19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

নব নীলাচলের রথ: মাহেশের ছশো বছরের ঐতিহ্য..

প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিনিধি


হুগলির মাহেশ আজকের শ্রীরামপুর শহরের এক প্রাণকেন্দ্র এক সময় ছিল নিভৃত এক গ্রাম। অথচ এখানেই ছশো বছরেরও বেশি সময় ধরে চলেছে বাংলার সবচেয়ে প্রাচীন রথযাত্রা উৎসব। পুরীর পরে যে রথযাত্রা ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ভক্তির পরম্পরায় সবচেয়ে বেশি সম্মান ও আবেগ জড়ানো, সেটি হল মাহেশের রথ।চৈতন্যদেব একে আখ্যা দিয়েছিলেন নব নীলাচল নামে। তিনি স্বয়ং মাহেশ ঘুরে গিয়েছিলেন পুরী যাওয়ার পথে। যে সময় বাংলায় ভক্তি আন্দোলন নবজাগরণের রূপ নিচ্ছে, সেই সময় মাহেশ হয়ে উঠেছিল পুরীর এক প্রতিরূপ বাংলার মাটিতে জগন্নাথের আবাস।

মাহেশের রথযাত্রার শিকড় খুঁজতে হলে ফিরতে হবে ১৪শ শতকে, ধ্রুবানন্দ ব্রহ্মচারীর কাহিনিতে। একনিষ্ঠ জগন্নাথভক্ত এই বাঙালি সাধুর আকাঙ্ক্ষা ছিল, তিনি নিজ হাতে প্রভুকে ভোগ নিবেদন করবেন। পুরীর মন্দিরে তিনি অবমাননার শিকার হন। মনের দুঃখে উপবাসে কাটছিল দিন, এমন সময় স্বপ্নে দেখা দেন জগন্নাথদেব। বলেন ভক্ত, বঙ্গদেশের মাহেশ গ্রামে আমি নিমকাঠে আবির্ভূত হব। সেখানেই তুমি আমাকে পূজা করো। এই অলৌকিক নির্দেশনা পেয়ে ধ্রুবানন্দ গঙ্গার তীরে কুটির গড়ে পুজো শুরু করেন। মৃত্যুশয্যায় তাঁর শেষ ইচ্ছায় সাড়া দেন শ্রীচৈতন্য। কমলাকর পিপলাই নামক এক গোপালভক্তকে তিনি নিয়োজিত করেন মাহেশে জগন্নাথ সেবায়। পরে এই কমলাকরই পুরী থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে শুরু করেন মাহেশের রথযাত্রা!

মাহেশে বর্তমানে যে জগন্নাথ মন্দির দেখা যায়, সেটি নির্মাণ করেন ১৭৫৫ সালে কলকাতার ধনী বণিক নয়নচাঁদ মল্লিক। পরে শ্যামবাজারের বসু পরিবারের দেওয়ান কৃষ্ণচন্দ্র বসু ১৮৮৫ সালে তৈরি করেন বিশাল কাঠের রথ, যা এখনও ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রায় ৫০ ফুট উঁচু এই রথে শোভা পান জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা। রথ টানা হয় মাহেশের প্রাচীন মন্দির থেকে জিটি রোড ধরে গুন্ডিচা মন্দির পর্যন্ত, যা মাসির বাড়ি বলে পরিচিত। উল্টোরথে আবার সেই রথ ফেরে মাহেশ মন্দিরে। এই রীতির সঙ্গে পুরোপুরি মেলে পুরীর রথযাত্রার আচার।

মাহেশের রথযাত্রা শুধু ধর্মীয় নয়, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বেও ভরপুর। শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস এসেছিলেন এই রথযাত্রায় অংশ নিতে। বাংলা সাহিত্যের অগ্রপথিক বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর রাধারানি উপন্যাসে এক এগারো বছরের মেয়েকে পাঠান মাহেশের রথমেলায় মালা বিক্রি করতে। সেখানেও ধরা পড়ে এই উৎসবের সর্বজনীনতা, লোকজ প্রাণস্পন্দন। আজ মাহেশ শহরের অঙ্গ। কিন্তু রথযাত্রার সময়ে যেন ফিরে যায় প্রাচীন ঐতিহ্যের কাছে। একমাস ধরে চলে মেলা, বসে দোকানপাট, লোকশিল্পীরা আসেন দূরদূরান্ত থেকে। ধর্মের সঙ্গে মিশে যায় বাঙালির উৎসবপ্রেম। জগন্নাথ এখানে শুধু দেবতা নন, তিনি বাংলার এক আবেগ, রথের দড়িতে টান দেওয়া প্রতিটি মানুষের প্রাণস্পন্দন। মাহেশের রথ শুধুই ধর্মীয় পর্ব নয়, এটি ইতিহাস, সাহিত্য, লোকসংস্কৃতি এবং বাঙালির হাজার বছরের বিশ্বাসের এক অনন্য সংরক্ষণ। নবনীলাচলের এই মহোৎসব বাংলার আত্মপরিচয়ের অমূল্য অধ্যায়।

Archive

Most Popular