19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

গয়াতে পিণ্ডদান কেন করা হয় জানেন?

প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিনিধি


হিন্দু ধর্মে পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর এক গুরুত্বপূর্ণ আচার হলো পিণ্ডদান। এই আচারটি সবচেয়ে বেশি প্রচলিত ও পবিত্রভাবে পালন করা হয় বিহারের গয়া নগরীতে। প্রায়শই শোনা যায় পিণ্ড না দিলে পূর্বপুরুষের মুক্তি হয় না। কিন্তু কেন গয়াতে এই পিণ্ডদান? এর পিছনে রয়েছে পুরাণকথা, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং হাজার বছরের ঐতিহ্য।

গয়ায় পিণ্ডদান ইতিহাস ও পুরাণকথা

১. গয়াসুরের কাহিনি:

গয়ার মাহাত্ম্যের মূল উৎস গয়াসুর নামে এক অসুরের কাহিনি। গয়াসুর ছিল এমন এক সাধক, যার দেহে কেউ পিণ্ডদান করলে সঙ্গে সঙ্গে তার পূর্বপুরুষরা মুক্তিলাভ করতেন। দেবতারা এবং ব্রাহ্মণরা তার তপস্যা ও শক্তি দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে ব্রহ্মার কাছে যান। ব্রহ্মা গয়াসুরকে বলেন, পৃথিবীতে ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য তার দেহ দান করতে হবে। গয়াসুর সম্মত হন।

ব্রাহ্মণরা যজ্ঞ করে তার শরীরকে ভূমিতে চেপে ধরেন। যজ্ঞের শেষ পর্বে গয়াসুর অনুরোধ করেন যেহেতু আমার শরীরেই পিণ্ড দিলে পূর্বপুরুষ মুক্তি পেতেন, তাই আমি যেখানে শয়ান, সেই স্থান যেন চিরকাল পিতৃত্রাণের স্থান হয়। সেই থেকে এই স্থানটি গয়া নামে পরিচিত এবং এখানেই পিণ্ডদান করলে পূর্বপুরুষরা পিতৃতরণের সুযোগ পান এমন বিশ্বাস জন্ম নেয়।

২. বেদ ও পুরাণে উল্লেখ:

ব্রহ্ম পুরাণ, গরুড় পুরাণ, অগ্নি পুরাণ, এবং বিষ্ণু ধর্মসূত্র সহ বহু ধর্মগ্রন্থে গয়ার মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে।

গয়াকে বলা হয়েছে পিতৃপক্ষে শ্রাদ্ধের শ্রেষ্ঠ তীর্থ।

ত্রিধাম বা বিষ্ণু পদ, অক্ষয়বট ও ফল্গু নদী এই তিনটি স্থানে পিণ্ড দিলে পূর্ণ ফল লাভ হয় বলে বলা হয়।

গয়ায় পিণ্ডদান করার মাহাত্ম্য

পিতৃত্রাণ: পূর্বপুরুষের আত্মা মুক্তি পায় এবং তারা স্বর্গপ্রাপ্ত হন।

ঋণমুক্তি: জীবিত ব্যক্তিও পিতৃঋণ থেকে মুক্ত হন বলে বিশ্বাস।

শান্তি ও কল্যাণ: পারিবারিক অশান্তি, বাধা, রোগ, অমঙ্গল দূর হয় বলে বহু মানুষের অভিজ্ঞতা।

অক্ষয় ফল: গয়াতে একবার পিণ্ডদান করলে তা শতশত শ্রাদ্ধের ফল দেয় বলে কথিত।

গয়ায় পিণ্ডদান করার নিয়ম ও বিধি

পিণ্ডদান সাধারণত পিতৃপক্ষ অর্থাৎ মহালয়ার আগের ১৫ দিনে করা হয়। তবে সারা বছরই এটি সম্ভব। নিচে নিয়মাবলী দেওয়া হলো

পূর্ব প্রস্তুতি:

নিজ গোত্র, পূর্বপুরুষদের নাম জেনে আসা ভালো।

স্নান করে, সাদা পোশাক পরে ব্রাহ্মণ সহায়তায় যাত্রা করা উচিত।

নিজের আচার-ব্যবহার পবিত্র রাখতে হয় (শুচিতা পালন)।

পিণ্ডদানের মূল অংশ:

ফল্গু নদীর তীরে বা বিষ্ণুপদ মন্দিরে বা অক্ষয়বট গাছের নিচে এই আচার সম্পন্ন হয়।

সাধারণত সর্ষে, তিল, চাল, গঙ্গাজল, কুসা ঘাস, গোলাপজল ও গরুর দুধে ভেজানো খির/পিণ্ড দিয়ে আচার করা হয়।

পুরোহিতের সহায়তায় নির্দিষ্ট মন্ত্রোচ্চারণে পিণ্ডদানের আচার পালন করতে হয়।

যে নিয়মগুলি মানা জরুরি:

1. গয়া তীর্থে পিণ্ডদান করার দিন উপবাসে থাকা বা নিরামিষ আহার করা শ্রেয়।

2. স্ত্রীলোকেরা সাধারণত গয়াতে সরাসরি পিণ্ডদান করেন না, তবে বর্তমানে কিছু পুরোহিত এ বিষয়ে নমনীয়।

3. পিণ্ডদানের সময় মানসিকভাবে স্থির ও একাগ্রচিত্ত হওয়া দরকার।

4. পিণ্ডদানের পর দান (বিশেষত তিল, ভূষা, কাপড়) ব্রাহ্মণ বা দরিদ্রকে দেওয়া শুভফলদায়ক।

5. পিণ্ডদান শেষে বিষ্ণুপদ মন্দিরে পূজা ও দর্শন আবশ্যিক।

গয়ায় কাদের উদ্দেশ্যে পিণ্ডদান করা যায়?

বাবা-মা, দাদু-ঠাকুর্দা সহ সাত পুরুষ পর্যন্ত পূর্বপুরুষদের জন্য।

অকালে মৃত, আত্মহত্যা বা দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর শিকারদের উদ্দেশ্যেও করা যায়।

এমনকি নিঃসন্তান মৃত আত্মীয়, বন্ধু, আত্মীয়স্বজনের নামেও করা যায়।

গয়া শুধু একটি স্থান নয়, এটি এক মহামানবীয় তীর্থ যেখানে ধর্ম, আত্মা ও পূর্বপুরুষের স্মৃতির মিলন ঘটে। এখানে পিণ্ডদান কেবল একটি আচার নয়, বরং এটি হলো অতীতের প্রতি শ্রদ্ধা, আত্মিক শুদ্ধি এবং ভবিষ্যতের জন্য আশীর্বাদ আহ্বানের এক উপায়। প্রতিটি হিন্দুর জীবনে অন্তত একবার গয়ায় পিণ্ডদান করা মানেই হলো পিতৃঋণ থেকে মুক্তি পাওয়া এমনটাই বিশ্বাস।

Archive

Most Popular