19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

মাসী নন পৌর্ণমাসী। রথে চেপে কোথায় যান জগন্নাথ?

প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিনিধি


শ্রীজগন্নাথের রথযাত্রা শুধু এক ধর্মীয় উৎসব নয়, এ যেন এক পুরাকালের গভীর প্রেমগাঁথা। রথযাত্রার মূল কেন্দ্র পুরীর শ্রীমন্দির, কিন্তু এই কদিনের গন্তব্য, গুন্ডিচা মন্দির, যেন অনেক বেশি আবেগ, স্মৃতি আর অলৌকিকতা বহন করে। লোকমুখে যাকে বলা হয় মাসির বাড়ি, আসলে তা এক গোপন লীলাক্ষেত্র ভক্তিরসের বৃন্দাবন, যেখানে রাজার আড়াল ভেঙে কৃষ্ণ হয়ে ওঠেন সেই চিরপরিচিত কানাই।

পুরীর শ্রীমন্দির যেন দ্বারকার সিংহাসন। বছরের অধিকাংশ সময়, রাজদর্শনে সেজে থাকেন মহাপ্রভু, ত্রিমূর্তি রূপে জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রা। শাস্ত্রবর্ণিত শ্রীকৃষ্ণ কলিকালে জগন্নাথ রূপে অবতীর্ণ এই বিশ্বাসের শরিক হয়ে মহাপ্রভু রাজপাট চালান রত্নসিংহাসনে বসে। কিন্তু একমাত্র রথযাত্রার সময়, তিনি রাজদেহ ত্যাগ করে ফিরে যান অতীত প্রেমের স্মৃতিবহ বৃন্দাবনে। আর সেই বৃন্দাবনই হলো গুন্ডিচা মন্দির।

এই সাত দিনের বিচরণ যেন রাজার কুহক ভেঙে বেরিয়ে আসা কৃষ্ণের। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, গুন্ডিচা মন্দির আসলে শ্রীকৃষ্ণের মাসির বাড়ি। তবে এই মাসি কোনো রক্তসম্পর্কের আত্মীয়া নন। অনেকে মনে করেন, এখানে মাসি শব্দটি এসেছে পৌর্ণমাসী থেকে। পৌর্ণমাসী ছিলেন এক বিশেষ গোপী, যাঁর আশ্রম ছিল বৃন্দাবনে। স্থান-কালের সীমানা ডিঙিয়ে পৌর্ণমাসীর আশ্রমই পরবর্তীকালে গুন্ডিচা মন্দির নামে পরিগণিত হয়েছে। মাহেশের জগন্নাথ মন্দিরের বর্তমান সেবায়েত তমালকৃষ্ণ অধিকারীর কথায়, পৌর্ণমাসী ছিলেন সেই গোপী, যিনি কৃষ্ণকে ছেড়ে আসতে পারেননি কখনও। তিনিই এই গুন্ডিচা নতুন নামে, নতুন রূপে।

লোককথা বলে, বৃন্দাবন ত্যাগ করে যখন শ্রীকৃষ্ণ দ্বারকার রাজা হয়ে ওঠেন, তখন গোপীগণ আর সহজে তাঁর দর্শন পেতেন না। তাঁরা একদিন দলবেঁধে চলে যান দ্বারকা। কিন্তু সেখানে রাজপ্রাসাদের রক্ষণব্যূহ ভেদ করে কৃষ্ণের কাছে পৌঁছনো তাঁদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। বিষণ্ণ মনে ফিরে আসেন তাঁরা। সেই অনুচ্চারিত বিরহবেদনা কৃষ্ণের হৃদয়েও প্রতিধ্বনিত হয়। তাই তিনি নাকি প্রতিজ্ঞা করেন, প্রতি বছর সাত দিনের জন্য ফিরে যাবেন গোপীগণের মাঝে, পৌর্ণমাসীর আশ্রমে। সেই প্রতিশ্রুতিই বাস্তব রূপ পায় রথযাত্রায়।

গুন্ডিচা মন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও এক কিংবদন্তি। অনেকের মতে, পুরীর রাজা ইন্দ্রদুম্ন্যের স্ত্রী গুন্ডিচা দেবীর নামেই মন্দিরটির নামকরণ। এমনকি কেউ কেউ বলেন, গুন্ডিচা রানিই প্রথম রথযাত্রার প্রচলন করেন। দেব বিশ্বকর্মা যখন জগন্নাথ মূর্তি নির্মাণে ব্যস্ত, তখন রানী গুন্ডিচা ভুলবশত সেই অপূর্ণ মূর্তি দর্শন করেন এবং তাতেই মোহিত হন। তিনি রাজাকে অনুরোধ করেন, যেন সেই অপূর্ব মূর্তির জন্য আলাদা একটি মন্দির নির্মাণ করা হয়। এই কারণে গুন্ডিচা মন্দিরকে কেউ বলেন প্রেমের শ্রদ্ধাঞ্জলি, কেউ বলেন নারীর একান্ত ভক্তিরূপ।

আরও এক জনশ্রুতি বলে, গুন্ডিচা আদতে কোনও মানবী নন, বরং স্থানীয় এক দেবী যিনি গুটি বসন্তের মতো মহামারির হাত থেকে ভক্তদের রক্ষা করেন। ফলে, গুন্ডিচা মন্দির শুধু ইতিহাস বা পৌরাণিক লীলার স্মারক নয়, এটি লোকবিশ্বাসেরও প্রাণকেন্দ্র। রথযাত্রার সাত দিন জগন্নাথ এখানে থাকেন, গীতগোবিন্দ আবৃত্তিতে মগ্ন হন গোপীগণের প্রেমলীলা দর্শনে। রাসমণ্ডপে তাঁর অধিষ্ঠান ঘটে, আর ভক্তরা যেন প্রাচীন বৃন্দাবনের গন্ধ পায় পূণ্যতীর্থ পুরীর রাজপথে। গুন্ডিচা মন্দির তাই নিছক এক মাসির বাড়ি নয় এটি এক প্রতীক, কৃষ্ণের আত্মার টান, গোপীদের নিরব কান্না, আর ভক্তির নিরন্তর ধারা। রথের চাকা ঘুরতেই থাকে, কিন্তু প্রেমের এই কেন্দ্রীয় বৃত্ত গুন্ডিচা চিরকাল স্থির, নীরব, অথচ প্রগাঢ়। এক গোপন বৃন্দাবন, যেখানে রাজার নয়, প্রেমিক কৃষ্ণের প্রতীক্ষা থাকে।

Archive

Most Popular