19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

নেতাজীর প্রিয় খাওয়া দাওয়া !

প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিনিধি


জন্মের এত বছর পরও নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু আপামর বাঙালি তথা গোটা বিশ্বের মানুষের মনে এক অমোঘ প্রভাব রাখেন। এতগুলো বছর পার হলেও তাঁর জীবন, ব্যক্তিত্ব এবং দেশপ্রেমের কাহিনী মানুষের অন্তরাত্মাকে আজও নাড়া দেয়। তাঁর সংগ্রামী জীবনের পাশাপাশি একটি অদ্ভুত দিকও ছিল খাবারের প্রতি গভীর রুচি ও ভালোবাসা। কটক শহরে জন্মগ্রহণের কারণে তিনি উড়িয়া খাবার পছন্দ করলেও, আদ্যোপান্ত খাদ্যরসিক বাঙালি হওয়ার কারণে প্রাত্যহিক খাদ্য তালিকায় মুগ ডাল, পালং শাকের বাটিচচ্চড়ি, মৌরলা মাছের ঝাল, খিচুড়ি এবং সবজি-ভাতের মতো হালকা খাবার থাকত। অত্যাধিক তেল-মশলা ব্যবহার করা তিনি কখনো পছন্দ করতেন না।

ছাত্রজীবনে প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াকালীন তিনি প্রতিদিন পাশের হিন্দু হোটেলে দ্বিপ্রাহরিক ভোজ সারতেন। গ্রামবাংলার মিষ্টি বিশেষ করে বাড়িতে তৈরি পাটিসাপটা, নাড়ু, রসগোল্লা, পুলি, নারকেলের তক্তি, ছাতুর বরফি এবং চমচম, খেতে তিনি অত্যন্ত পছন্দ করতেন। এছাড়া কলা, দই এবং পরিষ্কার জল তাঁর প্রতিদিনের খাবারের সঙ্গে ছিল অপরিহার্য। চায়ের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল অতুলনীয়; দিনে ২৫-৩০ কাপ চা তিনি খেতেন, কখনো কখনো লেবু বা বিটনুন মিশিয়ে পানীয় হিসেবে। মুখে থাকত সুপুরি, লবঙ্গ ও হরিতকি।

নেতাজির খাদ্যাভ্যাসে শাকসবজি, মাছ এবং হালকা ডাল-ভাতের অগ্রাধিকার ছিল। এক সময় তিনি মাংস ও ডিম পুরোপুরি বাদ দিয়ে শুধুমাত্র মাছ, শাকসবজি এবং কিছু ফল খেতেন। খিচুড়ি, সিদ্ধ ভাত, সোনা মুগ ডাল এবং পুঁইশাক তাঁর প্রিয় খাবারের শীর্ষে ছিল। মিষ্টির তালিকায় তিনি নারকেল দিয়ে তৈরি পদগুলি পছন্দ করতেন চিনির পুলি, নারকেল নাড়ু, তিলের তক্তি, মনোহরা, রসবড়া, সবই তাঁর হৃদয়ে বিশেষ স্থান পেয়েছিল। 

ছাত্রজীবনে কফি হাউসের ৪ নম্বর টেবিলে বসে তিনি চিকেন কাটলেট এবং আড্ডার আনন্দ উপভোগ করতেন। নেতাজীর প্রিয় কিছু খাবারের দোকান আজও স্মৃতি বহন করছে। হাতিবাগানের লক্ষীনারায়ণ সাউ এন্ড সন্সে তাঁর জন্মদিন পালন করা হয়েছিল। প্যারামাউন্টে বিশেষ শরবত তাঁর পছন্দের তালিকায় থাকত। কলেজ স্ট্রিটের ইন্ডিয়ান কফি হাউস এবং ফেভারিট কেবিনে তিনি আড্ডা দিতে আসতেন, বিশেষ করে সূর্য সেন স্ট্রিটের ৪ নম্বর টেবিলে। ভবানী দত্ত লেনের স্বাধীন ভারত হিন্দু হোটেল ছিল তাঁর মাছ-ভাত খাওয়ার প্রিয় স্থান। বিদেশেও রসনাপ্রেম দেখা যায়; ১৯৪১ সালে প্যারিসের  রেস্টুরেন্টে ফরাসি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে রাজনৈতিক আলোচনার সময় তাঁর লাঞ্চ মিটিং অনুষ্ঠিত হয়।

তিনি ছিলেন চায়ের আসক্ত। এছাড়াও সুপারি খাওয়ার অভ্যাস ছিল, যা পরে তিনি হরিতকিতে পরিবর্তন করেন। অতিরিক্ত পরিশ্রম এবং অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাসের কারণে ১৯৩৭ সালে অসুস্থ হয়ে তিনি ডালহৌসিতে হাওয়া বদলের জন্য যান। সেখানে একটি জলাধারের জল খেয়ে পেটের সমস্যা মেটানো হয়, যা আজও “সুভাষ বাউলি” নামে পরিচিত। নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর খাদ্যাভ্যাসে সাধারণতা এবং বাঙালি রুচি দুটোই ছিল স্পষ্ট। ডাল-ভাত, লুচি, দই, কলা, খিচুড়ি, সিদ্ধভাত সবই তাঁর প্রিয়। মিষ্টির মধ্যে নারকেল ভিত্তিক পুলি, রস গোল্লা, চমচম, সন্দেশ, তিলের নাড়ু ছিল বিশেষভাবে প্রিয়। দিনের বড় অংশ চায়ের সঙ্গে কাটত, যা ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। নেতাজীর জীবনের আরেকটি দিক হলো খাদ্য ও রুচির সঙ্গে আত্মসংযম এবং স্বাস্থ্য সচেতনতা। এক সময়ে ডিম এবং মাংস বাদ দিয়ে শুধু শাক-সবজি এবং মাছের প্রতি অগ্রাধিকার দেওয়া, লেবুর শরবত খাওয়া এবং হালকা খাবারের সঙ্গে নিয়মিত চা-শরবত গ্রহণ সবই তাঁর খাদ্যজীবনের অনন্য বৈশিষ্ট্য।

নেতাজীর আদর্শ শুধু দেশের স্বাধীনতার সংগ্রামে সীমাবদ্ধ ছিল না; খাদ্য এবং জীবনধারায়ও তিনি ছিলেন সচেতন এবং রুচিসম্পন্ন। তাঁর রসনাপ্রেমী দিক, প্রিয় খাবারের তালিকা এবং স্মৃতিগুলো আজও বাঙালির মনে উজ্জ্বলভাবে বেঁচে আছে। মাতৃভূমির প্রতি তাঁর ভালোবাসা, দেশনায়কের জীবন এবং খাদ্যরসিকতার সমন্বয় আজও অনুপ্রাণিত করে আমাদের সমাজচেতনাকে। বাঙালি, দেশপ্রেমিক, সংগ্রামী এবং খাদ্যরসিক এই চরিত্রেই লুকানো আছে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর অমরত্ব।

Archive

Most Popular