প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
দুর্গোৎসব কেবলমাত্র আনন্দ-উৎসব নয়, এটি বাঙালির জীবনের সঙ্গে, সংস্কৃতির সঙ্গে, এমনকি কৃষি ও পরিবেশের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত দেবী দুর্গাকে নানা রকমের ভোগ দেওয়ার রীতি আছে। তবে বিশেষভাবে দশমীতে পান্তা ভাত ও কচুশাক দেওয়ার প্রথা দীর্ঘকাল ধরে চলে আসছে। অনেকেই প্রশ্ন করেন মা দুর্গার ভোগে কেন এই সাধারণ খাবারটি? এর পেছনে আছে পৌরাণিক কাহিনি, কৃষি সমাজের ঐতিহ্য, স্বাস্থ্যগত যুক্তি এবং সামাজিক দিক।
লোককথা অনুযায়ী, দেবী দুর্গা পরাজিত করার পর মহিষাসুরকে, দশমীর দিনে তিনি মা হয়ে ফিরে আসেন। সেদিন তাঁর কাছে বিলাসী নয়, বরং সাধারণ ও সহজ খাবার প্রিয় বলে মনে করা হয়। কচুশাক খেলে শরীর ঠান্ডা হয় এমন ধারণা লোকসমাজে প্রচলিত। তাই যুদ্ধ শেষে ক্লান্ত দেবীকে শীতলতা দিতে কচুশাক আর পান্তা ভাতের ভোগ দেওয়া হয়। আরও একটি বিশ্বাস প্রচলিত আছে শরৎকালের এই সময়ে কচু গাছ প্রকৃতিতে ছড়িয়ে থাকে। গ্রামবাংলার মানুষ এটিকে দেবীর পছন্দের প্রতীক হিসেবে মান্য করেছেন। তাই দশমীর ভোগে কচুশাক অপরিহার্য।
দুর্গোৎসবের সময়ে, অর্থাৎ আশ্বিন মাসে, ধান কাটা হয়নি। গৃহস্থের ঘরে নতুন ধান নেই, তাই পান্তা ভাত সাধারণত পুরোনো চাল থেকে বানানো হয়। সেই সঙ্গে কচু গাছ বর্ষাকালে প্রচুর জন্মায় এবং শরৎকালেও সহজলভ্য থাকে। সহজে পাওয়া যায় বলে ভোগে কচুশাকের ব্যবহার শুরু হয়েছিল। আসলে এটি কৃষিভিত্তিক সমাজের একটি প্রতীক যেখানে প্রাকৃতিক উপাদান এবং সহজলভ্য খাদ্য দিয়ে দেবীকে ভোগ দেওয়া হয়। আয়ুর্বেদ মতে, কচুশাক শরীরের অতিরিক্ত গরম কমায়, হজম শক্তি বাড়ায় এবং পেটের সমস্যা দূর করে। দুর্গাপুজোর সময় টানা কয়েকদিন মিষ্টি, ভাজা, মশলাদার খাবার খাওয়ার পর শরীর ভারী হয়ে যায়। দশমীর দিনে কচুশাক-পান্তা খাওয়া শরীরকে আবার ভারসাম্যে ফিরিয়ে আনে এমন একটি ভাবনাও প্রচলিত।
সহজতার প্রতীক – দেবীর কাছে বিলাসী ভোগ নয়, বরং সাধারণ মানুষের প্রতিদিনকার খাদ্যই নিবেদন করা হয়। এর মধ্য দিয়ে বোঝানো হয়—দেবী আড়ম্বর নয়, সরলতাই পছন্দ করেন।
সমতা ও গণমানুষের সঙ্গে সংযোগ – ধনী-গরিব নির্বিশেষে পান্তা ভাত ও কচুশাক সবার কাছে সহজলভ্য। তাই দেবীকে এর ভোগ দেওয়া আসলে সমাজের সমতার বার্তা বহন করে।
বিজয়ার অনুভূতি – যুদ্ধশেষে শান্তি ও সরল জীবনে ফিরে আসা—এই ধারণা দশমীর ভোগে প্রতিফলিত হয়।
বাংলার বিভিন্ন জায়গায় দশমীর দিনে দেবীকে ভিন্ন ভিন্ন ভোগ দেওয়া হয়। কোথাও শুধু কচুশাক, কোথাও কচুশাকের সঙ্গে কলা, আবার কোথাও পান্তা ভাতের সঙ্গে পাঁচ রকম ভাজি। তবে কচুশাক প্রায় সর্বত্রই অপরিহার্য। বাঙালি কবি ও লোকগানে কচুশাক ও পান্তার ভোগের উল্লেখ বহুবার এসেছে। গ্রামীণ কবি-কথকরা বলেছেন
মা আসেন মর্ত্যে, চান সাধারণের স্পর্শ। তাই তাঁর ভোগে সাধারণ মানুষের খাবারই মুখ্য।
এটি বাঙালির দেবীর প্রতি একান্ত ভালোবাসা ও আন্তরিকতার প্রতিফলন।
দশমীতে মা দুর্গাকে পান্তা ভাত ও কচুশাক ভোগ দেওয়া কেবল একটি খাদ্যসংস্কৃতি নয়, বরং এটি এক সমৃদ্ধ ঐতিহ্য। এর মধ্যে আছে পৌরাণিক ব্যাখ্যা, কৃষির সঙ্গে যোগ, স্বাস্থ্যের দিক, এবং সামাজিক বার্তা। দেবীকে সহজ-সরল ভোগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে বাঙালি জানিয়ে দেয় দেবী সর্বজনীন, তিনি সবার মা। তাই দশমীর দিনে এই ভোগ আজও সমান শ্রদ্ধা ও আন্তরিকতায় পালন করা হয়।