10th Apr 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

পুরুষের বন্ধ্যাত্ব: কী এবং কেন?

স্বাস্থ্য

নিজস্ব প্রতিনিধি


বন্ধ্যাত্ব বা ইনফার্টিলিটি মানে হলো, একটি দম্পতি এক বছরেরও বেশি সময় ধরে নিয়মিত শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করার পরেও যদি সন্তান ধারণে ব্যর্থ হয়। এই সমস্যার পেছনে নারী ও পুরুষ উভয়েরই শারীরিক বা মানসিক কারণ থাকতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বজুড়ে মোট বন্ধ্যাত্বের প্রায় ৪০-৫০% ক্ষেত্রে পুরুষদের দায়িত্ব থাকে। অর্থাৎ, পুরুষের বন্ধ্যাত্ব একটি গুরুতর ও সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা।


পুরুষের বন্ধ্যাত্ব কী?

পুরুষের বন্ধ্যাত্ব বলতে বোঝায়, পুরুষের শরীরে এমন কোনও জৈবিক বা শারীরবৃত্তীয় সমস্যা, যার কারণে তার শুক্রাণু (sperm) সঠিকভাবে উৎপাদিত হয় না, অথবা উৎপন্ন হলেও কার্যক্ষমতা হারায়, ফলে গর্ভধারণে বাধা সৃষ্টি হয়।


পুরুষের বন্ধ্যাত্বের প্রধান কারণ

  1. শুক্রাণুর সংখ্যা কমে যাওয়া (Low Sperm Count):
    – স্বাভাবিকভাবে প্রতি মিলিলিটার বীর্যে অন্তত ১৫ মিলিয়নের বেশি শুক্রাণু থাকা উচিত। এর চেয়ে কম থাকলে গর্ভধারণ কঠিন হয়।

  2. শুক্রাণুর গুণগত মান খারাপ হওয়া (Poor Sperm Quality):
    – শুক্রাণুর আকার (morphology) ও গতি (motility) খারাপ হলে তা ডিম্বাণুতে পৌঁছাতে ও নিষেক ঘটাতে পারে না।

  3. হরমোনজনিত সমস্যা:
    – টেস্টোস্টেরন ও অন্যান্য প্রজনন হরমোনের ভারসাম্যহীনতা শুক্রাণু উৎপাদন কমিয়ে দেয়।

  4. বংশগত ও জেনেটিক কারণ:
    – Y-ক্রোমোজোমে ত্রুটি, ক্লাইনফেল্টার সিনড্রোমের মতো জেনেটিক সমস্যায় বন্ধ্যাত্ব দেখা দিতে পারে।

  5. অণ্ডকোষের সমস্যা:
    – অণ্ডকোষ নামতে না পারা (undescended testis), ভ্যারিকোসিল (অণ্ডকোষের শিরায় ফোলা), বা আঘাতের কারণে শুক্রাণু ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

  6. সংক্রমণ:
    – যৌনবাহিত রোগ (STD), মম্পস, বা প্রোস্টেট গ্রন্থির ইনফেকশন অণ্ডকোষ ও শুক্রাণু নষ্ট করে দিতে পারে।

  7. জীবনযাত্রাজনিত কারণ:
    – ধূমপান, মদ্যপান, মাদক গ্রহণ, অতিরিক্ত কফি, ঘুমের অভাব, মানসিক চাপ।

  8. অতিরিক্ত তাপ ও বিকিরণ:
    – অণ্ডকোষে অতিরিক্ত তাপ (tight underwear, দীর্ঘক্ষণ ল্যাপটপ ব্যবহার, সাউনা) বা বিকিরণ (radiation therapy) শুক্রাণু নষ্ট করে।

  9. ওষুধ ও রাসায়নিক পদার্থের প্রভাব:
    – ক্যান্সারের কেমোথেরাপি, কিছু অ্যান্টিবায়োটিক, হরমোনাল ওষুধ, কীটনাশক ইত্যাদি।


পুরুষের বন্ধ্যাত্বের লক্ষণ

  • বেশিরভাগ সময় কোনও আলাদা শারীরিক লক্ষণ দেখা যায় না, কেবল গর্ভধারণে সমস্যা থেকেই ধরা পড়ে।
    তবে কিছু ক্ষেত্রে

  • যৌন ইচ্ছা কমে যাওয়া

  • ইরেকশনে সমস্যা (Erectile dysfunction)

  • অণ্ডকোষে ফোলা বা ব্যথা

  • অণ্ডকোষের আকার ছোট বা অস্বাভাবিক

  • শরীরে অস্বাভাবিক লোম বৃদ্ধি বা কমে যাওয়া (হরমোনজনিত সমস্যা হলে)


নির্ণয়ের উপায়

  1. সিমেন অ্যানালাইসিস (Semen Analysis): শুক্রাণুর সংখ্যা, গতি, আকার পরীক্ষা।

  2. হরমোন টেস্ট: টেস্টোস্টেরন, LH, FSH ইত্যাদি পরিমাপ।

  3. আল্ট্রাসাউন্ড বা ডপলার: ভ্যারিকোসিল বা অণ্ডকোষের সমস্যার জন্য।

  4. জেনেটিক টেস্ট: বংশগত ত্রুটি খুঁজে বের করতে।

  5. সংক্রমণ পরীক্ষা: STD বা অন্যান্য ইনফেকশন বোঝার জন্য।


প্রতিকার ও চিকিৎসা

  • জীবনযাত্রার পরিবর্তন: ধূমপান-মদ্যপান ত্যাগ, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, মানসিক চাপ কমানো।

  • ওষুধ: হরমোনজনিত সমস্যা বা ইনফেকশন থাকলে সঠিক চিকিৎসা।

  • অস্ত্রোপচার: ভ্যারিকোসিল বা অণ্ডকোষের সমস্যার ক্ষেত্রে সার্জারি।

  • সহায়ক প্রজনন প্রযুক্তি (ART):
    – IVF (In Vitro Fertilization)
    – ICSI (Intracytoplasmic Sperm Injection)
    – Donor sperm ব্যবহার


প্রতিরোধের উপায়

  • সুষম খাদ্যগ্রহণ (শাকসবজি, ফল, বাদাম, প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার)।

  • শরীরচর্চা ও ওজন নিয়ন্ত্রণ।

  • STD প্রতিরোধে সুরক্ষিত যৌন আচরণ।

  • অতিরিক্ত তাপ ও রাসায়নিক পদার্থ এড়ানো।

  • সময়মতো স্বাস্থ্য পরীক্ষা।


পুরুষের বন্ধ্যাত্ব একটি জটিল কিন্তু চিকিৎসাযোগ্য সমস্যা। প্রাথমিকভাবে কোনও শারীরিক লক্ষণ দেখা না দিলেও সঠিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও জীবনধারায় পরিবর্তনের মাধ্যমে এর সমাধান সম্ভব। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো লজ্জা বা সামাজিক সংকোচ না করে সময়মতো চিকিৎসকের কাছে যাওয়া। সঠিক চিকিৎসা নিলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সন্তান লাভ সম্ভব।

Archive

Most Popular