প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
ভারতীয় উপমহাদেশের রেলপথের ইতিহাস যতটা দীর্ঘ, তার প্রতিটি স্টেশন যেন এক একটি গল্প বলে। তবে কিছু স্টেশনের কাহিনি শুধুই যোগাযোগ বা যাতায়াতের নয়, বরং তারা হয়ে ওঠে ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। তেমনই একটি নাম সিঙ্গাবাদ বাংলার একদম পশ্চিম প্রান্তে, মালদা জেলার সীমান্ত ঘেঁষা একটি ছোট্ট রেলস্টেশন। অথচ এই সিঙ্গাবাদই ভারতের একমাত্র এমন রেলস্টেশন, যার সীমান্ত পারাপারের গুরুত্ব আন্তর্জাতিক স্তরে বাংলাদেশের সঙ্গে মালবাহী ট্রেন চলাচলের একটি গুরুত্বপূর্ণ গেটওয়ে এটি।
সিঙ্গাবাদ স্টেশন অবস্থিত মালদা জেলার হাবিবপুর ব্লকের অন্তর্গত। এটি গৌড় শহরের প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তরে, এবং একদম ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের ধারে। উত্তর ও পশ্চিমে ঝাড়খণ্ডের রাজ্যসীমা এবং পূর্ব দিকে বাংলাদেশের নওগাঁ জেলা। এটি রেলপথে নিউ ফরাক্কা জংশন থেকে মাত্র কয়েকটি স্টপ দূরে। এতটা প্রত্যন্ত অঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও, এই স্টেশনই আন্তর্জাতিক বানিজ্যের একটি মুখ্য পথ।
সিঙ্গাবাদ স্টেশনটি মূলত ব্রিটিশ আমলে নির্মিত হয়েছিল। তখন এটি একটি সাধারণ গ্রামীণ স্টেশন ছিল, যেখান থেকে স্থানীয় মানুষ মালদা, রায়গঞ্জ কিংবা ভাগলপুর যেতেন। তবে এর কৌশলগত অবস্থান ধীরে ধীরে এর গুরুত্ব বাড়িয়ে তোলে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পরে ভারত-বাংলাদেশ (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান)-এর মধ্যে রেলপথ বিভাজন হলেও বহুদিন পর্যন্ত স্থানীয় ও আন্তঃদেশীয় পণ্য পরিবহন চলত। সিঙ্গাবাদ সেই ধারারই উত্তরসূরি। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ স্বাধীন হলে, উভয় দেশের মধ্যে আবার যোগাযোগ পুনরায় চালুর প্রয়াস শুরু হয়। ১৯৭৮ সালে একটি চুক্তির মাধ্যমে সিঙ্গাবাদ-রোহনপুর (বাংলাদেশ) রুটে রেলযোগাযোগ পুনরায় চালু করা হয়, তবে শুধুমাত্র পণ্য পরিবহণের উদ্দেশ্যে।
বর্তমানে সিঙ্গাবাদ স্টেশন থেকে মূলত বাংলাদেশের রাজশাহী বিভাগের রোহনপুর স্টেশনের সঙ্গে মালবাহী ট্রেন চলাচল হয়। এখানে মূলত পাথর, চুনাপাথর ও কয়লা রপ্তানি করা হয়। পশ্চিমবঙ্গ এবং ঝাড়খণ্ডের খনিগুলি থেকে সংগৃহীত এই খনিজ সম্পদ, বিশেষত বালু ও স্টোন চিপস, বাংলাদেশের অবকাঠামো নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশ রেলওয়ে এবং ভারতীয় রেলওয়ে যৌথভাবে এই রুটের কার্যক্রম পরিচালনা করে। প্রতি সপ্তাহে নির্দিষ্ট সংখ্যক মালগাড়ি এই রুটে চলে, যা দুই দেশের মধ্যে একটি নিরব অথচ শক্তিশালী রেল-সম্পর্কের প্রতীক।
সিঙ্গাবাদ শুধু ব্যবসায়িক দিক থেকে নয়, কৌশলগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্তবর্তী এই রেলস্টেশন ভারতের নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। বিএসএফ (সীমান্ত রক্ষী বাহিনী) এখানে কড়া নজরদারি চালায়, বিশেষ করে সীমান্ত পারাপারের সময়। যে কোনো ধরনের সন্দেহজনক কার্যকলাপ রুখে দেওয়ার জন্য সর্বদা সক্রিয় নিরাপত্তা বল রয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রেক্ষাপটেও এই স্টেশনের গুরুত্ব অপরিসীম। ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে যখনই কূটনৈতিক আলাপ-আলোচনায় বাণিজ্য পথের প্রসঙ্গ আসে, সিঙ্গাবাদ-রোহনপুর রুটের নাম সেখানে উঠে আসে। এটি দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার একটি ছোট অথচ শক্তিশালী সেতু।
সিঙ্গাবাদ স্টেশনটি দেখতে অনেকটাই একটি সাধারণ গ্রামীণ স্টেশনের মতো। একটি মাত্র প্ল্যাটফর্ম, একটি ছোট টিকিট কাউন্টার, এবং কিছু অফিস কক্ষ নিয়ে গঠিত এই স্টেশনটি। তবে মালগাড়ির চলাচলের জন্য একটি আলাদা ট্র্যাক ও লোডিং-আনলোডিং জোন রয়েছে। এখানে যাত্রীবাহী ট্রেন থামে না, এবং সাধারণ যাত্রীদের প্রবেশ অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত। ভারতীয় রেলের পূর্বাঞ্চল শাখা এই স্টেশনের রক্ষণাবেক্ষণ করে। তবে দীর্ঘদিন ধরে যাত্রীবাহী ট্রেন না চলায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভও দেখা যায়। তাদের দাবি, সীমান্তবর্তী এই এলাকায় যাতায়াতের সুবিধার জন্য অন্তত একটি লোকাল ট্রেন চালু হোক..
সিঙ্গাবাদ স্টেশনকে কেন্দ্র করে আশেপাশে একটি ছোট্ট জনপদ গড়ে উঠেছে। বেশিরভাগ মানুষ কৃষিকাজ বা সীমান্ত বানিজ্যের সঙ্গে যুক্ত। অনেকেই বিএসএফ-এর কনট্রাকচুয়াল কাজে যুক্ত থাকেন। শিশুদের পড়াশোনার জন্য হাবিবপুর কিংবা গাজোলে যেতে হয়, কারণ এলাকায় উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই বললেই চলে। রেলস্টেশনটি যেমন ব্যবসায়িক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি অনেক স্থানীয়র জন্য এটি রুজি-রোজগারের জায়গাও। পাথর বোঝাই ট্রাক, মালগাড়ির আনলোডিং-লোডিং ইত্যাদি কাজ করে বহু মানুষ তাদের জীবিকা নির্বাহ করেন।
যদিও বর্তমানে সিঙ্গাবাদ স্টেশন শুধুই মালগাড়ির জন্য ব্যবহৃত হয়, তবে ভবিষ্যতে যাত্রীবাহী ট্রেন চালু হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে মালদা-রাজশাহী আন্তঃদেশীয় ট্রেন পরিষেবা চালু হলে এই রুট অত্যন্ত কার্যকরী হয়ে উঠবে। এছাড়াও ভারতের নবরূপান্তরিত রেলস্টেশন প্রকল্পে(Amrit Bharat Station Scheme) সিঙ্গাবাদ স্টেশনকে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি উঠেছে। এতে পরিকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যটন এবং অর্থনীতিও চাঙ্গা হতে পারে।
সিঙ্গাবাদ বাংলার একদম শেষ রেলস্টেশন, অথচ যার গুরুত্ব কোনো প্রান্তিকতার ছাপ বহন করে না। এটি একদিকে যেমন সীমান্তের প্রহরী, তেমনি দুই দেশের মধ্যে শান্তিপূর্ণ ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের এক নীরব বাহক। অচেনা হলেও এই স্টেশনটির কাহিনি গভীর, এবং সম্ভাবনাও অসীম। একদিন হয়তো এখান থেকেই আন্তর্জাতিক যাত্রীবাহী ট্রেন ছাড়বে, এবং তখন সিঙ্গাবাদ শুধু বাংলার নয়, সমগ্র উপমহাদেশের জন্য হয়ে উঠবে আরও এক গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য।