প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
দুর্গাপুজো কেবল এক ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি বাঙালির অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে থাকা এক মহাউৎসব। ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত প্রতিটি দিনই আলাদা আচার-অনুষ্ঠানে পূর্ণ। তবে নবমীর নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক বিশেষ দৃশ্য ঢাকের বাদ্য, কাঁসর-ঘণ্টার শব্দের সঙ্গে ধোঁয়া উড়িয়ে চলা ধুনুচি নাচ। অনেকের মতে, দুর্গাপুজোয় ধুনুচি নাচ না হলে উৎসবের আমেজই যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কিন্তু এই প্রথার সূচনা হলো কীভাবে? কেনই বা মানুষ জ্বলন্ত ধুনুচি হাতে নিয়ে দেবীর সামনে নাচতে শুরু করল? এই প্রবন্ধে আমরা নবমীর ধুনুচি নাচের উৎস, ইতিহাস, ধর্মীয় তাৎপর্য, লোকসংস্কৃতি ও আধুনিক কালের বিবর্তন সব কিছু বিশদভাবে আলোচনা করব।
ধুনুচি হলো একধরনের মাটির বা পিতলের তৈরি পাত্র, যা পূজার্চনায় ধূপ জ্বালানোর জন্য ব্যবহার করা হয়।
এর মধ্যে থাকে নারকেলের খোলা, কয়লা ও ধূপ।
জ্বলতে জ্বলতে এর ভেতর থেকে ধোঁয়া ও সুগন্ধ বের হয়।
পূজার সময় দেবীকে ধূপ প্রদীপের মতো ধুনুচি নাড়িয়ে অর্ঘ্য দেওয়া হয়।
প্রাচীনকাল থেকেই পূজার্চনায় ধূপ ব্যবহার প্রচলিত। ধূপের ধোঁয়া একদিকে সুগন্ধ ছড়ায়, অন্যদিকে পরিবেশকে পবিত্র করে বলে বিশ্বাস করা হয়।
ধুনুচি নাচ আসলে আরতিরই এক বিস্তৃত রূপ। কালিকাপুরাণ ও অগ্নিপুরাণে বলা আছে, দেবীর পূজায় ধূপ প্রদীপ অর্ঘ্য দেওয়া অত্যন্ত শুভ।
আরতির সময় যেমন প্রদীপ নিয়ে ঘোরানো হয়, তেমনি ধূপ জ্বালিয়ে দেবীর সামনে ধুনুচি ঘোরানো হতো।
ধীরে ধীরে ভক্তরা শুধু ধুনুচি ঘোরানো নয়, দেবীর আনন্দে নেচে উঠতে শুরু করলেন।
এইভাবেই জন্ম নিল ধুনুচি নাচ।
নবমী দিন দেবীর চণ্ডীপাঠ, বলি ও বিশেষ পূজার ব্যবস্থা থাকে। দেবীকে খুশি করার জন্য এই দিন সব আচারই হয় মহাসমারোহে।
বিশ্বাস করা হয়, নবমীতে দেবী মহিষাসুরের সঙ্গে চূড়ান্ত যুদ্ধে লিপ্ত হন।
সেই মহাযুদ্ধের উত্তেজনা ও শক্তির প্রতীক হিসেবেই ভক্তরা ধুনুচি নিয়ে নাচতে শুরু করেন।
তাই নবমীর সন্ধ্যা মানেই ধুনুচি নাচের আসর।
বাংলার গ্রামীণ জীবনে পূজার আসরে ধুনুচি নাচ ছিল এক ধরনের সামাজিক অনুষ্ঠান।
পাড়ার প্রতিযোগিতা: কে কতক্ষণ জ্বলন্ত ধুনুচি হাতে নাচতে পারে—তা নিয়ে প্রতিযোগিতা হতো।
সাংস্কৃতিক বিনোদন: পূজার আসরে নাটক, যাত্রার পাশাপাশি ধুনুচি নাচও ছিল বিনোদনের উৎস।
আত্মনিবেদন: ভক্তরা ধুনুচি হাতে নিয়ে নাচতেন দেবীর প্রতি আত্মসমর্পণের নিদর্শন হিসেবে।
হাতে এক বা একাধিক ধুনুচি ধরা হয়।
কেউ কেউ মুখে ধুনুচি নিয়ে নাচ দেখান যা উচ্চস্তরের দক্ষতা দাবি করে।
নাচের সঙ্গে ঢাক, কাঁসর, শঙ্খের তাল মিলিয়ে ওঠে।
ধীরে ধীরে সাধারণ নাচ থেকে এটি এক ধরণের ritual performance এ পরিণত হয়েছে।
অগ্নি ও ধোঁয়া: অগ্নি মানে শক্তি, ধোঁয়া মানে পবিত্রতা।
নৃত্য: দেবীর আনন্দে আত্মার উচ্ছ্বাস।
ধুনুচি নাচ: শুভ শক্তির জয়, অশুভ শক্তির দহন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “বিজয়া” কবিতায় ধুনুচির আলো-ধোঁয়ার আভাস পাওয়া যায়।
বাংলা সিনেমায় যেমন অপরাজিত, বেলাশেষে প্রভৃতি ছবিতে ধুনুচি নাচের দৃশ্য রয়েছে।
আধুনিক টেলিভিশন সিরিয়াল ও ওয়েব সিরিজেও পূজার দৃশ্যে ধুনুচি নাচ অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
আজকের দিনে ধুনুচি নাচ কেবল ধর্মীয় আচার নয়, এটি এক প্রতিযোগিতার রূপ নিয়েছে।
প্রায় প্রতিটি বারোয়ারি পূজাতেই নবমীর রাতে ধুনুচি নাচ প্রতিযোগিতা হয়।
মহিলা, পুরুষ, শিশু সবাই অংশ নেয়।
বিজয়ীদের জন্য থাকে পুরস্কার।
মিডিয়া কাভারেজ, সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিডিও সব মিলিয়ে এটি উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ।
দুর্গাপুজোয় ধুনুচি নাচের রীতি সর্বত্র একই রকম হলেও, বাংলার বিভিন্ন জেলায় এর ভঙ্গি, তাল ও উপস্থাপনায় রয়েছে কিছু বৈচিত্র্য। প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিবেশ, লোকজ ঐতিহ্য ও সামাজিক প্রেক্ষাপট এই ভঙ্গিগুলোকে আলাদা করে তুলেছে। নিচে দেওয়া হলো কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ভঙ্গির তালিকা
ভঙ্গি: আধুনিক ধাঁচের, প্রায়শই কোরিওগ্রাফ করা নাচের মতো।
বিশেষত্ব: ঢাকের সঙ্গে সিঙ্ক্রোনাইজ করে দলগত পরিবেশনা।
অতিরিক্ত আকর্ষণ: প্রতিযোগিতার রীতি প্রায় সব ক্লাবই নবমীর রাতে ধুনুচি নাচ প্রতিযোগিতা আয়োজন করে।
মহিলাদের অংশগ্রহণ: শহুরে পূজায় নারী-পুরুষ সমানভাবে অংশ নেন, যা গ্রামে আগে তেমন দেখা যেত না।
ভঙ্গি: মুখে ধুনুচি ধরে নাচা এখানে বিশেষ জনপ্রিয়।
বিশেষত্ব: সাহস ও ভক্তির মিশ্রণ ভক্তরা দেখাতে চান, দেবীর জন্য তাঁরা সর্বস্ব উজাড় করে দিতে পারেন।
তালের ধরন: ঢাক ও কাঁসর-ঘণ্টার খুব দ্রুত তাল ব্যবহৃত হয়।
ভঙ্গি: বেশি গ্রামীণ ও সহজ সরল।
বিশেষত্ব: এখানে ঢাকের পাশাপাশি কীর্তনীয় সুরের সঙ্গেও ধুনুচি নাচ হয়।
সামাজিক রূপ: অনেক সময় দলবেঁধে মহিলারা একসঙ্গে নাচেন, যা উৎসবকে করে তোলে আরও প্রাণবন্ত।
ভঙ্গি: ছৌ নাচ ও লোকনৃত্যের প্রভাব স্পষ্ট।
বিশেষত্ব: শরীরের ভঙ্গিমা বেশি নাটকীয়, মুখোশ বা লোকনৃত্যের ভঙ্গি যুক্ত হয়।
দৃশ্যমানতা: দর্শকের কাছে এটি একেবারে লোকশিল্পের রূপ নেয়।
ভঙ্গি: ধুনুচি নাচের সঙ্গে ঢোল ও শঙ্খের ব্যবহার বেশি।
বিশেষত্ব: ঢাকের সঙ্গে স্থানীয় বাদ্যযন্ত্র যোগ হওয়ায় সুর ও তালের ভিন্নতা আসে।
রীতি: পরিবারভিত্তিক পূজায়ও ধুনুচি নাচের প্রচলন রয়েছে।
ভঙ্গি: ধীর ও ছন্দময়, ঢেউয়ের মতো শরীরী ভঙ্গি।
বিশেষত্ব: নদীমাতৃক এলাকার প্রভাব—নৃত্যে থাকে ঢেউ খেলানো গতি।
সামাজিক পরিবেশ: এখানে প্রায়ই পূজা শেষ হওয়ার পর মেলা বা যাত্রার সঙ্গে ধুনুচি নাচ যুক্ত হয়!
বাংলার প্রতিটি অঞ্চলের ধুনুচি নাচের ভঙ্গি আলাদা হলেও মূল উদ্দেশ্য এক দেবীর আনন্দে ভক্তির উচ্ছ্বাস প্রকাশ। কোথাও এটি কোরিওগ্রাফ করা দলগত পরিবেশনা, কোথাও সাহসিকতার চূড়ান্ত প্রকাশ, আবার কোথাও লোকনৃত্যের সঙ্গে মিশে তৈরি হয়েছে এক নতুন মাত্রা। এই বৈচিত্র্যই বাংলার ধুনুচি নাচকে করেছে অনন্য এবং বাঙালির দুর্গোৎসবকে দিয়েছে এক অনন্য সাংস্কৃতিক রূপ।