎ হানা
গাছে চড়ে ধোঁয়া দিয়ে মৌচাক নামানোর ঝুঁকি
প্রচণ্ড গ্রীষ্মে দীর্ঘ সময় কাজ করার কষ্ট
প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জামের অভাব
প্রতিটি মৌচাক কাটার আগে তাঁরা বনবিবির বন্দনা করেন, কারণ তাঁদের বিশ্বাস, বন দেবীই তাঁদের রক্ষা করেন বিপদ থেকে। ধর্মবিশ্বাস আর বাস্তবতার এমন এক মেলবন্ধনেই গড়ে উঠেছে এই পেশা।
আপনি যদি আজ শহরের কোনো সুপারমার্কেটে যান, দেখবেন সুন্দরবনের মধু নামে মোড়কে মোড়ানো দামি বোতল, যার দাম ৪০০-১০০০ টাকা অবধি হতে পারে। অথচ এই মধু যারা সংগ্রহ করেন, সেই মৌলিরা হয়তো এক বোতলের দামেরও কম আয় পান গোটা মৌসুমে।
মৌলিদের জীবনে
নেই নির্দিষ্ট আয়
নেই স্বাস্থ্যবিমা
নেই পেনশন বা ভবিষ্যতের নিরাপত্তা
অনেকেই পড়েছেন মধ্যস্বত্বভোগীদের খপ্পরে
অথচ তারা শুধু মধু সংগ্রহ করেন না, বনের বাস্তুতন্ত্র রক্ষায়ও তাঁদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। মৌচাক থেকে নির্দিষ্ট মাত্রায় মধু সংগ্রহ করে বাকি মৌমাছিদের জীবিত রেখে তাঁরা প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করেন। তাঁরা প্রকৃতির প্রকৃত সহযোদ্ধা।
মৌলিদের নিয়ে আজ পর্যন্ত বড় কোনো সরকারি প্রকল্প হয়নি। sporadic উদ্যোগ থাকলেও তা পর্যাপ্ত নয়। সুন্দরবনের কিছু এলাকায় বনদপ্তর তাদের গাইড লাইসেন্স দেয়, কিন্তু পুরো রাজ্যে মৌলি সম্প্রদায়ের জন্য কোনো একক নীতি নেই। শিক্ষার সুযোগ নেই, স্বাস্থ্যব্যবস্থা নেই, বিকল্প জীবিকার প্রশিক্ষণ নেই সব মিলিয়ে তাঁরা জীবনযুদ্ধে একরকম পরিত্যক্ত সৈনিক।
মধুর স্বাদে আমরা যত মুগ্ধ হই না কেন, সেই সোনালি তরলের পেছনে থাকা মানুষগুলোর জীবনের তিক্ততা বুঝতে না পারলে তা হবে মানবতার অপমান। মৌলি সম্প্রদায় বাংলার প্রকৃতিপ্রেমী, পরিশ্রমী, অথচ অবহেলিত নাগরিক। তাঁদের উন্নয়নের জন্য এখনই প্রয়োজন:
স্থায়ী আয় নিশ্চিত করা
সুরক্ষা সরঞ্জামের ব্যবস্থা
বনজীবী কর্মীদের জন্য সরকারি স্বীকৃতি ও স্বাস্থ্যবিমা
তাঁদের বাচ্চাদের শিক্ষা ও বিকল্প জীবিকার প্রশিক্ষণ
বাংলার মধু শুধু স্বাদের নয়, এই মধু বহন করে মৌলিদের রক্ত, ঘাম আর সাহসের গল্প। আমরা যখন এক চামচ মধু চায়ে মেশাই, তখন ভুলে যাই তার পেছনে থাকা প্রাণান্তকর সংগ্রামকে। সময় এসেছে তাঁদের কাজের যথাযথ মর্যাদা দেওয়ার, তাঁদের জীবনে আলো পৌঁছে দেওয়ার। কারণ বাংলার প্রকৃতি যতটা সুন্দর, তার রক্ষকরাও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। চা-র সাথে মধু খান, কিন্তু ভুলবেন না প্রতিটি ফোঁটার পেছনে আছে এক মৌলির রক্ত, ঘাম আর সাহস। তাঁদের পাশে দাঁড়ানোই প্রকৃত সামাজিক দায়িত্ব।