প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
মঙ্গলচণ্ডী গাই, কন্যে জাগাও গো... এই পঙক্তির মধ্যেই যেন প্রতিধ্বনিত হয় গ্রামবাংলার হৃদস্পন্দন।
শুধু এক ব্রত বা পূজার আচার নয় মা মঙ্গলচণ্ডীর গান, পালা ও ব্রতকথা মিলিয়ে গড়ে ওঠে এক অন্তরঙ্গ সংস্কৃতি, যেখানে নারীর শক্তি ও দৈনন্দিন জীবন একাকার হয়ে যায়। এই প্রতিবেদন সেই আত্মিক গানের জগতে একবার পা রাখার চেষ্টা, যেখানে মাতৃশক্তির বন্দনা ছাপিয়ে উঠে আসে নারীর নিজস্ব কণ্ঠস্বর।
মঙ্গলচণ্ডী মূলত বাংলার এক লৌকিক দেবী, যাঁকে সুরক্ষা, সমৃদ্ধি এবং নারীর আশ্রয়ের প্রতীক হিসেবে পূজা করা হয়। সাধারণত আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে মঙ্গলবার ভোরে, ব্রতের নিয়ম মেনে গ্রামবাংলার নারীসমাজ জড়ো হন কখনও বাড়ির উঠোনে, কখনও বটতলায় বা শালগাছের ছায়ায়। তাঁদের মুখে মুখে ভেসে ওঠে এক একটি গীত যা কখনও মঙ্গলচণ্ডীর জন্মকথা, কখনও অসুরনিগ্রহ, আবার কখনও একজন ব্রতধারিণী নারীর পারিবারিক সংকটের বিবরণ। এই গীতগুলির ভাষা সরল, ছন্দময়, তবু যেন আছড়ে পড়ে বুকের গভীরে। মা-কে ডাকার ভঙ্গিতে যেমন আছে ভক্তি, তেমনই আছে অভিমান, আর গভীর আস্থা।
অনেক গ্রামে আজও মঙ্গলচণ্ডীর পালা বা গীতনাট্য হয়। কোনও গায়েন বা একদল মহিলা মুখে মুখে গেয়ে শোনান দেবীর নানা অলৌকিক কাহিনি। গান আর কথার মিশেলে যে নাটক তৈরি হয়, তা শুধুই বিনোদন নয় তা গ্রামীণ জীবনদর্শনেরও প্রতিফলন। এই পালাগুলি একাধারে কাহিনিমূলক, নীতিপ্রধান এবং আধ্যাত্মিক। তার মধ্যে যেমন থাকে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক, সতীনারীর মহিমা, তেমনই থাকে সমাজের অন্যায়ের বিরুদ্ধে নারীর লড়াই আর সব কিছুর পেছনে বিরাজ করেন মা মঙ্গলচণ্ডী।
যখন এক মহিলা বলে ওঠেন, আমার ঘরের লক্ষ্মী মা, চণ্ডী আমায় দেখে..
তখন বোঝা যায় এই দেবী আর বাইরের কেউ নন, তিনি নারীর নিজস্ব আত্মবিশ্বাস, প্রতিরোধ আর অস্তিত্বের প্রতীক। মঙ্গলচণ্ডীর গানে নারীরা নিজেরাই নিজেদের শক্তিকে ডেকে আনেন, নিজেদের দুর্বলতাকে রূপান্তর করেন এক অন্তর্নিহিত শক্তিতে। এই ব্রত পালনের মধ্যে তাই কেবল ধর্ম নয়, নারীর আত্মনির্ভরতা ও সঙ্ঘবদ্ধতার চর্চাও ঘটে।
বর্তমান সময়ে যদিও শহুরে প্রেক্ষাপটে এই গান অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে, তবে এখনও অনেক গ্রামে, বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, বীরভূম বা নদিয়া অঞ্চলে এই গীত বাঁচিয়ে রেখেছেন বয়স্কা মায়েরা, বৌমারা, কিংবা গ্রামের কিশোরীরা। কেউ গায় মায়ের কথা জেনে-শুনে, কেউ শুধুই মুখে মুখে শোনা গানে সুর মেলায়। যারা এই গানে মাতেন, তাদের অনেকেই বলেন, এ গান গাইলে মন হালকা হয়, মা যেন পাশে এসে বসেন।
মঙ্গলচণ্ডীর গীত কেবলই একটি ব্রতচর্চার অঙ্গ নয়, তা একান্ত নারীর অভ্যন্তরীণ জগতের সংগীত। এই গান নারীকে শেখায় বুক টান করে দাঁড়াতে, নিজের জীবনের জন্য নিজেই প্রার্থনা করতে। এবং সেই প্রার্থনা হয় সুরে, তাল-লয়ে, আত্মিক নিবেদনে। আজ, যখন আধুনিকতা অনেক আঞ্চলিক ঐতিহ্যকে চাপা দিয়ে দিচ্ছে, তখন এই গানগুলি আমাদের শিকড়ে ফেরার ডাক দেয়। মা মঙ্গলচণ্ডীর গীত সেই ডাক এক অনন্ত আত্মিক যাত্রার সঙ্গী।